২৬ বাংলাদেশির লাশ লিবিয়ায় দাফন

মিলিশিয়াদের চাপ না কূটনৈতিক ব্যর্থতা

মিজানুর রহমান

প্রথম পাতা ১ জুন ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:০৮

মর্গে জায়গা ছিল না, রাখা হয়েছিল এসি রুমে। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছিলো না। লিবিয়ায় মানবপাচারকারী ও মিলিশিয়াদের যৌথ হামলায় নির্মমভাবে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহগুলো গলে যাচ্ছিলো। এরমধ্যেই দাফনের জন্য চাপ বাড়াতে থাকে স্থানীয় মিজদাহ শহর নিয়ন্ত্রণকারী মিলিশিয়ারা। বাধ্য হয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২৬ বাংলাদেশির লাশ দিয়ে দেয় এবং তারা তা কবরস্থও করে ফেলে- সরাসরি এই ভাষায় না বললেও ঢাকায় পাঠানো সর্বশেষ রিপোর্টে এমনটাই দাবি ত্রিপোলিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনও তা কবুল করেছেন। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে তিনি বলেছেন, হত্যাকাণ্ডের তদন্তকর্ম শেষ না হওয়া পর্যন্ত মরদেহগুলো মর্গে সংরক্ষণের জন্য ঢাকা অনুরোধ করেছিল যুদ্ধকবলিত লিবিয়ার জাতিসংঘ স্বীকৃত ত্রিপোলি সরকারকে। তারা আশ্বাসও দিয়েছিল।
কিন্তু না, মিলিশিয়াদের চাপে মরদেহগুলো আগেই (ঘটনা জানাজানির দিন শুক্রবার) দাফন হয়ে গেছে। অথচ লিবিয়া সরকার এ নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই বলছে না।
দূতাবাসের রিপোর্ট এবং কিছু প্রশ্ন
২৮শে মে দিনের আলোতে ঘটেছে লিবিয়ার মিজদাহ শহরে পৈশাচিক ওই হত্যাকাণ্ড! বার্তা সংস্থা রয়টার্সের রিপোর্ট মতে মুক্তিপণের জন্য জিম্মি করা হয়েছিল নিহত ২৬ বাংলাদেশিসহ হতাহত বিদেশিদের। তাদের ওপর নির্বিচারে গুলির ঘটনা ঘটে আগের রাতে মানবপাচারকারী চক্রের এক সদস্য খুনের জেরে। খুন হওয়া পাচারকারীর স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা বদলা নিতেই বন্দিশালায় হামলা করে এবং এতে ঘটনাস্থলেই ৩০ জন নিহত, ১১ জন গুরুতর আহত হন। বাংলাদেশ দূতাবাসের রিপোর্টে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে সম্পূর্ণ অক্ষত অবস্থায় আত্মগোপনে চলে যাওয়া এক বাংলাদেশির কথা জানানো হচ্ছে। সায়েদুল ইসলাম নামের ওই বাংলাদেশিকেই ঘটনার প্রথম এবং রাজসাক্ষী হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে দূতাবাস। ঢাকায় পাঠানো শ্রম কাউন্সেলরের প্রথম এবং শেষ রিপোর্টে তাকে ‘হিরো’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। যদিও ঘটনার ৭২ ঘণ্টা অতিবাহিত হলেও ওই শহরে দূতাবাসের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত হননি বা যাওয়ার চেষ্টাও করেনি! প্রশ্ন ওঠেছে দূতাবাসের তরফে ঘটনাস্থল মিজদাহ শহরের পরিস্থিতি যেভাবে বর্ণনা করা হচ্ছে আদতে কি সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাসের কোনো প্রতিনিধির যাওয়া একেবারের অসম্ভব ছিল? ত্রিপোলি থেকে ১০০ মাইল, মতান্তরে ১৮০ কিলোমিটার দূরের ওই শহর থেকে ত্রিপোলি সরকার বা আইওএম’র মাধ্যমে মরদেহগুলো রাজধানীতে এনে মর্গে রাখা কী আদতেই অসম্ভব ছিল? দূতাবাসের দাবি মতে শহরটি মিলিশিয়াদের দখলেই যদি থাকতো তাহলে বিনা বাধায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে আহত ১১ এবং আত্মগোপনে থাকা একমাত্র বাংলাদেশিকে সড়ক পথে বের করে ত্রিপোলিতে আনা সম্ভব হলো কী করে? সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন হচ্ছে; মর্গের স্থান সংকুলান না হওয়ায় লাশগুলো প্রায় গলে যাওয়ার প্রেক্ষিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্থানীয়দের মাধ্যমে তা দাফনে বাধ্য হয়েছে না-কি সত্যিই প্রতিবাদী পাচারকারী-মিলিশিয়ারা লাশগুলো নিয়ে গেছে? দূতাবাসের রিপোর্টে এসব প্রশ্নের জবাব নেই বা অস্পষ্ট!
সরকারের দায়িত্বশীল সূত্র মতে, ত্রিপোলিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সেলর ঢাকায় পাঠানো শনিবারের রিপোর্টে হত্যাকাণ্ড পরবর্তী ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েছেন। দূতাবাসের কেউই ঘটনাস্থল বা মিজদাহ শহরে না যেতে পারার কারণও পরোক্ষভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি। দাবি করেছেন বাংলাদেশকে না জানিয়ে এমনকি লিবিয়ার জাতিসংঘ সমর্থিত কেন্দ্রীয় সরকারকে (লাশ সংরক্ষণে আগাম নির্দেশনা সত্ত্বেও) অন্ধকারে রেখেই লাশগুলো দাফন হয়ে গেছে। দূতাবাসের ওই দাবি বা বক্তব্য কূটনৈতিক  ‘যোগাযোগে ঘাটতি’ বা ‘ব্যর্থতা’র প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বলে মনে করছেন ঢাকার দায়িত্বশীল কেউ কেউ। কারণ হিসেবে তারা যেটা বলছেন তা হলো- দূতাবাসের রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে রাষ্ট্রদূত লিবিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রদূত মন্ত্রীকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, দোষীদের শাস্তি প্রদান এবং তদন্ত কাজ শেষ না হওয়া অবধি আরো স্পষ্টত বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য না-কী অনুরোধ করেছিলেন। দূতাবাসের রিপোর্ট আরো লেখা হয়- ‘মন্ত্রী এই মর্মে আশ্বস্ত করেন যে, তিনি লিবিয়ার স্বরাষ্ট্র এবং আইন মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।’ কিন্তু বাস্তবতা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন সেটি দূতাবাসের রিপোর্টেই প্রমাণ। বলা হয়েছে, ‘মৃতদেহসমূহের বিষয়ে লিবিয়া সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো না হলেও বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক সূত্রের মাধ্যমে জানা যায় যে, ২৯শে মে বিকালে সকল অভিবাসীর মৃতদেহ স্থানীয়ভাবে মিজদাহ শহরে দাফন করা হয়েছে। এই বিষয়ে দূতাবাস থেকে তাৎক্ষণিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং মিজদাহ হাসপাতালের বিভিন্ন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্থানীয়ভাবে দাফনের সত্যতা জানা যায়।
মিশনের রিপোর্টে অস্পষ্টতা পরতে পরতে
বাংলাদেশ মিশনের রিপোর্টের পরতে পরতে অস্পষ্টতা রয়েছে বলে দাবি করেন একাধিক সরকারি কর্মকর্তা। বলেন, স্থানীয়ভাবে মর্গে লাশ রাখার ব্যবস্থা ছিল না। দূতাবাস বা আইওএম কী তা ত্রিপোলিতে নিতে চেয়েছে? না, তারা তা চায়নি। কেউ মিজদাহ হাসপাতালে পড়ে থাকা লাশ অন্যত্র সরিয়ে সংরক্ষণের জন্য উপস্থিত হয়ে কথা বলেনি বা যোগাযোগও করেনি। অন্তত রিপোর্টে সে বিষয়ে খোলাসা বা ইঙ্গিতেও কিছু উল্লেখ নেই। মর্গে জায়গা না থাকলে লাশ গলবেই, আর লাশ গলতে শুরু করলে কেউ চাপ দিক বা না দিক স্থানীয়রা তা দাফনে বাধ্য। তাছাড়া মিলিশিয়াদের চাপে এমনটি হলে ত্রিপলি সরকার জানবে না কেন, বা দূতাবাসের কাছে বলবে না কেন? রিপোর্টে এসব প্রশ্নের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। রিপোর্টটি ছিল এমন ‘লিবিয়ার মিজদাহ শহরে গত ২৮শে মে ২০২০ তারিখে নৃশংস হত্যাকাণ্ডে দুঃখজনকভাবে ২৬ বাংলাদেশি প্রাণ হারান এবং ১১ জন বাংলাদেশি মারাত্মকভাবে আহত হন। এই ঘটনায় একজন বাংলাদেশি প্রাণে বেঁচে আত্মগোপনে চলে যান। মর্মান্তিক ঘটনার পরপরই দূতাবাস হতে লিবিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নোট ভারবাল দিয়ে ঘটনার বিষয়ে অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ জানাতে এবং ঘটনার সাথে যুক্ত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা ও হতাহত বাংলাদেশিদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানানো হয় (পত্র সংযুক্ত)।চ
রিপোর্টে লাশ দাফনের বিষয়ে দূতাবাস যেভাবে তথ্য পেয়েছে তার বর্ণনায় বলা হয়- ‘দূতাবাস ত্রিপোলি সরকারের দায়িত্বশীল বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে। তারা জানান, মিজদাহ একটি ছোট শহর হওয়ায় সেখানকার হাসপাতালে মর্গে বৃহৎ সংখ্যক মৃতদেহ সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুবিধা নাই। ফলে চলমান যুদ্ধ, করোনা পরিস্থিতি এবং স্থানীয় মিলিশিয়াদের চাপে মৃতদেহসমূহ ত্রিপোলিতে প্রেরণ না করে বা কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অনুমতি না নিয়ে স্থানীয়ভাবে দাফন করা হয়েছে। এমনকি তারা বিষয়টি দূতাবাসকেও অবহিত করেনি। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মিজদাহ মরুভূমির মধ্যে অবস্থিত দূরবর্তী একটি শহর। এই শহরটি দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। গত সপ্তাহে ত্রিপোলি সরকারের অনুগত বাহিনী শহরটি অল্প সময়ের জন্য নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, কিন্তু পূর্বাঞ্চলীয় সরকারের পাল্টা আক্রমণে শহরটি আবার ত্রিপলি সরকারের হাতছাড়া হয়ে যায়। এই অবস্থায় শহরটির পুনঃদখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ চলছে। এছাড়াও দীর্ঘদিন যাবৎ শহরটিতে মানবপাচারকারী সশস্ত্র মিলিশিয়াদের দৌরাত্ম বিস্তারের কারণে এবং চলমান যুদ্ধের কারণে সেখানকার স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রতিষ্ঠানসমূহ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। তাছাড়াও যেহেতু সংঘটিত ঘটনায় একজন শীর্ষস্থানীয় মিলিশিয়া জিম্মি অভিবাসীদের হাতে নিহত হয়েছে তাই স্থানীয় সশস্ত্র মিলিশিয়ারা মৃতদেহসমূহ ত্রিপোলিতে স্থানান্তর না করে স্থানীয়ভাবে দাফনের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে বলে জানা গেছে।চ
রিপোর্টের সমাপনীতে বলা হয়েছে- ‘দূতাবাসের পক্ষ হতে আহত ১১ জন বাংলাদেশিকে লিবিয়ান কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় ত্রিপোলিতে স্থানান্তরপূর্বক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে তাদেরকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া মর্মান্তিক ঘটনায় আত্মগোপনে থাকা একমাত্র বাংলাদেশি মাদারীপুরের সাইদুল ইসলামকে তার আশ্রয়দানকারী লিবিয়ানের সহায়তায় অদ্য ত্রিপোলিতে স্থানান্তরপূর্বক দূতাবাসের পক্ষ হতে তাকে অ্যাটর্নি জেনেরেলের কার্যালয়ে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে কোর্ট থেকে তাকে দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে দেয়া হয়েছে। তবে তিনি বর্তমানে মিলিশিয়াদের ভয়ে জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত অবস্থায় আছেন। দূতাবাস থেকে তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং তাকে নিরাপদে রাখার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।’

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

করোনা রোগী না হয়েও...

১৪ জুলাই ২০২০

সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে ৬ কোটি টাকা

শাশুড়ির কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল শাহেদ

১৪ জুলাই ২০২০

ডা. সাবরিনা গ্রেপ্তার

কার্ডিয়াক সার্জন থেকে করোনা প্রতারক

১৩ জুলাই ২০২০

ঈদুল আজহার জামাতও মসজিদে

১৩ জুলাই ২০২০

করোনাভাইরাসের কারণে আসন্ন ঈদুল আজহার নামাজের জামাত এবারও মসজিদে পড়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছে ধর্ম মন্ত্রণালয়। ...



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত