সরজমিন: রায়েরবাজার কবরস্থান

দূর থেকে শেষ বিদায়

আল-আমিন

প্রথম পাতা ২৯ জুন ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:৫২

রোববার সকাল নয়টা। রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থান। এখানকার ৮ নম্বর ব্লকটি নির্ধারিত করা হয়েছে করোনায় মৃতদের জন্য। সরজমিন দেখা যায়, গোরখোদকরা  সেখানে সারি সারি ১৭টি কবর খুঁড়ে রেখেছেন। এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া সাদেক হোসেন নামে এক ব্যক্তির লাশ আনা হয় এখানে। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান। মারা যাওয়া সাদেক হোসেনের ৩ জন স্বজন এসেছেন একটি প্রাইভেট কারে। স্বজনরা ৭ নম্বর ব্লকে আহাজারি করছেন।
কিন্তু, কাছে যেতে পারছেন না।  নিহতের লাশ এম্বুলেন্স থেকে সাড়ে তিন হাত লম্বা ব্যাগে করে দুইজন দুইদিকে ধরে কবরে নামান। লাশ দাফনের সঙ্গে সঙ্গে স্বজনরা কবরস্থান ত্যাগ করেন। পাশেই আরেকটি বড় পলেথিনে মোড়ানো এক ব্যক্তির লাশ। কেউ তার নাম বলতে পারলেন না। দুই নারী একটি গাড়িতে করে এসে লাশটি রেখে গেছেন। বলে গেছেন লাশটি দ্রুত দাফন দিতে। এই ব্যক্তিও গত রাতে করোনায় মারা  গেছেন।  বাদল নামে এক গোরখোদক জানান, তারা প্রতিদিন এই কবরস্থানে করোনায় মৃত কমপক্ষে ১০ জনকে দাফন করছেন। লাশ দাফনের সময় অনেক স্বজন ভয়ে কাছে আসেন না। দূরে থাকেন। লাশ দাফনের সঙ্গে জড়িত গোরখোদকদের অনেকের পিপিই নেই। কাউকে কাউকে মাস্ক মুখ ও নাকের নিচে লটকানো দেখা গেছে। অথচ চিকিৎসকরা বলেছেন, লাশ দাফনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের করোনা সংক্রমণের সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস বদলে দিয়েছে মানুষের জীবন। মানুষ মারা যাওয়ার পর তার দাফন-কাফন ও সৎকারে নিজ পরিবারের সদস্যদেরই যেন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক স্বজন কবরস্থানে লাশ রেখেই চলে যাচ্ছেন। তার লাশটি দাফন হলো কিনা অনেকেই খবর নেন না। কোনো কোনো স্বজনদের আচরণে বিস্মিত হন গোরখোদক, খাদেম ও নিরাপত্তা প্রহরীরা। অনেক স্বজনের অমানবিক আচরণে তাদের সঙ্গে তর্ক-বিতর্কের ঘটনাও ঘটছে।
সরজমিন জানা গেছে, রাজধানীর বড় কবরস্থান রায়েরবাজার কবরস্থান। একসঙ্গে ৯১ হাজার কবর দেয়ার জায়গা রয়েছে এতে। করোনা মহামারি আসার পর ঢাকার অনেক কবরস্থানে লাশ দাফনের স্থান না থাকা এবং স্থানীয় কবরস্থান কমিটি লাশ দাফন করতে না দেয়ার কারণে অনেক স্বজন ঢাকার দূর-দূরান্ত থেকে এই কবরস্থানে লাশ দাফন করতে আসছেন। লাশের ভাইরাস যাতে সব জায়গায় ছড়িয়ে না পড়ে এজন্য কবরস্থান কর্তৃপক্ষ ৮ নম্বর ব্লকটিকে নির্ধারিত করছেন। সেখানে নারী ও পুরুষ সকলকে দাফন করা হচ্ছে। দাফন কাজে কবরস্থানে ৩০ জন গোরখোদক নিয়োজিত আছেন। এ ছাড়াও জানাজায় কবরস্থানের মধ্যে থাকা মসজিদের ২ জন ইমাম দায়িত্ব পালন করছেন। করোনার আগে ঢাকার অনেক দর্শনার্থী বড় কবরস্থানটিকে  দেখতে আসতেন। করোনায়  সেখানে দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়াও করোনার স্বজন ছাড়া ৮ নম্বর ব্লকে কাউকে  যেতে দিচ্ছে না নিরাপত্তারক্ষীরা।

সরজমিন দেখা গেছে, ৮ নম্বর ব্লকে সারিবদ্ধ করে ১৭টি কবর খোঁড়া হয়েছে। নতুন আরো কবর খোঁড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে গোরখোদকরা। তারা জানালেন, আগেই কবর খুঁড়ে প্রস্তুত রাখা হচ্ছে। যাতে লাশ আসার সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত দাফন করা যায়।  কবরগুলোর পাশে আগে থেকে বাঁশ কেটে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। দাফন করা ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে প্রতিটি কবরের মাঝখানে বাঁশ কেটে নাম্বারিং করে দেয়া হচ্ছে। গত ৮ই মে থেকে করোনা আক্রান্তে মারা যাওয়াদের দাফন শুরু হয়েছে রায়েরবাজার কবরস্থানে।  লাশবাহী এম্বুলেন্সগুলো বাইরে রাখা হয়। ঢাকা মেট্রো-হ-১১-১০২৩ নম্বরের একটি এম্বুলেন্স দুপুর ১টার দিকে কবরস্থান দিয়ে ঢুকে সরাসরি ৮ নম্বর ব্লকে চলে গেল। জানা  গেল, ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে এক যুবক করোনায় মারা  গেছে। কবরস্থানে আগে থেকে দাফনের দায়িত্বে থাকা চারজন  স্বেচ্ছাসেবক প্রত্যেকে পিপিই পরা।  তারা একটি স্ট্রেচারে করে সাদা কাফনে  মোড়ানো লাশ নামালেন। এরপর কবরস্থানের ইমামসহ সাতজনের উপস্থিতিতে জানাজা পড়ানো হয়। স্বেচ্ছাসেবকরা লাশ স্ট্রেচারে করে কবরের কাছে আনেন। এরপর পিপিই পরা চারজন মিলে লাশ কবরে নামান। পরে বাঁশের পাটাতন সাজানো হয়। এরপর মাটি দেয়া হয়।  পরে যারা দাফনে অংশ নিয়েছেন তারা কবরস্থানের বাম পাশের একটি খালিস্থানে গিয়ে  পিপিই খুলে ফেলেন। শরীর জীবাণুনাশক দিয়ে স্প্রে করে নেন। এসময় পিপিইগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেন। কেউ কেউ আগুনে তাপ  নেন। আগে থেকে থাকা সেখানে গরম পানি দিয়ে হাতের বাহু পর্যন্ত সাবান দিয়ে ধুয়ে নেন।

করোনায় মারা যাওয়া সাদেক হোসেনের স্বজনরা জানান, তিনি গত রাতে ঢাকার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে  ভেন্টিলেটরে থাকা অবস্থায় মারা যান। ষাট বছর বয়সী সাদেক হোসেনের তেমন কোনো রোগ ছিল না বলে স্বজনরা জানালেন। নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম করতেন। হঠাৎ এক সপ্তাহ আগে তার শরীরে জ্বর আসে। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তিনি মারা যান। তিনি ঢাকার একটি অভিজাত এলাকায় বসবাস করেন। স্বজনরা প্রতিবেদককে অনুরোধ জানিয়েছেন যাতে তাদের পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা পত্রিকায় লেখা না হয়। ওই ব্যক্তি পরিবারকে অসিয়ত করে গেছেন তিনি মারা গেলে যাতে গ্রামের বাড়িতে বাবা ও মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়। তার লাশ সেখানে নিয়ে গেলে এলাকাবাসী কী বলে বা দাফন করতে দিবে কিনা এই চিন্তা থেকে তারা সেখানে নিয়ে যাননি। নিহতের গাড়িচালক জানালেন, তিনি মারা যাওয়ার পর অনেক স্বজন তার লাশ দেখতে আসেন নি। এমন কী করোনার ভয়ে অনেকে দাফন করতে আসেন নি।

শফিক আহমেদ নামে নিহত আরেক ব্যক্তির স্বজনরা দূর থেকে কান্নাকাটি করছেন। কিন্তু কেউ কবরের ধারে কাছে গেলেন না। গোরখোদক বাদল জানান, আমরা প্রায় ৩০ জন দিন-রাতে পালাক্রমে ডিউটি করছি। করোনায় মানুষের জীবন কতটা অসহায় হয়েছে তা প্রত্যক্ষ দেখছি। আপন রক্তের লোকজন লাশ রেখে চলে যাচ্ছে। কেউ খবরও নেন না।  এ বিষয়ে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সোহরাব হাসান মানবজমিনকে বলেন, করোনার কাছে মানবিকতা পরাজিত। সবার মনে মানবিকতা, মমত্ববোধ, স্নেহ ও ভালোবাসাকে স্থান দিতে হবে।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

সোহেল

২০২০-০৬-২৮ ১৯:৪৯:৫৯

এই সব কিছুর জন্য মিডিয়াই দায়ী, তাদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি পর্যায়ের প্রচারনার কারনে মানুষ আজ ভীতসন্ত্রস্ত..... টিভিচ্যানেল খুললেই সারাদিন করোনা করোনা..... অতিষ্ঠ হয়ে গেলা।

Kazi

২০২০-০৬-২৮ ১৫:২২:৫১

করোনা সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগণের ভ্রান্ত ধারণা আছে। প্রতি দিন উপসর্গহীন সংক্রমিত ব্যক্তির সঙ্গে মেলামেশা করে আক্রান্ত হচ্ছি। ভয় পায় না। মৃত ব্যক্তির শরীরে ৩ ঘন্টার পর করোনার জীবাণু থাকে না। অথচ তাকে বাঘের মত ভয় পায়।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

পোস্টমর্টেম রিপোর্টে তথ্য

কাছ থেকে ৪টি গুলি করা হয়েছিল সিনহাকে

১০ আগস্ট ২০২০

সাবমেরিন ক্যাবলে জটিলতা ইন্টারনেটে ধীরগতি

১০ আগস্ট ২০২০

দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের (সি-মি-উই-৫) পাওয়ার ক্যাবল কাটা পড়ায় দেশে ইন্টারনেটে ধীরগতি বিরাজ করছে। পটুয়াখালীতে সাবমেরিন ...

স র জ মি ন টেকনাফ

‘থানা গরম প্রবেশ নিষেধ’

৯ আগস্ট ২০২০

করোনা পরীক্ষা

এবার বুথ বন্ধ করে দিতে চায় ব্র্যাক

৯ আগস্ট ২০২০



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত