আড্ডা

মত-মতান্তর

কাজী সুলতানা শিমি, সিডনি থেকে | ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার
জীবনের নানামুখী কর্মব্যস্ততায় আজ-বন্ধু, কি খবর বল’ এই অনুভুতি, স্পৄহা, আড্ডা সব হারিয়ে ফেলতে বসেছি! ছেলে-মেয়ের জন্য কিংবা বন্ধুদের জন্য একটুখানি সময় বের করার সময় যে হয়না তা কিন্ত নয়, কিন্তু সেই কষ্ট করে বের করা সময়ে ও আমরা জড়িয়ে ফেলি নানা রকম সংগঠন, জন-কল্যাণ কিংবা পেশাদার কিছু করার কাজে। শুধু আড্ডা দেয়া কে আজ আমরা কোনো গুরুত্বপূর্ণ কিছু মনে করিনা। মনে করি-ধু্র্, আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করার মতো সময় কোথায়!!!
আসলে জন্মগত ভাবে মানুষ মাত্রই কিছু না কিছু প্রতিভার অধিকারী, আর এই প্রতিভার বিকাশ হয় প্রানবন্ত আড্ডা থেকে। খ্যাতনামা অনেক সাহিত্য রচনার প্রেরণা হয়েছে সাদাসিদে ঘরোয়া আড্ডা থেকে। বলা যায় ঘরোয়া আড্ডা সংস্কৃতি-চর্চার সুতিকাগার। সংগঠন বা প্রাতিষ্ঠানিক মোড়কের বাইরে ঘরোয়া আলোচনায় একটা অর্থবহ আড্ডার উদ্দেশে যদি সাপ্তাহ শেষে কোথাও বসা যায় তাতে কিন্তু অনেক কিছু শেয়ার করার থাকে, বাচ্চারা কিংবা আমরা বড়রা ও নতুন কিছু জানতে বা শিখতে পারি। খালি মুখে বা পেটে ক্ষুদা নিয়ে আড্ডা জমেনা তাই সবাই একটা করে রান্না করা খাবার যদি সাথে নিয়ে আসি তাহলে খাবার চিন্তা ও আর থাকেনা কেবল জমিয়ে আড্ডা মারা। এক্ষেত্রে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির ওয়ান-ডিশ বা শেয়ার-লাঞ্চ এর ধারণাটা কিন্তু খারাপ না, জমিয়ে আড্ডা মারার জন্য। আড্ডা দিতে হলে আড্ডার জন্যেই বসতে হবে, ভুড়ি-ভোজনের সাথে মিলিয়ে বা গুলিয়ে ফেলা যাবেনা। পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে ওয়ান-ডিশ একটা অতান্ত স্বাভাবিক ব্যাপার যা আন্তরিকতার প্রকাশ। বাংলা সংস্কৃতিতে আড্ডার ক্ষেত্রে তা উদার মনে গ্রহণ করা দরকার কেননা বিদেশী সব সংস্কৃতিই যে খারাপ তা কিন্তু নয়।     
আড্ডা বাঙালী মননের একটা অনিবার্য-চাহিদা, বলা যায় আকুতি ও তৃষ্ণা । আজ আমরা নিরন্তর বাস্তব জীবনে, আড্ডা দেয়ার জন্য যেটুকু সময় খুজে বের করি তা শুধু জমা রাখি সপ্তান্তে জন্মদিন কিংবা বিয়ে'র দাওয়াত এর জন্য। আসলে সেটাকে বলা যায় ভুড়ি-ভোজন, বলা যায়না সত্যিকারের আড্ডা। বিয়ে বা জন্মদিন কে আড্ডা বলা যায়না এজন্য যে আয়োজনটা বাক্তি কেন্দ্রিক বা উপলক্ষ-ভিত্তিক। আড্ডা মানে শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি–চর্চার কিংবা যে কোনো ঘটনার তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। এক কথায় বলা যায় ঘরোয়া শিল্পচর্চা।
মানসিক-স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তি"' বিষয়ে গবেষণা করার জন্য কিছু আন্তর্জাতিক পাব্লিকেশান ঘাটাঘাটি করে যা বুঝা গেলো, তার সারকথা হল আড্ডা সুস্থ মানসিক বিকাশে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যাবতীয় হতাশা ও দুঃচিন্তা দূর করার জন্য আড্ডার ভুমিকা অসামান্য। অথচ আজকের তরুণতরুণীরা জানেনা সত্যিকারের আড্ডা কি। আড্ডা হবে সার্বজনীন ও উন্মুক্ত, হতে পারে শিল্পসাহিত্য, গল্প-কবিতা কিংবা সমসাময়িক ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা নিয়ে তুমুল বিতর্ক। মনে পরে ছোটবেলার এলেবেলে হাসিকান্না, সুখ-দুখ, রাগ-বিরাগ আর মনোমালিন্যর সেই শর্তহীন দিন গুলো, আমাদের বাচ্চারা যা থেকে বঞ্চিত।ওরা জানেনা আনন্দ অভিমান, জানেনা বিষাদ মধুর সম্পর্ক কাকে বলে শুধু জানে কম্পিউটার, আইপেড আর ভিডিও গেম। আসলে আমাদেরও কিছু দায় আছে তাদের কাছে। আমরা কতোখানি সময় ওদেরকে দিই। এই মানবিক সম্পর্ক জানার জন্য, বোঝার জন্য- আমরা শুধু জানি ওদের পড়াশুনা করতে হবে, ভাল রেজাল্ট করতে হবে আর তখন ওরাও আমাদের ফাঁকি দেয়ার জন্য খোঁজে নানা পরিকল্পনা। আসলে আমাদের নিজেদের ও বাচ্চদের সাথে একটা বন্ধন তৈরি করার জন্য প্রয়োজন তাদের জন্য একটু সময় বের করার, প্রয়োজন নানামুখী বিনোদনের আয়োজন করা যা কিনা তাদের সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য জরুরী। আজকালকার দুই প্রজন্মর মধ্যে দূরত্ব যোজন যোজন, এই দূরত্ব ঘোচাবার দায় আমাদেরই কারণ আমরাই এজন্য দায়ী বয়োজ্যেষ্ঠ হিসাবে। দূরত্ব ঘোচাবার জন্য আড্ডা হতে পারে একটা উৎকৃষ্ট উদাহরন।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য সিডনীর অদূরে পীটটাউন ডুরালে নীপবন পল্লী’ নামে কিছু বাংলাদেশী পরিবার এরকম একটি আড্ডার আয়োজন করে সম্পূর্ণ ঘরোয়া আয়োজনে। বিভিন্ন সময়ে বিশেষ করে বাংলাদেশী জাতীয় সংস্কৃতি বিকাশের উদ্দেশে। সবাই একটা করে বাংলা-ডিশ বা বাঙ্গালী খাবার” নিয়ে আসায় খাবারের আয়োজন নিয়ে ভাবতে হয়না, দ্বিধা-হীনভাবে আড্ডা দেয় অনেকটা সময়। বাচ্চারা ও বড়রা যে যা পারে গান, কবিতা, গল্প-কথায় অনেক আনন্দের একটা ঘরোয়া আড্ডা হয় সাথে কিছুটা সংস্কৃতিচর্চাও। এভাবে ঘরোয়া সংস্কৃতিচর্চা কিন্তু পরবর্তীতে মঞ্চে দাঁড়ানোর মতো পারদর্শী করার সাহস ও সুযোগ তৈরি করে। সত্যি বলতে কি জন্মদিন বা বিয়ের আয়োজন ছাড়াও এ ধরণের ঘরোয়া আড্ডায় বাচ্চারা অনেক কিছু জানে, শিখে ও উপলব্ধি করতে পারে। আমাদের অনেকেরই জনসমক্ষে সাবলিল ভাবে কথা বলার মতো সাহসিকতা বা মানসিকতা নেই, যা কিন্তু পাশ্চাত্যর কর্ম ও বাস্তব জীবনের জন্য একটা প্রয়োজনীয় দক্ষতা। ঘরোয়া আয়োজন গুলো সে জড়তা কাটাতে অনেকটা সাহায্য করে। এমনিতে শুধু জন্মদিন বা বিয়ে ছাড়াও যে পারস্পারিক দেখাশুনা হতে পারে ঘরোয়া আড্ডা আসলে সেজন্য ও দরকার।
এই কর্পোরেট ভুবনে আবেগের কোন মূল্য নেই জানি--শুধু অর্থ, যশ আর প্রতিপত্তির পিছে লাগামহীন ভাবে ছুটছে সবাই। আবেগ শূন্য এই পারস্পারিক সম্পর্ক নুতন করে কি ঘরোয়া আড্ডা।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন