শিক্ষা কেন পণ্য হবে?

মত-মতান্তর

এম এম ওবায়দুর রহমান | ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শহরে থাকা পরিবারগুলোর বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত। যাদের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় বাড়িওয়ালাদের পকেটে। প্রতিবছর নিয়ম করে জানুয়ারি মাসে ভাড়া বাড়ানোর নোটিশ পাওয়া যায়। ভাড়াটেদের জন্য কেউ নেই। বাড়িওয়ালার মর্জির উপর বাস করতে হয় তাদের। এরপর জানুয়ারি মাসের বড় ধকল হলো সন্তানদের স্কুল/কলেজের সেশন ফি, পুনঃভর্তি, নতুন বইসহ নানান সরঞ্জামের খরচ। এখানেও সেই বাড়িওয়ালাদের মতোই যার যেমন ইচ্ছা নিয়ে থাকেন। কোনো আইন নেই। কৈফিয়ত চাইবার অধিকার নেই অভিভাবকদের!
রাজধানীসহ আশপাশের জেলা-শহরগুলোতেও গড়ে উঠেছে অসংখ্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এগুলোর প্রতিষ্ঠাতাদের অনেকেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে তারা তাদের অনৈতিক বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। যার ফলে কোনোরকম আইনের তোয়াক্কা করা হয় না। স্কুল ড্রেস, বই-খাতাসহ লেখাপড়ার সকল সরঞ্জাম বাজারের চেয়ে দ্বিগুণ দামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা তাদের মনোনীত দোকান থেকে কিনতে হয়। ক্লাসের বাইরেও প্রায় জোর করে এক্সট্রা কোচিং ক্লাস করতে বাধ্য করা হয়। সরকারি বইয়ের বাইরেও আরো ডজন খানেক বই কিনতে হয়। বই থেকে কি শিখবে বা কতটুকু শিখতে পারার সক্ষমতা ছাত্র-ছাত্রীর রয়েছে সেটা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। কেউ ভাবে না এতটুকু বাচ্চা এতগুলো বই পড়ে কি করবে? শিক্ষা যেন প্রায় জোর করেই বোঝার মতো চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার আনন্দ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বই আর ক্লাস ও কোচিংয়ের চাপে ওদের জীবন বিষাদময় হয়ে পড়ছে। তার উপর রয়েছে সরকারের একেক সময় চাপিয়ে দেয়া একেক রকম পরীক্ষা আর গ্রেডিং পদ্ধতি। সরকার বদল হলে ক্লাসের বইও বদলে যায়। ইতিহাস বদলে যায়। এসবের বাইরেও রয়েছে সরকারের পজিটিভ সিদ্ধান্তগুলোর নেগেটিভ ব্যবহার। আমি যখন এই লেখা তৈরি করছি তখন একটি অনলাইন পত্রিকায় শিরোনাম ভেসে এলো... শিক্ষক সমিতির অসাধু নেতারা শিক্ষার্থীদের মাঝে নিম্নমানের গাইড বই চালিয়ে দেয়ার জন্য গ্যালাক্সী প্রকাশনী সংস্থার সঙ্গে ৬ লাখ ১০ হাজার টাকা ও ৫৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি ল্যাপটপ দেয়ার চুক্তি হয়। এ বিষয়ে একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা সত্যতা স্বীকার করেন। ঐ প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় যে, ১৫০ টাকার নিম্নমানের ঐ নোটবই ছাত্রদের কিনতে হচ্ছে ৪৬০ টাকা দিয়ে!! অথচ গাইড বা নোট বই বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব দেখার যে কেউ নেই। সারা দেশেই চলছে এ রকম অনৈতিক কর্মকাণ্ড। শহরের বেশির ভাগ স্কুল-ই গড়ে উঠেছে রাস্তার পাশের মার্কেট বা আবাসিক ভবনে। নিজস্ব ক্যাম্পাস নেই। পর্যাপ্ত মাঠ নেই। খেলার পরিবেশ নেই। সুস্থ সাংস্কৃতির চর্চাও নেই আগের মতো। ইট কাঠের খাঁচায় বেড়ে ওঠা এই শিশুদের শৈশব নিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ভাবছে না। তারা শুধু আয় বাড়াতে চাইছে। শিক্ষা এখন লোভনীয় ব্যবসায়িক পণ্য। রঙ মেখে ফরমালিন লাগিয়ে তাকে বেশি দামে বিক্রি করাই যেন নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শষ্যের মধ্যই ভূত- এই দেশের সকল সেক্টরে তাই ভূত তাড়ানোর কেউ নেই।
প্রকৌশলী ও লেখক

 
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

ইব্রাহিম খলিল

২০১৭-০২-০৮ ০১:০১:০০

অসাধারণ লিখেছেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন, ধীরে ধীরে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কসাই খানায় পরিনত হচ্ছে, এখন যারা ঘোষখোর সূদখোর চাদাবাজ ধান্দাবাজ তাদের সন্তনদেরকেই লেখা পড়া করাতে পারবে, কারন তারা অসত ভাবে টাকা কামাবে আর অসত ভাবেই খরচ করবে যত মরন হয়েছে মধ্যবিত্তদের।

আপনার মতামত দিন