বাবার পেনশনের ৮৫ হাজার টাকা দিয়েই শুরু ল্যাবএইড

প্রথম পাতা

কাজল ঘোষ | ২৩ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩৩
ছেলেবেলা থেকেই চিন্তা ছিল নতুন কিছু করবেন। যা হবে গতানুগতিকতার বাইরে। বিএসএস দিয়ে মেধা তালিকায় টিকেছেন। যোগ দিয়েছেন সরকারি হাসপাতালে। কিন্তু থেমে থাকেননি। কর্ম-অভিজ্ঞতায় নিজেকে বারবার ঠেলে দিয়েছেন চ্যালেঞ্জের দুয়ারে।
স্বাস্থ্যখাতে মানুষের দুর্ভোগ-কষ্ট লাঘবে উদ্যোগ নিতে থাকেন একের পর এক। সফলতাও আসে। শুরুটা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। দেশসেরা ৮জন চিকিৎসক নিয়ে শুরু করেছিলেন মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেয়ার কাজ। আজ সেখানে কাজ করেন প্রায় ৭,০০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী-চিকিৎসক। বাবার দেয়া পেনশনের ৮৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হয়ে ছিল সেই উদ্যোগ। আজ সেখানে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। একে একে হয়েছে স্পেশালাইজড হাসপাতাল, কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ফার্মাসিউটিক্যালস, ইউনিভার্সিটি। তবুও উদ্যোগ থেমে নেই। আরও নতুন নতুন উদ্যোগ আসছে। আর এই সাফল্যের মূল সূত্র শূন্যতা পূরণে কাজ করে যাওয়া, দেশকে ভালোবাসা, সৎ থাকা আর পরিবারের প্রতি দায়িত্বশীলতা। বলছিলাম ল্যাবএইডের প্রতিষ্ঠাতা ডা. এএম শামীমের কথা। কঠোর পরিশ্রম আর কর্মবিশ্বাসী ডা. শামীমের কুমিল্লায় জন্ম হলেও বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব কেটেছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। ময়মনসিংহ জেলা স্কুল, সিলেট জেলা স্কুল, কুমিল্লা জেলা স্কুল ও ভিক্টোরিয়া কলেজে কেটেছে পড়াশোনার প্রথমভাগ। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং লিভারপুল থেকে ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ওপর ডিপ্লোমা করেন। এরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রেডিওলজির ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করেন। পারিবারিক জীবনে পিতা আলী আহমেদ ভূঁইয়া ছিলেন সরকারি চাকুরে, মাতা সালেহা আহমেদ। স্ত্রী ডা. সুচরিতা আহমেদ। দুই পুত্র শাকিব, সায়ের এবং কন্যা পারিশাকে নিয়েই পারিবারিক গণ্ডি। মানবজমিনকে দেয়া দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে ডা. শামীম বলেছেন নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কীভাবে সাফল্যের দীপশিখা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন।

প্রশ্ন: শুরুর দিনের কথা জানতে চাই?
বড় হতে হবে, মানুষের মতো মানুষ হতে হবে এমন ইচ্ছা ছিল ছেলেবেলা থেকেই। সবসময় ভেতরে একটা প্রতিযোগিতা কাজ করতো। যদি পরীক্ষা দিই তবে ভালো পরীক্ষা দেবো আমি যেন প্রথম হতে পারি। যদি বাগান করি তবে সবচেয়ে ভালো বাগান করবো। যদি খেলায় অংশ নিই তবে প্রথম হবো। ভেতরে ভেতরে সবসময় এমন একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করেছি। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। চাকরির সুবাদে বাবার বদলির সঙ্গে-সঙ্গে আমাকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় যেতে হয়েছে। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানের নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ পেয়েছি সে সময়। আর এই অভিজ্ঞতাগুলো চলার পথে নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। ডাক্তারি পড়ার পেছনে একটা ইচ্ছা কাজ করেছে। তা হলো- ছেলেবেলায় দেখতাম মফস্বল শহরে যারা চিকিৎসক সবাই তাদের খুব শ্রদ্ধার চোখে দেখে। তাছাড়া ডাক্তাররা সাধারণত সৎ হন। তখন থেকেই মনে হতো- বড় হয়ে ডাক্তার হবো। সংকল্প অনুযায়ী পড়াশুনাও করতে লাগলাম। তখন সেরা ছাত্রদেরই মেডিকেল কলেছে ভর্তির সুযোগ হতো। আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে মেধা তালিকার সেরা বাংলাদেশের এই ব্যাচের ১০০ জনের মধ্যে ছিলাম। ফলে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাই।

প্রশ্ন: সাফল্যের পেছনে মূল সূত্রগুলো কি ছিল?
সফলতার পেছনে বেশকিছু সংকল্প ও প্রতিজ্ঞা সহযোগিতা করেছে। যখন থেকে বুঝতে শুরু করেছি তখন থেকেই মনে হতো যাই করি না কেন নিজের দেশকে, মাতৃভূমিকে ভালোবাসতে হবে। ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেছি। বারবার একটি কথাই মনে হয়েছে, নিজের দেশের ব্যাপারে কখনও কম্প্রোমাইজ করবো না। আর কখনও খারাপ কিছু করবো না। এমন কিছু করবো না যেন বাবা-মা ছোট হয়ে যান। অর্থাৎ তিনটি প্রতিজ্ঞা কাজ করেছে- ১. দেশকে ভালোবাসা, ২. খারাপ কিছু না করা আর ৩. বড় হওয়া। এই তিনটি প্রতিজ্ঞাই আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে।

প্রশ্ন: সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা থেকে কি শিক্ষা নিলেন?
১৯৮০-৮৫ পর্যন্ত স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির পক্ষে ছাত্র রাজনীতি করেছি। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ইন্টার্নি শেষে ১৯৮৬ সালে গ্লাসগোতে বৃটিশ বার্সারির স্কলারশিপ পেলাম। একই সময়ে বিসিএস দিয়ে প্রথম পনেরো জনের মধ্যে নির্বাচিত হই। বিএসএস-এ চাকরি জীবনের প্রথম পোস্টিং হয় গোপালগঞ্জে।
পরিবারের প্রতি আমি খুব সংবেদনশীল। পড়াশুনা করার সময় বা এর আগে পরে কখনই পরিবার বিচ্ছিন্ন ছিলাম না। ১৯৮৬ সালে চাকরিতে যোগ দিয়ে প্রথমবারের মতো বাবা-মা’কে ছেড়ে বাইরে যেতে হয়েছিল। ঢাকা থেকে তখন গোপালগঞ্জের যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিলো না। বাসা থেকে যখন বিদায় নেবো বাবা-মায়ের চোখে দেখি অশ্রুবিন্দু। মন খারাপ হলেও চাকরিতে যোগ দিতেই হবে। সময়টা ছিলো শীতকাল। গোপালগঞ্জ নেমে নৌকায় করে দিন শেষে টুঙ্গিপাড়ায় যখন পৌঁছি তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রিকশা ছিল না। তাই নৌকো থেকে নেমে একটি ভ্যানে চড়ে যাচ্ছি চোখে পড়লো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কবর। সাধারণ একটা বাড়ি। খুবই সাদামাটা পাশাপাশি দু’টি কবর। যিনি জানাযায় ইমামতি করেছেন তিনি পাশেই থাকতেন। তার সঙ্গে দেখা করে পঁচাত্তরের সেই নির্মম দিনটির ঘটনার কথা শুনে ঠাই কিছুক্ষণ অবস্থান করি। খারাপ লাগলো, যিনি দেশের স্বাধীনতা এনেছেন, বাংলাদেশ দিয়েছেন অথচ কতো সাধারণভাবে ঘুমিয়ে আছেন।
টুঙ্গিপাড়ায় তখন বিদ্যুৎ ছিল না। বড় কোনো হাসপাতাল হয়নি। যেখানে হাসাপাতাল স্থাপিত হয়েছিল ওটা দেখতে অনেকটা ডিসপেনসারির মতোই। প্রথমদিন রাতেই একটি ডেলিভারির রোগীর খবর পেলাম। রাত এখন ১টা, হাসপাতাল থেকে পিয়ন এসে বলল, একজন রোগী এসেছে, তার বাচ্চা আটকানো। জানতে পারলাম, নদীর ঘাটে নৌকায় রোগীকে রাখা হয়েছে। অন্ধকারে চললাম নদীর ঘাটে। গিয়ে দেখি, নদীর ধারে শাড়ি দিয়ে ঢাকা ছইওয়ালা নৌকায় মহিলা কান্নাকাটি করছেন। বাচ্চার পা বেরিয়ে এসেছে। সঙ্গে একজন দায়কে নিয়ে ধীরে ধীরে বাচ্চা ডেলিভারির ব্যবস্থা করলাম। পরদিন সকালে হাসপাতালে রোগি দেখছি। প্রায় দু’-তিনশ ’রোগী। চাপাশে রোগীদের ভিড় এর মধ্যে এক রোগীর মা এসেছেন দেখা করতে। সঙ্গে করে ২০/২৫টি ডিম নিয়ে এসেছেন। বুঝতে পারলাম, কাল রাতে যার ডেলিভারি হয়েছে তিনি তার মা। খুশি হয়ে আমার জন্য এগুলো নিয়ে এসেছেন। এমন সরলতায় ভরা আমাদের মানুষ। অথচ তাদের চিকিৎসার ভালো ব্যবস্থা নেই এটা ভেবে খুব মন খারাপ হতো।

প্রশ্ন: ল্যাবএইড প্রতিষ্ঠার নেপথ্য কাহিনী বলবেন কি?
আমাদের সময় ডাক্তারির সবচেয়ে বড় ডিগ্রি হচ্ছে এমআরসিপি। লন্ডনের লিভারপুলে পড়তে গিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি। সেখানে ল্যাবরেটরি দেখে ভেতরটা হু-হু করে ওঠে। ভাবি আমরা এখনও কোথায় আছি? ১৯৮৫-৮৬ সালের কথা বলছি, ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে একটিই ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছিল। পুরনো আর অল্পকিছু যন্ত্রপাতি ছিল। এর বেশিরভাগ পরীক্ষা-নিরীক্ষা আবার সরকারি হাসপাতাল থেকে করা হতো। সব দেখে মন ভেঙে গেল।  ভাবলাম একটি ভালো ল্যাব করা যায় কি না? যেখানে উন্নত যন্ত্রপাতি দিয়ে সবরকম পরীক্ষা করা যাবে।
১৯৮৬ সালের ঘটনা। দু’-তিন বন্ধু মিলে শুরু করি গ্রীন ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যুদ্ধটা শুরু সেখান থেকেই। কাজ করতে গিয়ে দেখলাম টেকনিশিয়ানের বড্ড অভাব ছিল। পুরো ঢাকায় হাতেগোনা দুই-একজন টেকনেশিয়ান। রোগীদের কাছ থেকে পরীক্ষার জন্য রক্তসহ অন্যান্য কিছু নিয়ে বসে থাকতে হতো। তার ওপর রোগীদের নানান কথাবার্তা। কি ভাই কখন পাবো রিপোর্ট? বণিক বাবু নামে একজন বায়োকেমিস্ট ছিলেন। যিনি ঘুরে-ঘুরে সব ল্যাবেই কাজ করতেন। আর বেশির ভাগ পরীক্ষা করাতে হতো ঢাকা মেডিকেল থেকে। তখন আমরা মেশিন কিনলাম কিন্তু টেকনোলজিস্ট নেই। কি করি? আমার পরিচিত ছিলেন ড. মিজানুর রহমান। তিনি সে সময়ের পিএসসি মেম্বার। পিএসসি থেকে সে সময়ই অবসর গ্রহণ করেছেন। স্যারকে বললাম, চলুন একটি টেকনলজিস্ট তৈরির জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করি। মিজান স্যারকেই এর প্রিন্সিপাল করলাম। এভাবেই ১৯৮৯ সালে চালু করি ‘বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল টেকনলজি’ যা সংক্ষেপে বিআইএমডিটি নামে পরিচিত। সেই সময় এই উদ্যোগ অনেকটা বিপ্লব এনে দিয়েছিল। বর্তমানে আমার অধীনেই প্রায় চারশ’ টেকনলজিস্ট কাজ করে। একসময় রাতে যেখানে টেকনোলজিস্টের দুশ্চিন্তায় ঘুম হতো না। এখন সে সেক্টরে একটি বড় দরোজা খুলে গেছে। এটাই ছিল আমার প্রথম উদ্যোগ। বর্তমানে এ সেক্টরে সারা দেশ অন্তত ৫০ হাজার টেকনোলজিস্ট কাজ করছে।
গ্রীন ডায়াগনস্টিকের অংশীদার বন্ধুরা সকলেই বাইরে পড়তে গেল। আমিও বৃটিশ স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে পড়তে গেলাম। স্কলারশিপের আর্থিক মূল্য ছিল সে সময়ের দশ হাজার পাউন্ড। পড়তে গিয়েছিলাম লন্ডনের লিভারপুলে। আমি দেশে ফিরলেও বন্ধুরা কেউই ফিরলো না। দেশে এসে নানান পরিস্থিতির মুখোমুখি হলাম। দেখলাম, রাজধানীর বাইরে থেকে কোনো রোগী যদি একাধিক সমস্যা নিয়ে আসেন। তবে একেক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দেখাতে রোগীদের একেক জায়গায় দৌড়াতে হয়। রোগীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। ২-৩ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও যেতে হতো একেক জায়গায়। এটা একই সঙ্গে যেমন সময়সাপেক্ষ তেমনি ব্যয়বহুল। তাছাড়া ভোগান্তি তো ছিলোই। কিন্তু যদি এক ছাদের নিচে সবকিছু নিয়ে আসতে পারি তাহলে তো এই সমস্যা দূর হয়ে যায়। সেই চিন্তা থেকে ডাক্তার-চেম্বার, ডায়াগনস্টিক ল্যাব ও ফার্মেসির সমন্বয়ে শুরু করি ল্যাবএইড। এক ছাতার নিচে ৩ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা এবং একই সঙ্গে সবরকমের স্বাস্থ্যসুবিধা নিশ্চিত করি।
১৯৮৯ সালে ২৬শে মার্চ দেশের সেরা ৮ জন ডাক্তার আর বাবার পেনশনের ৮৫ হাজার টাকা দিয়ে শুরু করি ল্যাবএইড। আজ ৭০০০ কর্মচারী আর হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ। সবই বাবার দেয়া ৮৫ হাজার টাকা বিনিয়োগের বরকত। গ্রীন ডায়াগনস্টিক ভেঙে যাওয়ায় মালিকানা থেকে দশ লাখ টাকা পেলাম। সেই দশ লাখ টাকার চেক ভাঙাতে পারিনি। বাড়ি ভাড়া নিলাম। কিন্তু সবশুনে মালিক ওঠার ছয় মাস পরে বাড়ির এডভান্স নিলেন। ফার্নিচারঅলাও এক বছর পরে টাকা দিলে চলবে বলে সব করে দিলেন। একদম শূন্য হাতেই ল্যাবএইড শুরু করি। ল্যাবএইড’র শুরুর সময় ধানমন্ডির ৩ নম্বরে ছিলো এনায়েত হাসপাতাল। এর মালিক আমাকে খুব পছন্দ করতেন। যেদিন ল্যাবএইড শুরু করি তিনি বিকালে দেখি কিছু সাদা চাদর নিয়ে তিনি হাজির। সঙ্গে একজন ইমাম সাহেবও। বিকালে সেই হুজুর দিয়ে মিলাদ আর সাদা চাদরের বিছানায় শুরু হয়ে গেল ল্যাবএইড। গুলশানে চাহিদা থাকায় সেখানেও শুরু করি ল্যাবএইড। পরীক্ষা, চিকিৎসা, ওষুধ সবই এক ছাদের নিচে। ল্যাবএইড’র সাফল্যের দেশে এখন অনেকেই একই ধরনের চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করেছেন।

প্রশ্ন: ল্যাবএইড-এর সফলতার পর নতুন কি চিন্তা নিয়ে এগুচ্ছেন?
সময়টা ১৯৯৭। খেয়াল করলাম যারা কাজ করেন তারা যদি শিক্ষিত না হন তাহলে অগ্রগতি সম্ভব নয়। এজন্য মালয়েশিয়ার মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটির সঙ্গে চুক্তি করলাম ঢাকায় একটি ক্যাম্পাস স্থাপনের জন্য। পুরো টিম নিয়ে মালয়েশিয়ায় গেলাম। মি. গথ ছিলেন ইউনিভার্সিটির প্রধান। সকালে ওনার সঙ্গে সৌজন্য চা খেলাম। দিন শেষে চুক্তি হওয়ার কথা কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তিনি আর দেখা করলেন না। মন খারাপ হয়ে গেল। চলে এলাম ঢাকায়। কিন্তু তখন ভেতরে ভেতরে একটা জেদ কাজ করলো, না ঢাকায় একটা ইউনিভার্সিটি চালু করবো। ২০০১-এ আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হলো। ধানমন্ডিতে চালু করলাম স্টেট ইউনিভার্সিটি। আজ সেখানে সাড়ে তিন হাজার ছাত্র পড়াশুনা করছে। আমরা স্বপ্ন দেখি একদিন আমাদের ইউনিভার্সিটি হার্ভার্ড হবে।  ১৯৯৭ সালের সেই ব্যর্থতাই আজকের সফলতা। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে, জীবনে যখনই কোন ব্যর্থতা আসে তখনই সে একটি বড় সফলতা নিয়েও আসে। সব কষ্ট থেকেই একেক একটি বড় সাফল্যের সূচনা।

প্রশ্ন: কার্ডিয়াক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পেছনের কারণ কি?
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বাঁক বদলে দেয় ল্যাবএইড’র। সূচনা ঘটায় ল্যাবএইড কার্ডিয়াকের। মায়ের হার্টে সমস্যা দেখা দিলে ১৯৯৯ সালে যাই দিল্লিতে স্কট হাসপাতালের ড. অশোক শেঠের কাছে। তিনি মাকে দেখে বললেন, এনজিওগ্রাম করাতে হবে। কিন্তু এনজিও গ্রাম করতে গিয়ে আমরা অসহায় পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেলাম। কি করা হবে না হবে তা বুঝতে পারলাম না। সংশ্লিষ্টরা কিছু বলছে না। মা ক্যাথল্যাবের বাইরে। কি কষ্ট! দিল্লি থেকে ঢাকায় ড. সোহরাব-উজ-জামানকে ফোন করি। তিনি ডা. শেঠের পূর্ব পরিচিত। তিনি  দিল্লিতে ফোনে ডা. অশোক শেঠের সঙ্গে কথা বলে জানালেন মা’র এনজিও প্লাস্টি আর সার্জারি লাগবে না। রাত ৯ টায় আমাদের জানানো হলো রোগীকে এখন দেখতে আসতে পারেন।
মা’র সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, এক ডাক্তার নিডল দিয়ে ১২/১৪ বার খুঁচিয়েছে এনজিওগ্রাম করাতে গিয়ে। পাশ দিয়ে ডা. অশোক শেঠকে হেঁটে যেতে দেখে ওনার অ্যাপ্রোন ধরে মা বললেন, ‘আমি আপনাকে দেখিয়েছি, এনজিওগ্রাম আপনার করার কথা?’ পরে একবারেই এনজিওগ্রাম সম্পন্ন করেছেন। সে সময় ১৯৯৯-তে দিল্লিতে এনজিওগ্রাম করতে থাকা খাওয়াসহ সবমিলে সাড়ে ৩ লাখ রুপি খরচ হয়েছিল। সেখানে বসেই সংকল্প করি দেশে ফিরে এ বিষয়ে ভালো কিছু করতে হবে। কার্ডিয়াক বিষয়ে বড় কিছু করার যুদ্ধ শুরু তখন থেকেই। ল্যাবএইডের পাশেই জায়গা নিলাম। মেশিন কিনলাম। ডাক্তার, নার্সও পেলাম। ২০০৪ সালের ১৪ই জুলাই প্রথম এনজিও প্লাস্টি হলো- রিং পড়ানো ও বাইপাস সার্জারি করা হলো ল্যাবএইড হাসপাতালে। সেদিন রোজা রেখেছিলাম। অত্যন্ত সফলভাবে সার্জারি হলো, রিং পরানো হলো। আমরা যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলাম। বর্তমানে প্রতিদিন অন্তত ৬০০ কার্ডিয়াকের রোগী আউটডোরে দেখা হয়। গড়ে ৩০টি এনজিওগ্রাম হয়। আমাদের এখানে সব মিলে ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়। কার্ডিয়াক হাসপাতাল করার পর দেখি কেউ স্ট্রোক করেছে বা কারো কিডনি ফেইল করেছে তখন মনে হলো সম্পূর্ণ চিকিৎসা এভাবে হবে না। ২০০৬ সালে চালু করি ল্যাবএইড স্পেশালাইজড হাসপাতাল। বিশ্বাস থাকার কারণে বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো ডাক্তার, নার্সগুলোও পেয়ে গেলাম। দু’টো হাসপাতালেই ছয় মাস থেকে এক বছরেই আর্থিক সফলতা পেলাম।
এরপর দেখলাম সারা পৃথিবীতেই নার্স, টেকনোলজিস্ট ও ফিজিওথেরাপিস্টের প্রচুর চাহিদা। ২০০৬-এর আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চালু করি স্টেট কলেজ অব হেলথ সায়েন্সেস। বাংলাদেশে আরেকটা স্বপ্নের দুয়ার খুলে গেল। এই ইন্সটিটিউটের পথ ধরে বাংলাদেশে অন্তত ৫০টি গ্র্যাজুয়েট সায়েন্স কলেজ হয়েছে। বর্তমানে এখান থেকে পাস করা ছাত্রদের চাহিদা দেশে ও দেশের বাইরে।

প্রশ্ন: স্বাস্থ্যখাত নিয়ে আর নতুন কি চিন্তা করছেন?
২৫ বছরে হেলথ সেক্টরে থাকার বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো বিচিত্র। দেখলাম ওষুধ শিল্পে ওষুধের গুণাগুণের পাশাপাশি মার্কেটিং-গিফট অন্যান্য খরচ অনেক বেশি। এসব কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলো এখানে থাকতে পারছে না। আমার কাছে মনে হলো ওষুধের মার্কেটে গুণাগুণের চেয়ে প্রচারই প্রধান। এতে ওষুধের দাম অনেক বেশি রাখতে হয় কোম্পানিগুলোকে। এর কুফল এসে পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। আমাদের স্বপ্ন ও ইচ্ছা হলো ওষুধ শিল্প নিয়ে আমরা কাজ করবো। যে ওষুধ আমরা তৈরি করবো তার গুণটাই হবে প্রধান পরিচয়। আমরা উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারলে একদিন হয়তো পুরো ওষুধ শিল্পই প্রচার থেকে গুলের দিকে ঝুঁকবে। এর ফল পাবে সাধারণ রোগীরা। ২০১৩-তে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে চালু করি ল্যাবএইড ফার্মাসিউটিক্যালস। আমরা স্বল্প সময়ের মধ্যেই ওষুধের গুণাগুণের ব্যাপারে ডাক্তার এবং রোগীদের শততাগ আস্থা অর্জন করতে পেরেছি অল্প সময়ের মধ্যেই। যদিও প্রচারে আমরা এখনও প্রথম সারিত আসতে পারিনি। তবে বর্তমানে আমাদের দেশের ঔষধের মান অনেক ভালো।
দেখা গেছে ফার্মেসির ওষুধগুলোর গড়ে ১৪ ভাগ থাকে ফেইক মেডিসিন। ১১ ভাগ সময়উত্তীর্ণ ওষুধ। আর প্রায় ১৭ ভাগ ওষুধের তাপমাত্রা সংরক্ষণ করা হয় না। তার অর্থ আমরা সাধারণভাবে যে ওষুধগুলো কিনি তার ৪০ ভাগই কাজ করে না। এ সমস্যা সমাধানেও কাজ শুরু করেছি। আমরা ইতিমধ্যেই ৩০টি ফার্মেসি করেছি সেখানে খুচরা ওষুধ বিক্রয় হয়। আমরা সরাসরি কোম্পানি থেকে ওষুধ কিনি। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ কোম্পানি বদলে দেয়। ফ্রিজিং-এর মাধ্যমে ওষুধের তাপমাত্রাও সংরক্ষণ করা হয়। আশা করছি, ২০১৮ সালের মধ্যে এই ফার্মেসির সংখ্যা ৬০০-তে পৌঁছাবে। এই ফার্মেসির মাধ্যমে যে কোনো কোম্পানির যোগ্য ওষুধ রোগীরা কিনতে পারবে। বাংলাদেশে ফার্মেসি আছে দেড় লাখ। যা অন্যান্য ফার্মেসিগুলোর জন্যও দৃষ্টান্ত হবে। এর সুফল সবাই ভোগ করতে পারবে।

প্রশ্ন: চিকিৎসা ব্যয় বেশি এ নিয়ে রোগীদের অভিযোগ বিস্তর, কি বলবেন?
ভালো চিকিৎসার খরচ বেশি হবেই। এটা সারা দুনিয়াতেই। তাই বলে গরিব রোগীরা চিকিৎসা পাবে না? এটা নিয়েও আমরা কাজ শুরু করেছি। সমাজের প্রতি আমাদের দায়িত্ব আছে। আমরা সবসময় সমাজ থেকে নিয়েছি। এখন আমাদের দায়িত্ব সমাজকে কিছু দেয়া। দরিদ্র রোগীদের জন্য নারায়ণগঞ্জের পূর্বাচলে তিন একর জায়গা নিয়ে ল্যাবএইড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ শুরু করেছি। সেখানে স্লোগান হবে, ‘আপনি যা দিতে পারবেন, তাতেই আপনার পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা হবে?- ২০১৮ সালে আমরা এই হাসাপাতালে প্রথম রোগী ভর্তি করবো। যে উচ্চমূল্যের কথা বলা হচ্ছে, আশা করি পূর্বাচলে রোগীদের সেই দীর্ঘশ্বাস দেখতে হবে না। প্রাথমিক পর্যায়ে ২০০ বেড দিয়ে এই হাসপাতাল শুরু হবে।

প্রশ্ন: বিশাল সফলতায় কোনো ব্যর্থতা চোখে পড়ে কি?
বাংলাদেশে এখন স্বাস্থ্যখাতে বড় ধরনের বিপ্লব হয়েছে। এখাতে হয়তো আরও বেশি কিছু করা দরকার। একই সঙ্গে মানুষের সঙ্গে দূরত্ব দূর করাও প্রয়োজন। আমরা ঠিকমতো মানুষকে বোঝাতে না পারায় নানা ধরনের অসন্তুষ্টি আছে জনমনে। তবে উন্নত বিশ্বের যে কোনো দেশের সমকক্ষ চিকিৎসা আমাদের এখানে আছে। আমাদের ব্যর্থতা আমরা হয়তো রোগীদের হৃদয়ের কাছাকাছি যেতে পারিনি।
 
প্রশ্ন: জীবনের স্মরণীয় কোনো ঘটনা যা ভেবে আজও রোমাঞ্চিত হন?
আমি সব সময় শূন্যতা খুঁজি। শূন্যতা পূরণে নিষ্ঠা আর ধৈর্য্য নিয়ে কাজ করে যাওয়া- এটাই আমার সফলতার সূত্র। দিন শুরু করি খুব সকালে। ঘুম থেকে উঠি সাড়ে ছ’টায়। সকাল সাড়ে সাতটার মধ্যে অফিসে আসি। দিন শেষে কাজের আনন্দটাই সবচেয়ে বড় মনে হয়। বাইরে গেলেও কাজের মধ্যেই থাকি। এটাই জীবনের সেরা আনন্দ। আর সততাই আমার মূল শক্তি। ব্যক্তিগতভাবে আজ পর্যন্ত কখনও ঋণ করিনি। যা বিশ্বাস করি তাই করি। ডাক্তারি জীবনে বৃত্তি পেতাম ৫০০ টাকা। মাসের শেষদিকে টাকা শেষ হয়ে যেতো। অনেক সময় গিয়েছে যখন টাকা শেষ হয়ে গেছে বলে সকালে নাস্তা না খেয়েই থেকেছি। কিন্তু কখনও কার কাছ থেকে ঋণ করিনি, হাত পাতিনি। আত্মসম্মানটাই অনেক বড়। মনে হতো এটা বড় সম্পদ। নিজের সম্মান নষ্ট হতে পারে এমন কোন কাজ কখনই করবো না এটা মনের মধ্যে সবসময়ই ছিল। তাছাড়া পরিবারের জন্য আমি বরাবরই ছিলাম আবেগপ্রবণ। জীবনে কোনোসময়ই পরিবারের বাইরে কাটাইনি। ১৯৮৭ সালে বন্ধুদের সঙ্গে ডায়াগনস্টিক সেন্টার করে লাভের ৮০ হাজার টাকা দিয়ে একটি পাবলিকা গাড়ি কিনেছিলাম। আজ টাকা হয়েছে। অভাব ঘুচেছে। অনেক দামি গাড়িতে হয়তো চড়ি। কিন্তু সেদিনের পাবলিকা কেনার পর যে আনন্দ আর সুখ পেয়েছিলাম তা আজও স্মরণীয়।

প্রশ্ন: তরুণদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
আমি ভীষণ আশাবাদী। শুধু স্বপ্ন দেখি না। স্বপ্নের বাস্তবায়নও করি। বর্তমানে আমাদের ৭ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। প্রতিনিয়ত তাদের সংখ্যা বাড়ছে। সকালে যখন বের হই মনে হয় যুদ্ধে যাচ্ছি। এই যুদ্ধ আনন্দের। আর দিন শেষে যখন ফিরি তখন আনন্দ নিয়ে ফিরি। শিক্ষায় বিশ্বাসী। প্রতিদিন পড়াশুনা করি। বিশ্বাস করি, শিক্ষিত লোক ছাড়া কোনো কাজেই সফল হওয়া কঠিন। প্রতিনিয়ত লোকদের শিক্ষিত করতে হবে। আর যেখানে শূন্যতা সেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। সততা, পরিশ্রম, কমিটমেন্ট এই তিন কারণ আমাদের একটার পর একটা যুদ্ধে বিজয় এনে দিয়েছে। সকলের জন্য পরামর্শ থাকবে, প্রতিদিন কাজ করুন। কাজকে ভালোবাসুন। জীবনকে ভালোবাসুন। কঠোর পরিশ্রম করুন। সমাজ ও পৃথিবীকে কিছু দিন।

 

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Duke

২০১৬-১১-২৩ ১৫:২৯:০৯

" সমাজ ও পৃথিবীকে কিছু দিন " ..a small correction: "সমাজ ও পৃথিবীকে কিছু দিন এবং তার থেকে বেশি নিজের পকেটে ঢুকান"

Mahmud Al Hossainuzz

২০১৬-১১-২৩ ০২:০৯:৪৫

Have lot of straggle, Thanks .I believed really LABAID created a new milestone for good health care support. Now they are established so they should try to provide low cost support .

জালাল

২০১৬-১১-২৩ ০১:১৮:৪৪

Staff দেরকে ডাল ভাত খাওয়ার মত বেতন দেয়ার জনন্য অনুরুধ করা গেল,বর্তমান সময় ৬/৭ হাজার টাকা দিয়া ঢাকার মত শহরে মানুষ চলতে পারে? কর্ম করার সুযোক করে দিছেন তার জনন্য ধন্যবাদ যানাই।

তানভীর

২০১৬-১১-২২ ২২:১৩:৩৭

সত্যি আপানার এই প্রচেষ্টা ও সফলটা আপনাকে আর মহান করে তুলুক। তবে গরিব রুগিদেরকে আর কম খরচে চিকিৎসা দেওয়া যায় কিনা।

জালাল

২০১৬-১১-২২ ১৮:০৯:০৯

ল্যাবএইড কি সত্যি সাধারণ মানুষের সেবা দেয়? নাকি সেবার নামে ডাকাতি করে?

আপনার মতামত দিন