বিলেতের জার্নাল- অসম যুদ্ধের সাহসী যোদ্ধারা!

যুক্তরাজ্য থেকে ডা: আলী জাহান

অনলাইন ২৬ মার্চ ২০২০, বৃহস্পতিবার, ১১:২০ | সর্বশেষ আপডেট: ২:০৫

২১.০৩.২০ তারিখে বিবিসি রেডিও ফাইভ (Five Live) ইংল্যান্ডের এক এনএইচএস (NHS, UK) হাসপাতালের ইমারজেন্সি ডিপার্টমেন্টের কনসালটেন্টের ৩৪ মিনিটের সাক্ষাৎকার প্রচার করেছে। NHS হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা এবং আগামী কয়েক সপ্তাহে কী ঘটতে পারে সে সম্পর্কে ধারণা দিয়েছেন এ সহযোদ্ধা। সবাইকে বারবার অনুরোধ করেছেন- দয়া করে বাসার বাইরে আসবেন না। আপনি বাঁচুন, অন্যকে বাঁচতে দিন, আপনার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা NHS কে রক্ষা করুন।

NHS হচ্ছে ইংল্যান্ডের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নাম। ব্রিটিশ জনগণ তাদের স্বাস্থ্য সেবার জন্য প্রধানত এনএইচএস এর উপর নির্ভর করে থাকেন। এর বাইরে প্রাইভেট স্বাস্থ্য ব্যবস্থা খুব একটা পরিচিত বা জনসাধারণের জন্য সহজলভ্য নয়।

সাক্ষাৎকার প্রদানকারী ডাক্তার বলেন যে তাঁর ডিপার্টমেন্টের ৮০ জন স্টাফের মধ্যে ৪০ জন ইতিমধ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে হোম আইসোলেশনে। কেউ কেউ ফিরে আসছেন।
কেউ কেউ এখনো অসুস্থ।বাকি সবাই একে একে আক্রান্ত হবেন- তা জেনেও কেউ পালিয়ে যাননি। অদৃশ্য দানবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মাঠ ছেড়ে
পালায়নি কেউ। পালিয়ে যাবার ইতিহাস নেই।

৪২ বছর বয়সী ডাক্তারের নাম আল। উনি বলছিলেন উনি প্রায় নিশ্চিত যে কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের ভেতরে উনি নিজেও করোনা আক্রান্ত হবেন। করোনা রোগীর সংস্পর্শে থাকার জন্য হয়তো হোম আইসোলেশনে দুই সপ্তাহের জন্য বাসায় আসবেন। রোগের উপসর্গ দেখা দিলে সাত দিন বাসায় থাকবেন।ভাগ্যে লেখা থাকলে কাজে ফিরবেন। না হয় উনি আর কখনোই ফিরবেন না। ডাক্তার আল যখন এ কথা বলেন, তখন প্রেজেন্টার নিশ্চুপ হয়ে যান। কয়েক সেকেন্ডের জন্য রেডিও নিরব হয়ে গেলো।আমিও নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। এও কি সম্ভব? ব্রিটিশ জনগণ কেন তাদের ডাক্তারদের নিয়ে গর্ব করবে না?

উনি বলছিলেন যে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উনি কোন ছুটি নেন না। সপ্তাহের সাত দিনই ডিউটি করছেন। সামনে কয়েক সপ্তাহ বাসায় ফিরবেন না। রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাবে।যখন ক্লান্ত হয়ে যাবেন তখন হাসপাতালের ভেতরে ঘুমাবেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে তাদের থাকার জায়গা করে দিয়েছে। প্রত্যেকের জন্য আলাদা করে একটি ব্যাগ প্রস্তুত করেছে। সে ব্যাগে তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন টুথপেস্ট, টুথব্রাশ, তোয়ালে ইত্যাদি রেখে দেয়া হয়েছে। করোনা রোগীর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে ডাক্তার আলদের আর ঘরে ফেরা হবেনা। হাসিমুখেই তারা মৃত্যু ঝুঁকিকে আলিঙ্গন করছেন। তারা হাসপাতালেই যাবেন এবং থাকবেন। করোনা রোগীর পাশে থাকবেন।হাসপাতাল থেকে বাসায় আসা যাওয়া করতে যে সময়টা নষ্ট হবে সেই সময়টা তারা রোগীদের পেছনে খরচ করতে পারবেন। হাসপাতালে তাদের জন্য এখন ব্যাগ অপেক্ষা করছে। হাসপাতাল থেকে বাড়ি আসার পরিবর্তে বেঁচে যাওয়া সময়টুকু রোগীকে দেবেন। এটুকু সময়ের জন্যই হয়তো কোনো করোনা রোগী তার জীবন ফিরে পেতে পারে।

ডাক্তার আল বলছিলেন- যখন আমরা ডাক্তার হই তখন আমাদের শেখানো হয় যে মানুষের জীবন অনেক বেশি মূল্যবান। অর্থবিত্ত কিংবা সামাজিক মর্যাদা দিয়ে রোগীদের আলাদা করা যাবে না। আমাদের কাছে সবাই সমান। সবাইকে আমরা একই ভাবে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। যুদ্ধের ময়দানে আহত সবাই আমাদের কাছে সমান।আহত সৈনিকদের যুদ্ধক্ষেত্রে রেখে আমরা পালিয়ে যেতে পারি না।এই যুদ্ধ থেকে আমি পিছপা হতে পারি না। করোনার হাতে আমার মৃত্যু হতে পারে, এর পরেও আমাকে ওখানেই থাকতে হবে। আমি থাকবো। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আমি পালিয়ে যাবোনা।তবে করোনার শেষ দৃশ্য দেখে যেতে পারবো কিনা জানিনা। আমি না থাকলেও আমার পরবর্তী জেনারেশন দেখবে যে আমি পালিয়ে যাইনি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রোগীকে সেবা দিয়ে গিয়েছি। মৃত্যুভয় আমাকে আমার কর্তব্য থেকে পিছুটান দিতে পারেনি।

ডা: আলের প্রবল আশঙ্কা যে আগামী কয়েক সপ্তাহের ভেতরে ব্রিটেনের হাসপাতালগুলোতে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যে তাদের হাতে জীবন রক্ষাকারীএকটি ভেন্টিলেটরের বিপরীতে ৭/৮ জন করোনা রোগী থাকতে পারে। তাদের তখন এ কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে ১ জনকে ভেন্টিলেটর দিয়ে অবশিষ্ট সাত জনের মৃত্যু দৃশ্য অবলোকন করা। দুর্ভাগা অবশিষ্ট সাতজন রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে বলা লাগতে পারে "দুঃখিত, আপনার রোগীকে আমরা ভেন্টিলেটর দিয়ে বাঁচাতে পারছিনা। কারণ, আমাদের হাতে তাকে দেয়ার মত কোন ভেন্টিলেটার নেই।" ডাক্তার আল বলছিলেন যে উনি যখন ডাক্তার হয়ে ওঠেন তখন এরকম কোন শিক্ষা পাননি যে রোগীদের ভিন্ন চোখে দেখতে হবে। একজন রোগীকে চিকিৎসা দেবেন কিন্তু সাতজনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবেন এমন ভয়াবহ দৃশ্যটি চিন্তা করতেও তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠছে।

ডাক্তার আলের অনুরোধ- "ব্রিটেনের প্রিয় নাগরিকবৃন্দ, দয়া করে ঘরের বাইরে আসবেন না। বাসার ভেতরেই থাকুন। যদি সম্ভব হয় কাজ থেকে ছুটি নিন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করুন। করোনা ভাইরাস নিয়ে NHS এর উপদেশ মেনে চলুন।আপনি বেঁচে থাকলে আবার চাকুরি করতে পারবেন। আবার ব্যবসা করতে পারবেন। Social Distancing ছাড়া, এ দানবকে খাঁচায় আটকানো সম্ভব নয়। আপনার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা NHS কে বাঁচান। আমরা আপনাদের জন্য আছি। আপনাদের সাহায্য করার জন্য আমাদের বাঁচতে দিন। আমরা যদি না বাঁচি তাহলে আপনাদের কেউ সাহায্য করতে পারবে না। হাসপাতাল থাকবে কিন্তু ডাক্তার থাকবে না। ওয়ার্ড থাকবে কিন্তু নার্স থাকবে না। আমরা সবাই যদি করোনা ভাইরাসে অসুস্থ হয়ে পড়ি বা মারা যাই তাহলে অসুস্থ হলে কে দেখবে আপনাদের?"

ডা: আলের কথা ভাবছি। অসম যুদ্ধের বীর সেনানী।ডা: আলের মতো আমাকেও হাসপাতালে যেতে হয়। রোগী দেখতে হয়। আমি অবশ্য Accident and Emergency ডিপার্টমেন্টে কাজ করিনা। অন্য স্পেশালিটির ডাক্তার।যখন ঘুমাই তখন এই ভয় থাকে যে সকালে যখন উঠবো তখন যদি গায়ে জ্বর থাকে অথবা কাশি উঠে- জীবনটা হুট করে পাল্টে যাবে। চারপাশের পরিচিত দৃশ্য অপরিচিত হয়ে যাবে। এমন অবস্থা থেকে মাবুদে এলাহি আমাদের রক্ষা করো।

ডা: আলী জাহান
বিলেতে কর্মরত বাংলাদেশি সাইকিয়াট্রিস্ট

[email protected]

ফুটনোট
কেউ বিবিসি রেডিও ফাইভে দেয়া ডাক্তার আলের সাক্ষাৎকার (ইংরেজি) শুনতে চাইলে নিচের লিংকে গিয়ে পোডকাস্ট শুনতে পারেন

https://www.bbc.co.uk/programmes/p0877mb2

আপনার মতামত দিন



অনলাইন অন্যান্য খবর

দায়িত্ব হস্তান্তর ও যৌথসভায় ডিইউজে’র নেতৃবৃন্দ গণমাধ্যম কর্মীদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও ঝুঁকি ভাতাসহ ৯ দফা দাবি

২৯ মার্চ ২০২০

গণমাধ্যম কর্মীদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও ঝুঁকি ভাতা প্রদান এবং বাংলা নববর্ষের ...



অনলাইন সর্বাধিক পঠিত