জোয়ারের পানিতে ডুবছে চট্টগ্রাম প্রতিদিন ক্ষতি শত কোটি টাকা

স্টাফ রিপোর্টার, চট্টগ্রাম থেকে

এক্সক্লুসিভ ১১ জুলাই ২০২০, শনিবার

প্রতিবছর বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতেই অন্তত কোমর পানিতে ডুবে যায় চট্টগ্রাম মহানগর। সঙ্গে নদী তীরবর্তী কয়েকটি উপজেলাও। এবার বৈশাখের শুরুতে বৃষ্টি হলেও হাঁটুপানিও জমেনি চট্টগ্রামের কোথাও। এখন চলছে বর্ষাকাল। কিন্তু বৃষ্টিপাত তেমন নেই চট্টগ্রামে। নেই বৃষ্টির জলাবদ্ধতাও। তবে গত ৪-৫ দিন ধরে বঙ্গোপসাগরে পূর্ণিমার প্রবল জোয়ারে ডুবছে চট্টগ্রাম মহানগর। ডুবছে সমুদ্র উপকূলীয় আনোয়ারা, বাঁশখালী, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড উপজেলাও।

এর একমাত্র কারণ অরক্ষিত উপকূলীয় বাঁধ। নগরীর পতেঙ্গা থেকে মীরসরাই পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার বাঁধের অর্ধেকাংশই সমতল ভূমির সঙ্গে মিশে আছে। পতেঙ্গা এলাকায় ২০ কিলোমিটার বাঁধ সংস্কার করে আউটার রিং রোড করা হলেও এরমধ্যে থাকা স্লুইচগেইটগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। একইভাবে আনোয়ারা উপজেলার বার আউলিয়া অংশেও প্রায় এক কিলোমিটার, বাঁশখালী উপকুলীয় এলাকার বাঁধও বিলীন হয়ে গেছে। এসব এলাকায় বাঁধ নির্মাণ কাজ শেষে হয়েছে গত বছর। কিন্তু টেকসই বাঁধ নির্মাণ না করায় দিনে দু‘বার এসব এলাকা ডুবে জান-মালসহ বিপুল অর্থের ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান স্থানীয়রা।
রায়পুর ইউনিয়নের বার আউলিয়া ইউপি মেম্বার আমির আহমদ জানান, খোলা বেড়িবাঁধ দিয়ে প্রতিদিন জোয়ারের পানি উঠানামা করছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, পুকুর, ফসলি জমি তলিয়ে যাচ্ছে। এতে ভোগান্তির সাথে স্থানীয়রা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে।
রায়পুর চেয়ারম্যান জানে আলম জানান, বার আউলিয়া এলাকার ১৩১০ মিটার অংশে সিসি ব্লকসহ স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করেছিল দুই বছর আগে। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসান ব্রাদার্স ওই এলাকায় কিছু ব্লক ডামিপং করলেও বাঁধ নির্মাণ করেনি এখনো। এ কারণে জোয়ারের পানি উঠানামা করছে। এতে কমপক্ষে এক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমাদের একটাই দাবি ছিল টেকসই বেড়িবাঁধ। আনোয়ারাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ শুরু হয়। কিন্তু সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রায়পুর ও বার আউলিয়া গ্রাম অরক্ষিত থেকে গেছে। নদী শাসন না করার কারণে এই দুই গ্রামের বেড়িবাঁধ বার বার ভেঙে যায়। প্রতি বছর বৃষ্টির মৌসুমে ভাঙলেও, এবার একটু আগেই ভাঙন শুরু হয়েছে। অতিদ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নিলে এলাকার জমি ও ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।
চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সিজন চাকমা বলেন, আনোয়ারা বেড়িবাঁধের ৬০ শতাংশেরও অধিক কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। রায়পুর ও বার আউলিয়া এলাকার দুই কিলোমিটার অংশে নদী শাসন ও জমি অধিগ্রহণজনিত কিছু সমস্যা আছে। এ কারণে ওই স্থানে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যাতে দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা যায়। আগামী সপ্তাহ থেকে ভাঙা অংশে জিও পাইপ বসিয়ে ওই অংশ পূনরায় নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে।
এদিকে জোয়ারের পানিতে দিনে দু‘বার ভাসছে চট্টগ্রামের ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ। বুধবার দুপুরের পরও চাক্তাইয়ের চালপট্টি, শুঁটকিপট্টি, মকবুল সওদাগর রোড ও আছদগঞ্জ ও তার আশপাশের নিন্মাঞ্চল জোয়ারের হাঁটু পানিতে ডুবে যায়।
খাতুনগঞ্জ আড়তদার সাধারণ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সমপাদক মো. মহিউদ্দিন বলেন, জোয়ারের পানির যন্ত্রণা থেকে আমরা এখনো মুক্তি পাচ্ছি না। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ২ বছর আগে জোয়ার প্রতিরোধক স্লুইচ গেট নির্মাণের কাজ শুরু করে। অথচ এখনো কাজের অর্ধেক অগ্রগতিও হয়নি। জোয়ারের পানির ধাক্কায় ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন ৩০০ কোটি টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে। জোয়ারের পানির সাথে ভারি বৃষ্টি হলে আমাদের ব্যবসায়ীদের বিরাট লোকসান দিতে হবে বলে জানান তিনি।
এদিকে জোয়ারে প্রতিদিন হাঁটু থেকে গলা সমান পানিতে ডুবছে নগরীর হালিশহর, ব্যাংকপাড়া আগ্রাবাদ, সদরঘাট, চান্দগাঁও বিসিক শিল্প এলাকা, বাকলিয়া, চকবাজারসহ দুই তৃতীয়াংশ এলাকা। ৪/৫ দিন ধরে এসব এলাকায় রুটিনমাফিক চলছে পানি উঠানামা।
নগরবাসীর অভিযোগ, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার মেগাপ্রকল্পের মেয়াদ গত মাসে শেষ হওয়ার পরও জোয়ারের দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পায়নি বিশাল এলাকার অধিবাসীরা। যা অবস্থা চলতি বর্ষা মৌসুম এমন জোয়ারের দুর্ভোগ মাথায় নিয়েই কাটাতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লে. কর্নেল সোহেল আহমেদ বলেন, জাইকার অর্থায়নে আগ্রাবাদ সিডিএ আবাসিক ও হালিশহর এলাকায় নালা ও রাস্তা উঁচুকরণের একটি প্রকল্প রয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় করোনার কারণে কাজ করা যায়নি। তবে এখন করা হচ্ছে। এটি শেষ হলে রাস্তায় পানি উঠা কমে আসবে অনেক এলাকায়। তবে নালাগুলো সংস্কার করার পরই আবর্জনায় আবারো ভরাট হয়ে যায়।
উল্লেখ্য, নগরীর জলাবদ্বতা নিরসনে সরকার সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল। গত মাসে এর মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু প্রকল্পের কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় তা আবারো সংশোধিত আকারে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তা অনুমোদন হয়ে আসার কথা রয়েছে। তাই পূর্বের হিসেবে চলমান রয়েছে প্রকল্পের কাজ। তবে প্রকল্পের আওতার অনেক কাজ বাকি রয়েছে। একইভাবে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সরকার উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প (সিইআইপি) নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। জমি অধিগ্রহণের পর ২০১৭ সালের জানুয়ারির শেষের দিকে বেড়িবাঁধ ও সুইচগেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। আনোয়ারা উপকূলীয় বেড়িবাঁধের রায়পুর ও বার আউলিয়া অংশে ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এ কাজের মেয়াদ শেষ হয় একবছর আগে। মাটির বাঁধের সাথে সিসি ব্লক বসানোর কথা থাকলেও ওই অংশে ব্লকের কোনো চিহ্নও নেই।

আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ অন্যান্য খবর

মহাসড়কের পাশে বানভাসিরা

‘কহন যেন ছাপড়ার উপর গাড়ি উইঠ্যা পড়ে’

২৯ জুলাই ২০২০

বিজয়নগরে বেহাল সড়ক

২৯ জুলাই ২০২০

ভিজিএফ চালের স্লিপ জাল করে ধরা খেলো ইউপি সদস্য

২৯ জুলাই ২০২০

হতদরিদ্র সাগরী খাতুন ভিজিএফ চালের স্লিপ পেয়ে গতকাল দুপুরে চাল নিতে আসেন ঝিনাইদহ সদরের হলিধানী ...

ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইয়্যুথ ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল

আজীবন সম্মাননা পাচ্ছেন সৈয়দ সালাহউদ্দীন জাকী

২৮ জুলাই ২০২০



এক্সক্লুসিভ সর্বাধিক পঠিত