সাক্ষাৎকার

শেখ হাসিনা একা, অনেকে তা মানেন না (ভিডিও)

শাহনেওয়াজ বাবলু

প্রথম পাতা ১০ জুলাই ২০২০, শুক্রবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:২৯

শেখ হাসিনা একা। এটা অনেকেই মানতে চান না। তাই আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলি, সবাইকে ডাকেন না কেন। আপনিতো ওই চেয়ারে আছেনই। আমাদের না হয় এক 
কাপ চা খাওয়াবেন। রাজধানীর নগর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মানবজমিনকে দেয়া সাক্ষাতকারে এমনটাই বলেছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
তিনি বলেন, এই দেশটাকে পরিবর্তন করতে হবে। সবাইকে ভালো থাকতে হবে। একলা কখনো ভালো থাকা যায় না।
আমাদের স্বার্থপরতা পরিহার করতে হবে।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। কিংবদন্তি যোদ্ধা। রণাঙ্গনে ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে প্রাণ বাঁচিয়েছেন অসংখ্য আহত ও অসুস্থ মুক্তিযোদ্ধার। জাতির যেসব সূর্যসন্তান আজকের এই স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়ার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন এবং রাজনীতির বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন তাদের অন্যতম তিনি। ১৯৪১ সালের ২৭শে ডিসেম্বর চট্টগ্রামের রাউজানে জন্ম নেয়া ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে জেনারেল ও ভাস্কুলার সার্জারিতে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে দেশে ফিরে আসেন। সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকায় গড়ে তুলেছেন নগর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, করোনা কিছু না। এটা হচ্ছে পুঁজিবাদের কাউন্টার। পুঁজিবাদ যেভাবে বাড়ছে সেটা কেউ ঠেকাতে পারছিল না। আজকে আমাদের উল্টোভাবে চিন্তা করতে হবে। যে আমরা পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ালাম। তবে এটার ফল আমরা পাই কিনা সেটা দেখতে হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শেখ সাহেবের দল আমি কখনো করিনি। ওনার সঙ্গে আমার সম্পর্ক ছিল ঝগড়ার আবার ভালোবাসার। ওনার সময় ওনি কৃষিকে খুব গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এই যে কিছুদিন আগে একটা বাজেট হলো। এই বাজেট তো হওয়ার কথা ছিল করোনাকে ঘিরে। সেটা হয়নি। দুই কোটি মানুষকে তো খাবার দিতে হবে ছয় মাসের জন্য। কিন্তু সেটার কথাই ভাবা হচ্ছে না। কিছুদিন আগে কৃষিমন্ত্রী বলেছেন, প্রয়োজনে বিদেশ থেকে চাল আমদানি করবেন। কিন্তু এটা না করে দরকার কৃষিতে বিনিয়োগ করা। কৃষিতে যদি বিনিয়োগ করা হতো তাহলে ছয় মাস পরে সোনার ফসল আমাদের ঘরে আসতো।
আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশে যতো শিক্ষিত বেকার আছে তাদের কথা আমরা কখনো চিন্তা করছি না। তাদের আমরা কেন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখাতে পারছি না। আমাদের স্বপ্ন দেখতে হবে নতুন বাংলাদেশের। সেই বাংলাদেশের স্বপ্নটাই আমি দেখাতে চাই। এই স্বপ্ন দেখাতে হলে আমি একলা কাজ করে পারবো না। এর জন্য সবাইকে মিলে কাজ করতে হবে। আমি এই স্বপ্নের গল্প লিখতে চাই। শুনতে চাই আগামীর প্রজন্মের কাছ থেকে, তারা কীভাবে এই দেশটাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে। কীভাবে দেশটাকে বাঁচাতে চায়।
নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, সাধারণ মুসলিম পরিবার থেকে এসেছি। আমাদের সময় এই দেশে বেশি সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিল না। আমাদের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভালোবাসা ছিল। আমার বাপ দাদাদের মধ্যে যারা একটু লেখাপড়া শিখেছে তারা কিছু করার চেষ্টা করেছে। তবে এই পরিবর্তনটা বেশি যুগের না। যখন এ কে ফজলুল হক লেখাপড়ার দিকে এলেন তখন থেকে মুসলমানরা পড়ালেখার প্রতি ঝুঁকতে শুরু করলো। আমাদের রাজনীতি শিখিয়েছেন মওলানা ভাসানী। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো যে, মওলানা ভাসানীর মতো আমাদের জাফর, মেননদের সেই ধৈর্য ছিল না। কেউ তার রাজনীতিও বুঝলো না। এর ফলে আমরা রাজনীতিতে বেশি সুযোগ সুবিধা করতে পারলাম না। মাঝখান দিয়ে বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে গেলেন। হি ডিজার্ভ ইট।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমি তো এ দেশে বড় হয়েছি। এই দেশে রাজনীতি করেছি। আমাদের সময় আমরা অনেক কিছু করেছি। ড. মাহফুজুল্লাহ কিছু লিখে গেছেন। আমি সব সময় বলে আসছি, আমরা যদি দেশটাকে পরিবর্তন না করতে পারি তাহলে মানুষ পাবেটা কি। এই যে আজকে মানুষ সেবা পাচ্ছে না, এটাই আমার ব্যর্থতা। রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা তারা দেশে সত্যিকারের রাজনীতি আনতে পারেনি।
নিজের তরুণ সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত ছেলে হিসেবে আমার কিছু মধ্যবিত্ত আকাঙ্ক্ষা ছিল। আমার পছন্দ ছিল আয়েশি জীবন। আমার বিলাতের জীবন ছিল বিলাসি। প্রিন্স ফিলিপের যে টেইলার্স স্যুট বানাতো আমার স্যুটও সেই বানাতো। এটা ছিল আমার ছেলে মানুষি। এখন এগুলো মনে হলে খুব হাসি পায়। আমি কখনো তৈরি পোশাক পরিনি। আমার কোনো তৈরি শার্ট নেই। আমি কঠিন পরিশ্রম করতে পারতাম। পাকিস্তান আমলে সেনা সরকারের সময় আজম খান যখন ঢাকা মেডিকেলে এসেছিলেন আমি তাকে আটকে দিয়েছিলাম। আমি সব সময় সত্যের পথে ছিলাম। এখনো আছি। আমি যেটা বিশ্বাস করতাম সেটাই বলতাম আর সেটাই করতাম। বিলাতে কঠিন পরিশ্রম করে কাজ শিখেছি। বিলেতের মানুষের একটা বড় গুণ হচ্ছে তারা যেখানেই থাকুক চিকিৎসা পায়। লন্ডন শহরে মানুষটা যে চিকিৎসা পেতো ওয়েলস শহরের মানুষও সেই চিকিৎসাই পেতো। বিষয়টা আমার কাছে খুব আশ্চর্য লাগতো। তখন আমি ঠিক করলাম এই প্রথাটাই আমার দেশে নিয়ে যেতে হবে। তখন তো পাকিস্তান ছিল। যদিও আমরা ওই সময়ও পাকিস্তান ভাঙার স্বপ্ন দেখিনি। তখন একটাই স্বপ্ন ছিল আমি পাকিস্তানের এক নম্বর ডাক্তার হবো। সবাই আমাকে চিনবে এবং জানবে। এটা ছিল আমার পিওর মধ্যবিত্ত চিন্তা ভাবনা।
তিনি বলেন, আমাদের ব্যর্থতার জায়গাটা হচ্ছে, কাজগুলো আমরা এতো সহজে দেখতে পাই কিন্তু করতে পারি না। করোনার শুরুর দিকে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে টকশোতে গিয়ে বলেছিলাম, করোনার সময় দেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে অক্সিজেন নিয়ে। কিন্তু আমার কথা কেউ শুনেনি। এটা কাউকে বুঝাতে পারিনি। আজকে জ্বর হলেই কেউ হাসপাতালে ভর্তি হতে পারে না। কোনো পরীক্ষা করা যাবে না। এটা কেমন কথা। শুধু বলে আইসিইউ বেড খালি নাই। আমি তেজগাঁওয়ে হাসপাতাল করতে চাইলাম। কিন্তু আমাকে দেয়া হলো না। তখন খুব কষ্ট পেয়েছি। সরকারের যারা লুটপাট করে সরকার তাদেরই সুযোগ করে দেয়। সামনে আমি সমূহ বিপদ দেখছি। এই করোনা হঠাৎ করে থামবে না। এটা ছড়িয়ে পড়বে বিবিধ কারণে। তবে এখনো আমি মনে করি ‘উই সেল ওভার কাম’। তার জন্য আমাদের একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বড় একাকী। এটা অনেকেই রিয়ালাইজ করেন না। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলি সবাইকে ডাকেন না কেন। আপনি তো ওই চেয়ারে আছেনই। আমাদের না হয় এক কাপ চা খাওয়াইয়েন।
সবাইকে একসঙ্গে এই দেশকে বাঁচানোর আহ্বান জানিয়ে রণাঙ্গনের এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, তুমি না বাঁচলে তো আমি বাঁচবো না। এটা সবাইকে বুঝতে হবে। মানুষ একাকী কোনো কিছুই করতে পারে না। আমি করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পরই বলেছি যে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবো না। হাভার্ড আমাকে অপারেশন করতে চেয়েছে। আমি তাদের বলেছিলাম তোমরা কি সব ফ্রিতে করে দিবা? আমি বিশ্বাস করি আমাদের দেশেও ভালো চিকিৎসা আছে। আমি তো জীবন মৃত্যুর দ্বার থেকে ফিরে এসেছি। আমার হাসপাতালের ডাক্তারদের উছিলাই তো আমি বেঁচে আছি। দেশের মানুষের প্রতি আত্মবিশ্বাস থাকতে হবে। অন্যের প্রতি ভালোবাসা থাকতে হবে। এই দেশ না থাকলে, দেশের মানুষ না থাকলে, আমি বেঁচে থেকে লাভ কি। এই দেশের মানুষের হাসি যদি আমি না দেখতে পাই তাহলে তো আমার জীবন অন্ধকার।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

শহীদুল্লাহ

২০২০-০৭-১০ ১৯:৩২:৫৮

স্যারের ব্যপারে কিছু বলার মত সাহস নেই, শুধু দোয়া করি আল্লাহ যেন উনাকে হায়াতে তাইয়্যেবা দান করেন।

মোঃ মনির হোসেন ।

২০২০-০৭-১০ ০৩:২৫:৪৩

স্যারের অবস্থান আমাদের হৃদয়ে । সঠিক উপলব্ধি ও বিশ্বাষ তুলে ধরেছেন । আল্লাহ তাআলা উনাকে হেফাজত করুন । আমাদের ছায়া বৃক্ষ তিনি ।

VUSHİ

২০২০-০৭-১০ ১২:৩৭:১৭

স্যালুট স্যার

S H Mollick

২০২০-০৭-০৯ ২২:২২:৪৩

আপনার মতো দেশপ্রেমিক হওয়ার তৌফিক আল্লাহ যেন আমাদেরকে দেয় । আমিন.

IMRAN

২০২০-০৭-১০ ০৯:৩৩:০৪

স্যালুট স্যার

মোহাম্মদ হান্নান

২০২০-০৭-০৯ ২০:২৩:৩৬

আমি যাদের সাথে হাটিঁ ওঠা বসা ও চলাফেরা করি তাদেরকে প্রতিনিয়ত একটি কথাই বলি যে, "শেখ হাসিনা বড়ই একা" তার ডান,বাম,সামনে,পিছনে কেউ নেই।

এ কে এম মহীউদ্দীন

২০২০-০৭-১০ ০৮:৪৯:৪২

শেখ হাসিনা একা এটা আমার বুঝার চেয়ে তার নিজের বুঝা অনেক বেশি দরকার।

ইকবাল আহামেদ

২০২০-০৭-০৯ ১৯:০১:২২

চমৎকার সুন্দর আলোচনা। স্যারকে অসংখ্য আন্তরিক ধন্যবাদ । শুভ কামনা রইলো ।

মোঃ নুরুল হক

২০২০-০৭-০৯ ১৬:৪৭:৩৫

দেশ প্রেমিক হওয়ার জন্য বস্তায় বস্তায় টাকার প্রয়োজন নেই, বড় একটি মন প্রয়োজন। সুস্থতার জন্য ঔষধি যথেষ্ট নয়, আত্মবিশ্বাস ও আল্লাহর রহমত প্রয়োজন, আল্লাহর দরবারে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মত মহৎ ব্যক্তিদের নেক হায়াত কামনা করছি।

fazlur rahman

২০২০-০৭-১০ ০৫:০৩:২৩

Long live Dr jaforullah ,

SM.Rafiqul Islam

২০২০-০৭-০৯ ১৫:৩৩:৩০

Congratulations Sir. We love you. Go ahead. We are with you.Thanks for writing article.

Abul. Kalam

২০২০-০৭-১০ ০৪:৩০:৩৬

I respect you from the core of my heart. By word, speech and activity you are the perfect person not only in Bangladesh but also in the world . Your sacrifice and contribution for the nation can only be compared with Dr. Mohammad Younus and Sir Fazle Hossain Abed.

nurul choudhury

২০২০-০৭-১০ ০২:৫৭:৪৪

Dr. Zafurullah is a man courage and encouragement.

শাহ আলম মানিক

২০২০-০৭-০৯ ১১:৪৮:২৩

স্যালুট স্যার

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

অদৃশ্য আতঙ্ক

১২ আগস্ট ২০২০

মুখোমুখি প্রদীপ-লিয়াকত

একে অন্যকে মদ্যপ বলে দায় চাপানোর চেষ্টা

১২ আগস্ট ২০২০

ঢামেকের সেই বিল অনুমোদন হয়নি

রোগীর খাবারই পাঠানো হতো হোটেলে

১২ আগস্ট ২০২০

সিনহার মায়ের কান্না

এটাই যেন শেষ ঘটনা হয়

১১ আগস্ট ২০২০

ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি

কোতোয়ালি থানার ওসি’র বিরুদ্ধে মামলা

১১ আগস্ট ২০২০

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ ৫ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা করেছেন ...



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত



শখ ছিল অ্যাডভেঞ্চারের দেখতে চেয়েছিলেন দুনিয়াটাকে

যেভাবে বেড়ে ওঠেন সিনহা

স র জ মি ন টেকনাফ

‘থানা গরম প্রবেশ নিষেধ’

ঢামেকের সেই বিল অনুমোদন হয়নি

রোগীর খাবারই পাঠানো হতো হোটেলে