নব্য উদারনীতিবাদ ও বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস

ড. জহির আহমেদ

মত-মতান্তর ৬ এপ্রিল ২০২০, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:০১

রোববার পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৮৮ জন, আর মারা গেছেন মোট ৯ জন। মহামারি, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট- এর মতে, শেষ চব্বিশ ঘণ্টায় বাংলাদেশে নতুন করে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ১৮ জন, মারা গেছেন আরও ১ জন। বৈশ্বিক পরিসরে এই সংখ্যা হচ্ছে আক্রান্ত ১২ লক্ষ ৭৩ হাজার ৭১২ জন আর মৃত্যুবরণ করেছে ৬৯ হাজার ৪৫৮ জন।

করোনা ভাইরাস দ্রুততম হারে চীন, ইটালি, স্পেন, ইরান, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রে মহামারি আকারে রূপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইড অনুসরণ করে কতক সতর্ক পদক্ষেপ এর কথা বলা হচ্ছে। যেমন- ঘন ঘন হাত পরিষ্কার করা, কোয়ারেন্টিনে যাওয়া, সামাজিক দূরুত্ব বজায় রাখা। কিন্তু এই ভাইরাস আসলে কোথা থেকে এলো, তার আচার-আচরণের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য কি, পরিবেশভেদে এই ভাইরাসের গতি প্রকৃতি কি তা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তবে এটি সর্বসম্মত যে, এই করোনা ভাইরাসের কারণে দেশে দেশে জনস্বাস্থ্যসেবা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
সমাজ চিন্তুক হারভে বলেছেন, গত চল্লিশ বছরের উদার নৈতিকতাবাদ ইউরোপ এবং উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার আমজনতাকে জনস্বাস্থ্য সংকটের সময় একেবারে অপ্রস্তুত করে রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কথাটি আরও বেশি প্রযোজ্য বলে মনে করি।

করোনা প্রতিরোধে পাশ্চাত্য ধারার পদক্ষেপগুলো সর্বজনীন ধরা হয়। কিন্তু এটি সমাজ, সংস্কৃতি, ভোগলিক সীমানা, লিঙ্গ, শ্রেণিভেদে ভিন্ন হতে পারে। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ঘরবন্দী হতে বলে, একজনের সাথে একজনকে নিরাপদ দূরত্ব রাখার কথা বলে। আমাদের সমাজ সংস্কৃতি যে ভিন্ন তা ভুলে যাওয়া হয়। দুটো দিক থেকে সংক্রমণের শঙ্কা আজ সবার মনে।

প্রথমত: সরকার ‘ছুটি’ ঘোষণা করেছে গত দশ দিন আগে। এই ছুটি পাশ্চাত্য কায়দায় ‘লকডাউন’ নয়। অনেকটা সফট, অনেকটা মৃদু। পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, সরকার অর্থনীতিকে কোন না কোনভাবে সচল রাখতে চায়। তাই আপদকালীন প্যাকেজ ঘোষণা করে, ৫০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করে গার্মেন্টস মালিকদের জন্যে। তবে অনুচ্চারিত থেকে যায় শ্রমিকদের প্রণোদনা বিষয়ে। লম্বা ছুটিতে পোশাক শ্রমিকসহ মানুষ দেশের বাড়িতে গাদাগাদি করে ছুটে গেল। সোশ্যাল মিডিয়াতে সে ছবি ভাইরাল হয়। শঙ্কা দাঁড়াল এই বুঝি করোনা ছড়িয়ে পড়ল।

দ্বিতীয়ত: ৫ই এপ্রিল ঢাকা শহরের অনেক গার্মেন্টস শ্রমিকদেরকে কাজে যোগদানের ঘোষণা দেয়। চাকুরি বাঁচানোর জন্যে নিম্নআয়ের নারী-পুরুষ ঢাকায় স্রোতের মত আসতে লাগল। গণপরিবহণ বন্ধ থাকার কারণে অনেকেই পায়ে হেঁটে, আবার কেউ কেউ পিকআপ বা ট্রাকে করে ১০০ কিলোমিটার পথ চৈত্রের রোদে পুড়ে ঢাকায় এলো। গার্মেন্টস মালিকদের যুক্তি কি? কেন তারা শ্রমিকদের ডাকলেন এই করোনা ভাইরাস এর ক্রান্তিকালে?

বলা হয় যে, ভাইরাস সবচেয়ে দ্রুত ছড়ায়, আর তা ঘটে মানুষের ওপর ভর করে। এভাবেই সে পরিভ্রমণ করে। কিন্তু আমাদেও দেশে এর কোন বালাই নেই। করোনা ‘এভিডেন্স’ এখানে তেমন নেই, প্রধান কারণ হল- জেনেটিক টেস্টিং সর্বব্যাপী করা হচ্ছে না। অথচ রোগ প্রতিরোধ এবং নিরাময়- দুটোর জন্যেই জেনেটিক এভিডেন্স জানা জরুরি। তা না হলে যেকেউ নিজেকে ‘ঝুকিমুক্ত’ বা ‘নিরাপদ’ ভাবতেই পারেন। সেই জন্যেই বোধ হয় আমাদেও দেশের পলিসি মেকার, গার্মেন্টসের মালিক ফ্যাক্টরি চালু রাখতে চান; আর শ্রমিকেরা পেটের তাগিদে দলবেধে আবার ঢাকায় বা শহরমুখী হন।

উদারনৈতিক প্যাকেজে গার্মেন্টস মালিকদের বলা হয় যদি শ্রমিকদের জন্যে মেডিক্যাল সুরক্ষা দেয়া যায় তবে গার্মেন্টস এ উৎপাদন করা যাবে। বিষয়টি তারচেয়ে বেশি। পূঁজির চরিত্র হচ্ছে বিনিয়োগ, বিনিয়োগ আর পুনঃবিনিয়োগ। ফল হচ্ছে মুনাফা। এটি করপোরেট মুনাফা। এই দুর্দিনে বাংলাদেশের প্রধান প্রধান বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল আর চেম্বারগুলো নীরব। তালা ঝুলছে মুল ফটকে। রোগী নিয়ে চার-পাচ হাসপাতাল ঘুরেও সেবা পাওয়া যায়না। মৃত্যু অবধারিত। করোনা ভয়ে আতঙ্কিত কিছু ডাক্তার আর মালিকরা (স্যালুট আমাদের ডাক্তার আর সেবা কাজে নিয়োজিতদের। এরা একেবারে সম্মুখ সমরে জাতির জন্যে কাজ করছেন)। কারণ করোনা চিকিৎসা অলাভজনক আর ঝুঁকিপূর্ণ। জনস্বাস্থ্যের জন্যে প্রস্তুতি নেয়া এদের কাজ নয়। এরা বিনিয়োগে বিশ্বাসী, পুঁজির সঞ্চালনে আগ্রহী, মুনাফা এদের প্রাণভোমরা। রোগী নয়; এদের চাই ক্লায়েন্ট; সেবা নয়, পরামর্শ দেয়া এদের ফি। একটি ব্যবসা মডেল এদের মাথায় সারাক্ষণ কাজ করে।

অথচ অপেক্ষাকৃত কম উদারনৈতিক দেশ যেমন চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, এবং সিঙ্গাপুর সফলভাবে করোনা সংকট মোকাবেলা করছে। কারণ তাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। চীন হুবেই প্রদেশে করোনা ভাইরাসকে আটকিয়ে রেখেছিল। তার কেন্দ্রে ছিল উহান। এই ভাইরাস বেইজিংসহ পশ্চিম ও দক্ষিণে সংক্রমিত হয়নি।
আমরা শিক্ষা নিইনি। ইটালিফেরত অভিবাসীদেরকে আমরা সঠিক পরিকল্পনার অভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আটকাতে পারিনি। যেমন করে পারছি না দেশের ভেতরে। এই এক দারুণ শঙ্কা আর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে জন পরিসরে। একটি প্রবল ধারণা হচ্ছে, সংক্রমিত রোগ শ্রেণি-গোত্র মানে না। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ এ পদক্ষেপগুলো মিথ তৈরি করছে। কতদিন মানুষ ঘরে আটকে থাকবে? আজ মাননীয় প্রধান মন্ত্রী দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৪ই এপ্রিল নাগাদ ঘরে থাকতে বলেছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে খেটে খাওয়া শ্রমজীবী আর পোশাক শ্রমিক (যাদের মাঝে নারীই বেশি) এর জন্যে হোম কোয়ারেন্টির বেমানান। এটি শ্রেণী নির্দিষ্ট। আমার মত নিশ্চিন্ত চাকুরীজীবীদের জন্যে এই রিচুয়াল পালন করা অনেকটা সহজ। আমার ঘর আমার অফিস, আমি ফেবু করি, আমার বেতন এটিএম বুথ থেকে তুলতে পারি।

উদার নৈতিক পুঁজিবাদ ‘জনসেবার’ উপর গুরুত্ব দেয়; করপোরেট রেস্পন্সিবিলিটি’র স্পেস তৈরি করে। তাই আমরা দেখি করোনা মোকাবেলায় ‘আপদকালিন গিফট’ দেয়া হয়। চাল, ডাল, সাবান, সানিটাইজার সমেত পোটলা ঢাকা শহরের অলি গলিতে দেয়া হয়। সেই সেলফি শোভা পায় ফেবু নিউজ ফিডে কিংবা ঝকমকে ফেবু ওয়ালে। পোশাক শ্রমিকদের এই ধরণের ‘সুরক্ষা গিফট’ দেয়া হবে বলে আমরা জানতে পাই। আসলে এই গিফট মুনাফা নিশ্চিতকরণের গিফট- যা নিয়ে তারা করোনার সাথে যুদ্ধ করবে। এর দুটো সাঙ্গরসিক দিক রয়েছে- হয় ফ্যাক্টরিতে থেকে করোনা ভাইরাসকে মোকাবেলা করতে হবে; নতুবা ঘরে ফিওে বেকার হয়ে ক্ষুধাকে মোকাবেলা করতে হবে। একটি ভয়ঙ্কর প্রশ্নের মুখোমুখি আমরা হই। কে ঘওে থেকে কাজ করবে আর কে পারবেনা? সে সুবাধে হোম কোয়ারেন্টিটনে থাকা না থাকা আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা (মজুরিসহ বা মজুরি ছাড়া) সমাজে অসম অবস্থা তৈরি করছে।

এই সংকট মোকাবেলায় কতক দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। প্রথমতঃ স্বাস্থ্য পরিচর্যা গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সব নয়। ঘন ঘন হাত ধোয়া ও মাস্ক ব্যবহার করা দরকারি। কিন্তু মহামারী নিয়ন্ত্রণে একমাত্র সমাধান নয়। ভাইরাস আমাদের চার পাশে আছে; আমাদের মধ্যে আছে। কিন্তু টুলসগুলো সহজলভ্য করা জরুরি। দ্বিতীয়ত: কেবল মাত্র ‘লক ডাউন’ করা সমাধান নয়। সরকারকে নিম্ন আয়ের/প্রান্তিক মানুষের জন্যে প্রণোদনা দিতে হবে (যেমন করেছে পশ্চিম বঙ্গ)। বেসরকারি খাত বিশেষত এনজিওগুলো (যেমন গণস্বাস্থ্য, আকিজ, বসুন্ধরা) এগিয়ে আসতে পারে। উহানের মত এক বিছিন্ন জগতে এক সাথে সবাইকে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।

(লেখক: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং অভিবাসন ও সীমান্ত বিষয়ক টাস্কফোরস সদস্য, আমেরিকান এন্থ্রোপলজিকাল এসোসিয়েশন। )

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

মেরিনা সুলতানা

২০২০-০৪-০৫ ২৩:৪৫:৪২

এখনো অনেক দেরি হয়ে গেছে মনে হয়,মৃতের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এভাবে আমাদের দেশের মানুষ বুঝবে না। একজন মানে একটা পরিবার,একটা এলাকা সর্বোপরি তার সংস্পর্শে আসা সবাই।এটা যে কত গুন তা এদেশের অসচেতন জনগোষ্ঠী বুঝে না।তাই এ মুহূর্তে দরকার পুরোপুরি গৃহে বন্দী করা। কিভাবে এ কাজ কারা যায় বা করা সম্ভব সব উপায় গুলো চিহ্নিত করা। প্রয়োজনেে এলাকা ভিত্তিক কারফিউ দেয়া যেতে পারে। সাহায্য বা ত্রান পাওয়ার জন্য যেন ঘর থেকে বের হতে না হয় তার ব্যবস্থা করা। যারা অন্যান্য রোগে অসুস্থ হয়ে ঘরে আছেন ডাঃ এর কাছে যাওয়া দরকার তাদের ঘরেই সেই সুযোগ করে দেবার জন্য যদি কোন ব্যবস্থা নেয়া যায় তাহলেও মানুষের মনে কিছুটা সস্থি আসবে। মোট কথা মানুষকে ঘরে থাকার মানসিকতা বাড়াতে হবে। প্রয়োজনীয় প্রতিটি সেবা ঘরে পাওয়ার নিস্চয়তা দিলে করোনার বিস্তার কিছুটা কমানো যাবে। সর্বোপরি সকল সেক্টর সমন্বিত ভাবে পরিকল্পনা নিতে হবে। আবার যেন কোন শ্রমিক গনহারে কাজে যোগদানের উদ্দেশ্য বের হতে না হয় সেই রকম সিদ্ধান্ত গুলো আগেই পরিকল্পিত ভাবে গ্রহন করতে হবে।মনে রাখা প্রয়োজন মানুষ বাঁচলে দেশ আবার জেগে উঠবে।ভাঙ্গা অর্থনীতি আবার সচল হবে যদি মানুষ বেঁচে থাকে। তাই মৃত্যুর হার যেভাবে কমানো যায় তার সবকটি দিক খুঁজে ভালোভাবে তা চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী কঠোর পদক্ষেপ এখনই নেয়া দরকার। আর সময় নেই। 'শেষ ভালো যার সব ভালো তার' এই স্লোগানকে সামনে নিয়ে দৃড় প্রত্যয়ে মানুষকে ঘর থেকে না বেরুনোর জন্য যা যা করনীয় তার সফল কার্যকর করার সময় শুরু হোক এখনি।

আপনার মতামত দিন



মত-মতান্তর সর্বাধিক পঠিত