নজরুলের মুখে পাকুন্দিয়ায় জোড়া খুন

লোমহর্ষক বর্ণনা

এক্সক্লুসিভ

আশরাফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ থেকে | ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শনিবার
নাড়িছেঁড়া ধন দুধের শিশুটিকে বুকে চেপে রেখেছিলেন মা রহিমা বেগম। মায়ের এই নিরাপদ কোল থেকেই ৫৫ দিনের শিশু আমিরুলকে জোর করে কেড়ে নেয় নজরুল। কালভার্টের উপর থেকে জীবন্ত শিশুটিকে সে ছুড়ে ফেলে দেয় বিলের পানিতে। অসহায় শিশুটি মুহূর্তেই বিলের পানিতে তলিয়ে যায়। প্রাণান্ত চেষ্টার পরও সন্তানের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে পারেননি রহিমা। বরং সন্তানের শোকে কাতর রহিমাকে বিলের পানিতে উপর্যুপরি চুবিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে নজরুল। রহিমার মৃত্যু নিশ্চিত করার পর কচুরিপানার নিচে লাশ লুকিয়ে রেখে সে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। পাকুন্দিয়ায় মা ও নবজাতক জোড়া খুনের এমন লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে জোড়া খুনের হোতা নজরুল ইসলাম। গতকাল দুপুরে আদালতে ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জগলুল হক তার খাসকামরায় নজরুল ইসলামের এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। ঘাতক নজরুল ইসলাম (২৫) পাকুন্দিয়া উপজেলার বুরুদিয়া ইউনিয়নের পাবদা গ্রামের সোহ্‌রাব উদ্দিনের ছেলে এবং কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজের ভূগোল বিষয়ে সম্মান তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। সে আলমদী গ্রামে প্রতিষ্ঠিত একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতাও করতো। নজরুল জানায়, নিহত রহিমা খাতুন তার প্রতিবেশী এবং চাচাতো ফুফু। রহিমার বাবা মৃত মোহাম্মদ আলী। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী এই নারী অন্তঃসত্ত্বা হলে এর দায় পড়ে নজরুলের ওপর। এ নিয়ে স্থানীয়ভাবে সালিশ দরবারে তার পরিবারকে মোটা অংকের জরিমানাও গুণতে হয়। পরবর্তীতে রহিমার ছেলে সন্তান জন্ম নেয়ার পর ছেলেটি নজরুলের বলে দাবি ওঠে। এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়ে নজরুল। দিন দিন তা অসহনীয় পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়। এ পরিস্থিতিকে শিশুটিকে অন্যত্র দত্তক দেয়ার চেষ্টা করা হয় নজরুল ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে। কিন্তু রহিমা তার শিশু সন্তানকে ছাড়তে নারাজ। নানা প্রলোভন হার মানে মাতৃত্বের কাছে। শিশুসন্তানকে নিজের কাছে রাখতে মরিয়া রহিমা। রহিমার এমন প্রবল আপত্তির মুখে শিশুটিকে দত্তক দিতে ব্যর্থ হয় তারা। এক পর্যায়ে শিশুটিকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করে নজরুল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ১৩ই জানুয়ারি রহিমা খাতুন ও তার শিশুপুত্র আমিরুলকে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে নজরুল বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। একটি অটোরিকশায় করে তাদের নিয়ে প্রথমে মঠখলা ও পরে নরসিংদীতে যায় নজরুল। সারাদিন বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে সন্ধ্যার পর নজরুল তার এক খালাবাড়ির কাছে উপজেলার এগারোসিন্দুর ইউনিয়নের আঙ্গিয়াদি এলাকার মিরারটেক বিলভরা গুদি বিলে নিয়ে আসে। রাত ৮টার দিকে আঙ্গিয়াদি মীরের টেক আতার বাড়ি কালভার্ট এর ওপর গিয়ে জোর করে রহিমার কোল থেকে শিশুপুত্র আমিরুলকে কেড়ে নেয় নজরুল। পরে জীবন্ত অবস্থায় তাকে বিলের পানিতে ছুড়ে মারে। এ সময় রহিমা তার শিশুপুত্রকে বাঁচাতে বিলের পানিতে নেমে পড়েন। নজরুল তার পিছু পিছু বিলে নেমে রহিমাকে জাপটে ধরে আটকায়। ফলে বাঁচার কোন সুযোগই পায়নি অসহায় শিশুটি। একপর্যায়ে বিলের পানিতে নজরুল রহিমাকে উপর্যুপরি চুবাতে থাকে। এক সময় রহিমা নেতিয়ে পড়ে। রহিমার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর কুচরিপানা দিয়ে দু’জনের লাশ ঢেকে দিয়ে নজরুল ঘটনাস্থল ছেড়ে যায়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আহুতিয়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই মতিউর রহমান জানান, নজরুল একজন নারীলিপ্সু তরুণ। হত্যা মামলাটির তদন্ত করতে গিয়ে তার সম্পর্কে নারী কেলেঙ্কারির আরো তথ্য পাওয়া গেছে। রহিমা খাতুনও তার লালসার শিকার হয়। কিন্তু সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ায় নজরুলের নাম চলে আসে। সালিশ দরবারে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিতও হয়। সালিশ দরবারে টাকা-পয়সা দিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হলেও পরবর্তিতে ওই নারী পুত্রসন্তান জন্ম দেয়ার পর বিষয়টি পুনরায় আলোচনায় আসে। এ সময় নজরুলের ওপর রহিমাকে বিয়ের চাপ বাড়তে থাকে। এ পরিস্থিতিতে রহিমার শিশুপুত্রকে নজরুল তার পথের কাঁটা মনে করে তাকে অন্যত্র দত্তক দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু মা রহিমার অস্বীকৃতিতে শিশুটিকে দত্তক দেয়ার পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। পরে হত্যার পরিকল্পনা করে এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী সেটি বাস্তবায়ন করে নজরুল আত্মগোপনে চলে যায়। হত্যাকাণ্ডের ৮দিন পর গত ২১শে জানুয়ারি মিরারটেক বিলভরা গুদি বিল থেকে গলিত অবস্থায় রহিমা খাতুনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরদিন ২২শে জানুয়ারি এই ঘটনায় নিহত রহিমার বড় ভাই আবদুল আউয়াল বাদী হয়ে হত্যা ও গুমের অভিযোগ এনে নজরুল ইসলাম, নজরুলের ছোট ভাই দ্বীন ইসলাম (১৮), বাবা সোহ্‌রাব উদ্দিন ও মা মদিনা খাতুনকে আসামি করে পাকুন্দিয়া থানায় মামলা করেন। রহিমা খাতুনের লাশ উদ্ধারের ১০দিন পর একই স্থান থেকে ৩১শে জানুয়ারি সন্ধ্যায় শিশুপুত্র আমিরুলের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ পরিস্থিতিতে মূল অভিযুক্ত নজরুলকে ধরতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অবশেষে বৃহস্পতিবার ভোরে ফেনী জেলার দাগনভূঞার শ্রীরামপুর এলাকার একটি বাড়িতে আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় নজরুলকে আটক করতে সক্ষম হয় পুলিশ। একই অভিযানের সময় পার্শ্ববর্তী গজারিয়া এলাকা থেকে নজরুল ইসলামের বাবা সোহ্‌রাব উদ্দিন (৫০) ও মা মদিনা খাতুন (৪৫) কেও গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতরা প্রাথমিক জিজ্ঞাসবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করায় তাদের নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পুলিশ। ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা দেয় নজরুল। নজরুল জানায়, সে একাই এই জোড়া খুনের ঘটনা ঘটিয়েছে। শুক্রবার দুপুরে আদালতে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও সে নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের লোমহর্ষক বর্ণনা দিয়েছে। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের পর ঘাতক নজরুল এবং তার বাবা সোহ্‌রাব উদ্দিন ও মা মদিনা খাতুনকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া এই মামলায় আগেই গ্রেপ্তার দ্বীন ইসলাম এবং ইমরান কারাগারে রয়েছে বলে এসআই মতিউর জানিয়েছেন।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

রোহিঙ্গা নির্যাতন: মিয়ানমারের মহামূল্যবান রত্ন শিল্পে আঘাত

‘এটা আমার জন্য বড় একটি ব্যাপার’

২০ লাখ পাউন্ড ঘুষ কেলেঙ্কারিতে বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ও সাবেক ডেপুটি-মেয়রের নাম

পাচার অর্থ ফেরতে নানা জটিলতা

ম্যানহাটন হামলায় আটক ব্যক্তি বাংলাদেশি?

২৯ রোহিঙ্গা নারীর মুখে ধর্ষণযজ্ঞের বর্ণনা

বাংলাদেশের দুই নেত্রীর লড়াইয়ের ইতি

বাড়ির পাশে ম্যারাডোনা

আওয়ামী লীগকে হারানোর মতো কোনো দলই নেই

৩ দিনের সফরে ফ্রান্স গেলেন প্রধানমন্ত্রী

৫০ শতাংশের বেশি মানুষ মানসম্পন্ন সেবা পায় না

বিএনপি’র পিন্টু না টুকু নতুন প্রার্থীর খোঁজে আওয়ামী লীগ

তন্নতন্ন করে খুঁজেও বিদেশে সম্পদের অস্তিত্ব মেলেনি

ঢাকা-রংপুর ফাইনাল আজ

জনগণের মুখোমুখি রসিক মেয়র প্রার্থীরা

‘যাদেরকে টিফিন খাওয়ালো তারাই হত্যা করলো’