প্রমত্তা তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচর

বাংলারজমিন

মাজহারুল ইসলাম লিটন, ডিমলা (নীলফামারী) থেকে | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার
প্রতিদিন উজান হতে পানির প্রবাহ কমতে থাকায় বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প ডালিয়া তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ অব্যাহতভাবে শুকিয়ে যেতে শুরু করেছে। ডিসেম্বরে শেষ সপ্তাহে  থেকে এই পরিস্থিতিতে আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে সেচনির্ভর বোরো আবাদে কমান্ড এলাকার কৃষকরা তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্পের চাহিদা মোতাবেক পানি পাবে কিনা এ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। পানি স্বল্পতার কারণে এলাকা কাটছাঁট করে করা হচ্ছে সেচ কার্যক্রম।
চলতি মৌসুমে নদীতে প্রয়োজনীয় পানির অভাবে তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় পানি উন্নয়ন বোর্ড আসন্ন বোরো মৌসুমে খুব কমসংখ্যক জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। বৃহস্পতিবার তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প এলাকা ঘুরে কৃষক ও ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে। গত মাসে সেচ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে মর্মে পাউবো থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সরজমিনে দেখা যায়, উজানের প্রবাহ না থাকায় তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে নদীর পানি প্রতিদিন কমছে। ফলে নদীর উজান ও ভাটি এলাকায় বালুচর জেগে উঠতে শুরু করেছে।
সরু নালার আকার ধারণ করেছে তিস্তার সেচনির্ভর পানির স্রোতধারা।
গত এক সপ্তাহ আগে ওই পয়েন্টে পানি প্রবাহ ছিল ৪ হাজার কিউসেক। এখন সেটি এসে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার কিউসেকে। তাও প্রতিদিন পানি প্রবাহ কমছেই।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ডালিয়া পয়েন্টের তিস্তা ব্যারাজ এলাকায় নদীর উজানের প্রবাহ ঐতিহাসিক গড় প্রবাহের (১৯৭৩-১৯৮৫ সাল পর্যন্ত) তুলনায় গতবারের মতো এবারো ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র মতে ২০০১ হতে ২০১০ সাল পর্যন্ত তিস্তা সেচ প্রকল্পের কমান্ড এলাকায় ৬৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করা হয়েছিল। ওই সময় এই সেচের ক্যানেলের মাধ্যমে পানি সরবরাহ করা হতো নীলফামারী, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরীগঞ্জ, সৈয়দপুর, রংপুর জেলার তারাগঞ্জ, গঙ্গাচড়া ও দিনাজপুর জেলার পার্র্বতীপুর, খানসামা, চিরিরবন্দর পর্যন্ত।
কিন্তু ২০১১ সালের পর হতে শুষ্ক মৌসুমে উজানের পানি প্রবাহ এতটাই নেমে আসে, সে সময় ২৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলেও তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। সূত্র বলছে, উজান হতে নদীর প্রাপ্য পানি না পাওয়া যাওয়ায় গত বছর (২০১৬) বোরো মৌসুমে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এবং সাড়ে ১০ হাজার হেক্টর পর্যন্ত সেচ দেয়া সম্ভব হয়েছিল। সূত্র মতে তিস্তা চুক্তি সই না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের সেচ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য পর্যাপ্ত ও নদী রক্ষার লক্ষ্যে ন্যায় সংগত পরিমাণ পানি ছাড়তে দিল্লিকে অনুরোধ জানিয়ে আসছে ঢাকা।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জানান, চলতি মৌসুমে ১৫ই জানুয়ারি হতে বোরো মৌসুমের জন্য কৃষকদের সেচ প্রদান কার্যক্রম শুরুর করে এবারো আট হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সেচ দেয়ার স্থানগুলো ধরা হয়েছে নীলফামারী সদরে ৮০০ হেক্টর, ডিমলা উপজেলার  ৫ হাজার হেক্টর, জলঢাকা উপজেলায় ২ হাজার হেক্টর, কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ২০০ হেক্টর।  তবে উজানের পানি বেশি পাওয়া গেলে সে ক্ষেত্রে সেচ প্রদানে জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করা হবে। কিন্তু চলতি মৌসুমের গত সপ্তাহে ডালিয়ার বিস্তা অববাহিকায় পানির প্রবাহ ২ হাজার কিউসেক থাকলে গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে তা ১ হাজার ৫০০ কিউসেকে নেমে এসেছে বলে জানিয়েছেন, ডালিয়া পাউবোর শাখা কর্মকর্তা আমিনুর রশিদ।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ডালিয়া বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, উজান থেকে তিস্তার পানি আসা কমে যাওয়ায় বোর্ড মিটিংয়ে চলতি বোরো মৌসুমে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।  
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের উত্তরাঞ্চলীয় পরিমাপ বিভাগের সূত্র মতে, শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি কমবে বাড়বে এটিই স্বাভাবিক। তারপরও তিস্তার পানি প্রবাহ রেকর্ড পরিমাণ কমছে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ধরে রাখতে তিস্তা ব্যারাজের সেচ প্রকল্পের জন্য কমপক্ষে ১০ হাজার কিউসেক পানি প্রয়োজন ।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন