শোলাকিয়ায় জঙ্গি হানার চার বছর

সাক্ষ্যগ্রহণে আটকে আছে বিচার কার্যক্রম

আশরাফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ থেকে

বাংলারজমিন ৬ জুলাই ২০২০, সোমবার

চার বছর আগে ২০১৬ সালের জুলাই মাসের শুরুতে সাত দিনের ব্যবধানে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্ট এবং শোলাকিয়া ঈদগাহের চেকপোস্টে জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। পহেলা জুলাই রাতে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে জঙ্গি হামলায় রক্তাক্ত হয় রাজধানীর ডিপ্লোম্যাটিক জোন। এ ঘটনার মাত্র সাত দিনের মাথায় ৭ই জুলাই ঈদুল ফিতরের দিন সকালে শোলাকিয়ার বৃহত্তম ঈদজামাতকে হামলার টার্গেট করে জঙ্গিরা চেকপোস্টে পুলিশের প্রতিরোধের মুখে বোমা আর চাপাতি নিয়ে হামলে পড়ে। ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব পুলিশ সদস্যদের মধ্যে আনছারুল হক ও জহিরুল ইসলাম নামে দু’জন পুলিশ সদস্যকে জঙ্গিরা চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মারাত্মক আহত করলে তারা হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান। চেকপোস্ট আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়ে অন্য পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে লিপ্ত হন। এ সময় আবির রহমান (২৩) নামে নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক জঙ্গি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। এছাড়া বন্দুকযুদ্ধের সময় নিজ বাসায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঝর্ণা রাণী ভৌমিক (৪০) নামে একজন গৃহবধূ মারা যান। ঘটনাস্থল থেকে অপর জঙ্গি দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এলাকার শফিউল ইসলাম ওরফে ডন (২২) কে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় র‌্যাব আটক করে।
পরবর্তিতে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে সে মারা যায়। ওইদিন পুলিশের বুকের তাজা রক্ত আর অসীম সাহসিকতার সাথে জঙ্গিদের প্রতিরোধে নির্বিঘেœ অনুষ্ঠিত হয়েছিল শোলাকিয়ার ঈদজামাত। চার বছর আগে ২০১৬ সালের ৭ই জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহ সংলগ্ন এলাকায় সংঘটিত এই জঙ্গি হামলার মামলাটি এখনো সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৮ সালের ২৮শে নভেম্বর পাঁচ আসামি জঙ্গি নেতা বড় মিজান, রাজিব গান্ধী, সোহেল মাহফুজ, আনোয়ার হোসেন ও জাহিদুল হক তানিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। মামলাটি বর্তমানে কিশোরগঞ্জের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল-২ এ বিচারাধীন রয়েছে। ট্রাইব্যুনালে বিচারকের দায়িত্বে রয়েছেন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ মুহাম্মদ আবদুর রহিম। মামলার চার্জ গঠনের পর সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আদালত থেকে ২০১৯ সালের ১৫ই জানুয়ারি প্রথম তারিখ নির্ধারণ করা হয়। এরপর প্রায় প্রতিমাসে সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ঘোষণা করা হলেও গ্রেপ্তারকৃত কয়েক আসামির গুলশানের হলি আর্টিজানের হামলাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় মামলার কারণে সেসব জায়গায় হাজিরা থাকায় এবং নিরাপত্তা সংকটের কারণে তাদের অন্যান্য কারাগার থেকে কিশোরগঞ্জে পাঠাতে না পারায় সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যায়নি। সর্বশেষ গত ২২শে মার্চ রাতে নাটোর জেলা কারাগার থেকে আসামি রাজীব গান্ধীকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে আনা হলেও করোনা সন্দেহে আদালতে না তুলে পরদিন ২৩শে মার্চ দুপুরে তাকে গাজীপুর কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগারে পাঠানো হয়।
সন্ত্রাস বিরোধী আইন-২০০৯ (সংশোধনী)/২০১৩) এর ৬(২)/৮/৯/১০/১২/১৩ ধারায় ২০১৬ সালের ১০ই জুলাই কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় দায়ের করা মামলাটির দ্বিতীয় ও সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আরিফুর রহমান ২০১৮ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছিলেন। অভিযোগপত্রে শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় ২৪ জনের সম্পৃক্ততা উল্লেখ করে তাদের মধ্যে অভিযুক্ত ১৯ জন বিভিন্ন স্থানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ায় অব্যাহতি দেয়া হয়। অভিযুক্ত পাঁচজনের মধ্যে জাহিদুল হক তানিম ও আনোয়ার হোসেন বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে এবং বাকি তিন আসামি অন্যত্র রয়েছে।
২০১৬ সালের ৭ই জুলাই জঙ্গি হামলার সময় ওই পুলিশ চেকপোস্টে দায়িত্বরত পাকুন্দিয়া থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) মো. সামসুদ্দীন বাদী হয়ে জঙ্গি হামলার চারদিনের মাথায় ১০ই জুলাই সদর থানায় মামলা (নং- ১৪) রুজু করেছিলেন। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ মুর্শেদ জামান। পরবর্তিতে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আরিফুর রহমান।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, শোলাকিয়া হামলায় খরচের যাবতীয় টাকা হুন্ডির মাধ্যমে সিরিয়া, সৌদি আরব ও পাকিস্তান থেকে আসে। শিবগঞ্জে বন্দুকযুদ্ধে নিহত জঙ্গি মো. বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট (৩২) এই টাকা বাংলাদেশে আনে। বাশারুজ্জামান চকলেট সেই টাকা নারায়ণগঞ্জে বন্দুকযুদ্ধে নিহত জঙ্গি নেতা তামিম আহমেদ চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেয়। এছাড়া ভারত থেকে আসে অস্ত্র ও গোলা বারুদ। মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জে তামিম চৌধুরীর কাছে সেই অস্ত্র ও গোলা বারুদ পৌঁছে দেয় মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ এলাকায় বন্দুকযুদ্ধে নিহত জঙ্গি নূরুল ইসলাম মারজান। শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে হত্যার টার্গেট করে এই জঙ্গি হামলা চালানো হয়।
অভিযোগপত্রে আরো উল্লেখ করা হয়, ২০১৫ সালের জুলাই মাসে গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার নিকট টাঙ্গাইলে অভিযানে নিহত মাহফুজুর রহমান বিজয় ওরফে সুজন এর ভাড়াটিয়া বাসায় শোলাকিয়া জঙ্গি হামলার বিষয়ে একটি বৈঠক হয়। পরবর্তিতে ২০১৬ সালের ২৪শে জুন রাজধানীর বসুন্ধরায় এপোলো হাসপাতালের পেছনে তানভীর কাদেরীর বাসায় শোলাকিয়া হামলার পরিকল্পনা হয়। এই পরিকল্পনায় রাজীব গান্ধী, তামিম চৌধুরী, সারোয়ার জাহান, নূরুল ইসলাম মারজান, বাশারুজ্জামান চকলেট, তানভীর কাদেরী, খাইরুল ইসলাম ওরফে বাধন ওরফে পায়েল, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ওরফে বিমল ওরফে নাহিদ, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিব্রাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের ও মেজর জাহিদ উপস্থিত ছিল। পরবর্তিতে হামলার তিন দিন আগে ৪ঠা জুলাই মিরপুর শেওড়া পাড়ার একটি বাসায় নূরুল ইসলাম মারজান, সারোয়ার জাহান ওরফে আব্দুর রহমান ও রাজীব গান্ধী এই তিন জঙ্গি শোলাকিয়া হামলার বিষয়ে আরো একটি পরিকল্পনা মিটিং করে। ওই মিটিংয়েই শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে হত্যা করা হবে মর্মে সিদ্ধান্ত হয়। পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নব্য জেএমবি’র মাস্টার মাইন্ড তামিম আহমেদ চৌধুরী, মেজর জাহিদ, ফরিদুল ইসলাম আকাশ, আবির রহমান, শরীফুল ইসলাম ওরফে শফিউল ইসলাম ও জাহিদুল হক তানিম কিশোরগঞ্জ শহরের নীলগঞ্জ রোড এলাকার ভাড়া বাসায় অবস্থান নেয়। পরবর্তিতে ৭ই জুলাই ঈদের দিন সকালে শোলাকিয়ার ইমামকে হত্যা করার জন্য জঙ্গি আবির রহমান ও শরীফুল ইসলাম ওরফে শফিউল ইসলামকে অপারেশনে পাঠিয়ে তামিম আহমেদ চৌধুরী, মেজর জাহিদ ও ফরিদুল ইসলাম আকাশ কিশোরগঞ্জ ত্যাগ করে। কিন্তু তল্লাসি চৌকিতে পুলিশের তৎপরতা নস্যাত করে দেয় তাদের সব পরিকল্পনা। তল্লাসির মুখে পড়ে চাপাতি ও বোমা নিয়ে পুলিশের ওপর হামলে পড়ে জঙ্গি আবির ও শরীফুল। এ সময় জীবন তুচ্ছ করে প্রথম প্রতিরোধ গড়েন চেকপোস্টের দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যরা। সকাল পৌনে ৯টায় জঙ্গিদের এই হামলায় ১৪ পুলিশ সদস্য আহত হন। তাদের তাজা রক্তে নির্বিঘœ হয় শোলাকিয়ায় উপমহাদেশের বৃহত্তম ঈদজামাত। আহতদের মধ্যে কিশোরগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে কনস্টেবল জহিরুল ইসলাম তপুর মৃত্যু হয়। এছাড়া কনস্টেবল আনসারুল হককে ময়মনসিংহ সিএমএইচে নেয়ার পর ওইদিনই দুপুরে সেখানে তার মৃত্যু হয়। শোলাকিয়ার সবুজবাগ মোড় পুলিশ চেকপোস্ট আক্রান্ত হওয়ার পর পরই হামলাকারী জঙ্গিদের ধরতে অভিযানে নামে পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা বন্দুকযুদ্ধ চলে। এ সময় ঘটনাস্থল সবুজবাগ এলাকার গৃহবধূ ঝরণা রাণী ভৌমিক (৪৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে নিজ বাসাতেই মৃত্যুবরণ করেন। এছাড়া পুলিশের গুলিতে জঙ্গি আবির রহমানের ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় এবং জঙ্গি শফিউল গুলিবিদ্ধ অবস্থা র‌্যাবের হাতে ও স্থানীয় তরুণ জাহিদুল হক তানিম পুলিশের হাতে আটক হয়।
এ ব্যাপারে কিশোরগঞ্জ জজকোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটর শাহ আজিজুল হক বলেন, যত দ্রুত সম্ভব মামলাটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হচ্ছে। সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে আসামিদের কয়েকবার আদালতে হাজির করা হয়। সর্বশেষ গত ২৩শে মার্চ আসামিদের হাজিরের দিন ধার্য্য থাকলেও ওইদিন করোনা আতঙ্কে তাদের আদালতে হাজির করা হয়নি। বর্তমানে করোনা পরিস্থিতির কারণে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আসামিদের হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। এ মামলার পাঁচ আসামির তিনজন কাশিমপুর কারাগারে এবং দুইজন কিশোরগঞ্জ কারাগারে রয়েছে। এ সময় তিনি আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আপনার মতামত দিন

বাংলারজমিন অন্যান্য খবর

খাবারে বিষ মিশিয়ে প্রবাসী স্বামীকে হত্যার অভিযোগ

৪ আগস্ট ২০২০

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় স্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রবাসী স্বামীকে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে খাইয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ...

শ্রীপুরে বজ্রপাতে কৃষক নিহত

৪ আগস্ট ২০২০

মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার বালিয়াঘাটা গ্রামে মঙ্গলবার দুপুরে বজ্রপাতে দশরত ওরফে দশাই (৩০) নামের এ কৃষকের ...

হিজলায় বজ্রপাতে পেয়ারা ব্যবসায়ী নদীতে পড়ে নিখোঁজ

৪ আগস্ট ২০২০

বরিশালের হিজলায় বজ্রপাতের ঘটনায় শামীম (৩৪) নামের এক পেয়ারা ব্যবসায়ী নদীতে পড়ে নিখোঁজ রয়েছে। উপজেলার ...



বাংলারজমিন সর্বাধিক পঠিত