মন্তব্য কলাম

এবারের ঈদ না হয় পুরাতন কাপড়েই উদযাপন করেন

প্রতীক ওমর

মত-মতান্তর ৯ মে ২০২০, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৪:১৯

ধোঁয়াশা কাটেনি। বরং আরো ঘণিভূত হচ্ছে। চার দিকেই আক্রান্ত। মহামারি চলছে। দেশে দেশে। একেবারে থামেনি কোথাও। আমাদের দেশও আক্রান্ত। সংগত কারণেই সাধারণ মানুষ ভাবাক্রান্ত ।
কোন দিকে মোড় নিচ্ছে করোনা পরিস্থিতি মোটেই নিশ্চিৎ করে বলতে পারছে না কেউ। দেশের কেউতো নয়ই বাইরের দেশের বিশেষজ্ঞরাও না। দেশি মানের প্রস্তুতি নিয়েই উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। কতটুকু সম্ভব হচ্ছে সে খবর সবাই জানে। দেখছে।
সময় যত গড়াচ্ছে, আক্রন্তের তালিকা লম্বা হচ্ছে। মৃত্যুর মিছিলেও যোগ হচ্ছে চেনা মুখগুলো। এখন প্রতিদিন রেকর্ড ভাংছে আক্রন্তের সংখ্যায়। ৮ই এপ্রিলের তথ্য অনুযায়ী ভাইরাসটিতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৬। আর আক্রান্তের সংখ্যা ঠেকেছে ১৩ হাজার ১৩৪। বিশ্বের অন্যান্য দেশে যখন আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজারে ঠেকে তখন সেই দেশগুলো লকডাউনের ব্যপারে কঠোর অবস্থান নেয়। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে যেদিন ১০ হাজার ছাড়ে সেই দিন ঘোষণা আসলো লকডাউন শিথিলের। এমন ঘোষণায় অনেকটাই চমকে ওঠেন বিজ্ঞজনরা। প্রশ্ন ওঠে এমন সিদ্ধান্তের যুক্তিকতা নিয়ে। সরকারের সীমিত আকারের সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী হিসেবে দেখছেন অনেকেই। বলা হলো, ১০ তারিখ থেকে ঈদের কেনাকাটার জন্য বিপনী বিতানগুলো খুলে দেয়া হবে। গত ৪ মে প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণা দেন। ঠিক তার পরের দিন ৫মে থেকেই দেশের বেশির ভাগ মার্কেট, দোকানপাট খুলেছে। সেই দিন থেকেই রাস্তায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদেরও শিথিল হতে দেখা গেছে। জেলা শহরগুলোর সড়কে রীতিমত যানযট দেখা যাচ্ছে সেদিন থেকেই। আক্রান্তের হারও বাড়ছে এর পর থেকেই।
লকডাউন শিথিল করে খারাপ অবস্থার মুখোমুখী হয়েছে যে দেশগুলো তাদের দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলেও আমাদের একটা শিক্ষা নেয়া যেত। আমাদের পাশের দেশ ভারত সম্প্রতি তাদের লকডাউন শিথিল করে। ফলে গত ৫মে একদিনে ১৯৫ জনের মৃত্যু দেখেছে। আক্রান্তের সংখ্যাও রেকর্ড ছেড়েছিলো। ওই দিন আক্রান্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৯০০ জন। ভারতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা চার মাসে অর্ধলক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। লকডাউন শিথিল করায় মাত্র তিনদিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১০ হাজারের বেশি।
স্পেনের দিকে যদি তাকাই তাদের লকডাউনের শিথিলতায় করোনা দ্বিগুন আকারে কামড় দিয়েছিলো সেদেশের মানুষকে। তারপর দেশটি আবারো লকডাউন শক্ত করতে বাধ্য হয়েছিলো। আমেরিকা সব ধরণের শক্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকা রাষ্ট্র। সেই রাষ্ট্রও লক ডাউন নিয়ে হেলা করায় কড়া মূল্য শোধ করতে হয়েছে। এখনো হচ্ছে। তারপরেও ট্রাম্প সরকার লকডাউন শিথিলের উদ্যোগ নিলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেকটা অনুরোধের সুরেই বললো আমাদের উপর বিশ্বাস রাখুন। লকডাউন খুলবেন না। এর পরিণাম ভয়াবহ হবে। যা হয়তো সামাল দেয়া করো পক্ষেই সম্ভব হবে না। এতো কিছুর পরেও বাংলাদেশ কোন আশার আলোয় লকডাউন খুলতে যাচ্ছে আমার বোধে আসেনা।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে দোকান পাট, মার্কেট কিভাবে চলবে? এমন পরিবশে কি আমাদের মার্কেটগুলোতে আছে? ঈদে বাঙ্গালীরা এমনিতেই মার্কেটগুলোতে ভিড় করে কেনাকাটা করে। সেই ভিড় সামাল দেবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে এটি অবাস্তব একটি কল্পনা মাত্র। ধরুন একটি কাপড়ের মার্কেটে কাপড় কেনার জন্য মাত্র একজন করোনা রোগী গেলেন। তিনি হয়তো নিজেই জানেন না তার মধ্যে ভাইরাসটি আছে। সেই ভাইরাস বহনকারী ব্যক্তি ৫টি দোকানে গিয়ে একাধিক কাপড় নাড়াচাড়া করে দেখলেন। হয়তো কিছু পোশাক গায়ে দিয়ে দেখলেন। সাইজে হলো না রেখে দিলেন। কাপড়ের রং, ধরণ পছন্দ হলো না তাই ছুঁয়ে দেখা কাপড়ও কেনা হলো না ওই রোগীর। সেই কাপড়গুলো দোকানে আসা অন্য গ্রাহকরাও গায়ে দিয়ে দেখলেন, নাড়াচাড়া করলেন। এখন ভাবুন কি হতে পারে এর ফল। নিমিষেই কত মানুষের শরীরের সাথে মিশে যাবে এই ভাইরাস তার সংখ্যা নিরুপনের জন্য হয়তো আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। কমিউনিটি আক্রমণ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধির সম্ভবনা আছে এই মার্কেটগুলো থেকেই। ইতোমধ্যেই দেশে সামাজিক সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে কলকারখানা খুলে দেয়া হল। এমনকি কেনাকাটার জন্য শপিং মলও খুলে দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আক্রান্ত ও মৃত্যুহার বাড়াই স্বাভাবিক।
কাছের মানুষগুলো, চেনা মানুষগুলোর মৃত্যু হচ্ছে। প্রতিদিন শোনা যাচ্ছে আরো পরিচিত জনের লাশ হওয়ার সংবাদ। আক্রান্ত হয়ে পরিবার পরিজনের চোখের ঘুম হারাম হচ্ছে চারপাশের মানুষের। করুণ মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য পড়শি, আপনজন। চিন্তায় মাথা চক্রর দিচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষের। তখন রাষ্ট্রের ভুল সিদ্ধান্তগুলো নতুন করে পিড়াদায়ক করে তুলছে পুরো দেশকে।
দেশে যখন একটিও করোনা রোগী ছিলো না তখন ইতালি ফেরতদের ১৪ দিনের জন্য আটকে রাখতে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। গাফিলতিও বলা যায়। এসব বিদেশ ফেরতদের মাধ্যমেই দেশে করোনা আসে। সেই ইতিহাস এখন সবার জানা। এর পর দফায় দফায় পোশাক কারখানাগুলো খুলে দিয়ে গ্রাম ফেরত কর্মীদের ঢাকা নেয়া। তার একদিন পর আবারো লাখো কর্মীদের গ্রামে পাঠানো হলো। এমন দৃশ্য দেশবাসী অবাক দৃষ্টিতে দেখেছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানেনা পোশাক কারখানাগুলো খোলার খবর। রাষ্ট্রিয় সমন্বয়হীনাও ভাবিয়ে তুললো সেসময়। এর পর লকডাউন চলা কালেই আবারো পোশাক কারখানাগুলো পুরোদমে খুলে দেয়া হলো। এরপর থেকেই বাংলাদেশের করোনার প্রেক্ষাপট অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পরে। ঢাকার রাস্তা গাড়িতে এবং মানুষে এখন গাদাগাদি। দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে করোনা ভাইরাস। সেই তুলনায় টেস্ট হচ্ছে না। দেশের অনেক ভিআইপি এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও সহজে নমূনা টেস্ট করতে পারছেনা। টেস্টের জন্য সারাদিন অপেক্ষা করে ব্যর্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পথে ঢাকার রাস্তায় লাশ হলো একজন কাপড় ব্যবসায়ী। গণমাধ্যমকর্মীরাও টেস্ট করতে নানা ধরণের বাধায় আটকে গেছে এমন খবরও আছে। এসব দেখলে সহজেই বোঝা যায় আমাদের প্রস্তুতি আর আয়োজন কত সংকটময় হয়ে আছে । এমন পরিস্থিতিতে খোদ রাজধানী সচল হয়ে উঠেছে। মানুষের বাঁধ ভাঙ্গা ভিড় জেলা শহরগুলোতেও। গ্রামের নিয়ন্ত্রণতো কখনোই ছিলো না। দিব্যি চলছে হাটবাজার, একত্রে আড্ডাবাজি। এমনকি চলতি রমজানে গ্রামগুলোতে রীতিমত চলছে ইফতার মাহফিলও।
ঢাকার বেশ কিছু বড় মার্কেট ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে ঈদের আগে তাদের তালা খুলছে না। এমন উদ্যোগ অবশ্যই স্বাগত জানানোর মত। সরকার ঘোষণা দিলেও তারা নিজের থেকেই বন্ধই রাখবে মার্কেট। এই পরিস্থিতিতে এধরণের সিদ্ধান্ত অত্যান্ত সময় উপযোগি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার ক্ষুদ্র এবং মাঝারি ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করেই মার্কেটগুলো খোলার কথা জানিয়েছেন। কিন্তু কথা হলো এসব ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতি দিকে তাকিয়ে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো তার বিপরীত সাধারণ মানুষকে একটি অনিশ্চিৎ অন্ধকারে দিকে ঠেলে দেয়া হবে। কারণ যে দেশের মানুষ আইনকে ভঙ্গকরে হেসে খেলে সে দেশে মানুষ শর্ত মেনে চলবে এমনিটি ভাবা একেবারেই বোকামি। সরকারে নীতি নির্ধারকদের মধ্যেও অনেকেই মার্কেট খুলে দেয়ার ব্যপারে নারাজ। খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন, মার্কেট খুললে পরিস্থিতি খারাপ হবে। সেতুমন্ত্রী সাম্প্রতি করোনা নিয়ে তার ফেসবুকে নানা ধরণের ইঙ্গিত দিয়েছেন। পরিস্থিতি খারাপ হবে এমন ইঙ্গিতই মূলত তিনি দিয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে মার্কেট খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য বিনীত অনুরোধ আমার সরকারের প্রতি। করোনার বর্তমান সংক্রমন পরিস্থিতিতে ঘরে থাকার বিকল্প কিছু নেই। এখনই বের হওয়ার সময় আসেনি। বরং এখন কেবল ঘরে ফেরার সময়। আর সাধারণ মানুষদের বলবো এবারের ঈদে কেনাকাটা একেবারেই না করলেই নয়? এবারের ঈদ না হয় পুরাতন কাপড়েই উদযাপন করেন। (লেখক: কবি ও সাংবাদিক) [email protected]

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মাসুদ

২০২০-০৫-০৯ ০৪:৪৬:১৪

Good

আপনার মতামত দিন



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত