সেশনজট সমাচার

মত-মতান্তর

সাদিকুর সাত্তার আকন্দ | ২৭ জানুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৮
অনেক বিষয় নিয়েই আলোচনা হয়ে থাকে বিভিন্ন সময়ে। কিছু কিছু বিষয় আছে যেগুলো আলোচনায় রয়ে যায় দীর্ঘ সময় ধরে। আবার সময়ের পরিবর্তনের সাথে অনেক বিষয় আর আলোচনায় থাকেনা। দীর্ঘ সময় ধরে আলোচিত একটি বিষয় হিসেবে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে সেশনজট’ বিষয়টি সব সময় রয়েছে শিক্ষিত শ্রেণীর আলোচনায়। সেশনজট শব্দটি উচ্চারণ করলে এর উল্টা পিঠে আরেকটি শব্দ মনের মধ্যে ভেসে ওঠে। সেটি হলো পিছিয়ে পড়া। সেশনজট বললেই মূলত পিছিয়ে পরার চিত্র আমরা মনের মধ্যে কল্পনা করি।
সেশনজট বলতে আমরা সাধারণত নির্দিষ্ট সময়ে কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি পূর্ব নির্ধারিত শিক্ষা কারিকুলাম ও প্রসিডিউর শেষ করতে না পারে সেই অবস্থাটাকে বুঝে থাকি। সেশনজট সাধারণত উচ্চ শিক্ষা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতেই লক্ষণীয়। রাষ্ট্র প্রতিটি উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট আইন ও নিয়ম-কানুনের আওতায় এনে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেন শিক্ষা প্রক্রিয়া বা বর্ষ শেষ হয় সেভাবেই নির্দেশনা দিয়ে থাকে। প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নির্দিষ্ট বিধি মোতাবেক শিক্ষা বর্ষের সময় নির্ধারণ করে থাকে। শিক্ষার্থীরা ঐ নির্দিষ্ট সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়ন করবে এবং পূর্বনির্ধারিত সময় শেষে নিজ নিজ বিষয়ের উপর সনদপত্র পাবে এমনটাই স্বাভাবিক বিষয় হওয়ার কথা। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য, দেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই সেই নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষার্থীদের পাঠদান কর্মসূচি শেষ করতে পারেনা। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রায় প্রতিটিতেই কোন না কোন বিভাগ বা বিষয়ে কম-বেশি সেশনজট লেগে আছে। ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর মিলে যে শিক্ষাবর্ষ শেষ হওয়ার কথা পাঁচ বছরে সেটাই শেষ করতে পেরিয়ে যাচ্ছে প্রায় আট বছর। এভাবে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে শুধু তিন চারটে বছরই জলাঞ্জলি যাচ্ছে না। পরে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের মুখোমুখি হলে দেখা যাচ্ছে তাদেরকে সেখানেও তিন-চার বছর চাকরির জন্য ধরণা ও দরখাস্ত নিয়ে গুরতে হচ্ছে। এভাবেই মূল্যবান জীবনের সার অংশের প্রায় এক দশকই দুর্বিষহ ভোগান্তির মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পরিণামে শিক্ষার্থীরা জীবন ও ভবিষ্যৎ থেকে ভয়াবহভাবে পিছিয়ে পড়ছে। এই যদি হয় বাস্তবতা তো সেই নাগরিক জীবন কি করে বলবান হতে পারে?
গত দশ-বার বছরে দেশে অনেকগুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। একটু খেয়াল করলে দেখা যায়, নতুন প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। চার বছরের ¯œাতক কোর্স শেষ করতে সময় পার করতে হচ্ছে ৬-৭ বছর। এক বছরের ¯œাতকোত্তর কোর্স শেষ করতে দুই আড়াই বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। উচ্চ শিক্ষাতেই যদি নির্ধারিত সময়ের দ্বিগুণ বেশি সময় পেরিয়ে যায়, তো একজন শিক্ষার্থী ওই বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় সময়টা কি করবে? নির্ধারিত শিক্ষাবর্ষ শেষ করতে শিক্ষার্থীদের জন্য যে চাপ ও নিয়মানুবর্তিতা থাকার কথা তার অবর্তমানে বাড়তি অলস সময়টিতে শিক্ষার্থীরা নানা বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ে। অনেকে বিভিন্ন মূল সংগঠনের ব্যানারে সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, সিট বাণিজ্য, চাঁদাবাজি ইত্যাদিতে মশগুল হয়ে পড়ে। ফলে মেধা ও প্রতিভা বিকাশের পথ এখানেই রূদ্ধ হয়ে যায়। কারণ একবার মন কোন নেতিবাচক কর্মে নিমজ্জিত হলে সেখান থেকে ইতিবাচক পথে ফিরে আসা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। পরিণামে ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়েও উঠে আসছে না দেশের ভবিষ্যৎ কান্ডারি হওয়ার মতো কোন মেধাবি নেতা। সেশনজটের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে না বেরিয়ে আসতে পারছে দেশের প্রশাসনকে মেধাবী প্রশাসন করার মতো যোগ্য কান্ডারি, না বেরিয়ে আসতে পারছে দেশ পরিচালনার জন্য যোগ্য নেতৃত্ব।
একটি দেশ উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার জন্য যে সকল নিয়ামকের ইতিবাচক উপস্থিতি প্রয়োজন, বাংলাদেশে তার প্রতিটাই বিদ্যমান আছে। শিল্প, সাহিত্য, চিকিৎসা, পরিবেশ, নাগরিক সন্তুষ্টি, নারীর ক্ষমতায়নসহ সকল খাত ও ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন অনেক দেশের  জন্যই পাথেয়। সুতরাং শিক্ষাক্ষেত্রে এই ‘সেশনজট’ সমস্যাটি আমাদের সার্বিক সৌন্দর্যকে বিনষ্ট করছে অথবা ভবিষ্যতে করতে পারে। যেহেতু শিক্ষাই সকল উন্নয়ন ও উন্নতির মূল প্যানসিয়া, সুতরাং শিক্ষা খাতের কোন একটি ক্ষেত্রে কোন ধরণের অনিয়ম ও অবহেলা গোটা জাতিকে পিছনে ফেলে দিতে পারে।
সেশনজট একজন শিক্ষার্থীর জীবনে অভিশাপের মতো। এই অভিশাপ ও ভয়াবহ অবস্থাকে কাটিয়ে প্রত্যেকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্ধারিত ও নির্দিষ্ট সময়ে শিক্ষাবর্ষ শেষ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত চটজলদি। দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উন্নয়নের কান্ডারী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে অতি দ্রুত সরকার ও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে এসে ‘সেশনজট’ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

লেখক: শিক্ষার্থী, এমবিএ প্রোগ্রাম, ফিন্যান্স এ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন