কি হচ্ছে মালয়েশিয়ায়?

মানবজমিন ডেস্ক

প্রথম পাতা ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৩৮

চরম নাটকীয় এক সপ্তাহ পার করছে মালয়েশিয়া। দেশটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে। একের পর এক মোড় নিচ্ছে চলমান অস্থিরতা। সোমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদত্যাগ করে সে অস্থিরতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ড. মাহাথির মোহাম্মদ। স্থানীয় সময় দুপুর ১টার দিকে রাজা ইয়াং দি-পেরতুয়ান আগং আল-সুলতান আব্দুল্লাহ রি’আয়াতুদ্দিন আল-মুস্তফা বিল্লাহ শাহ্‌র কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। রাজা তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। কিন্তু মন্ত্রিপরিষদের প্রধান সচিব মোহাম্মদ জুকি আলী জানান, মাহাথিরকেই অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছেন রাজা। নতুন নেতা নির্বাচিত ও মন্ত্রিপরিষদ গঠন না হওয়া পর্যন্ত তিনিই প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।

মাহাথিরের পদত্যাগ মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য বড় একটি ধাক্কা। এতে হতবাক হয়েছেন তার সমর্থক থেকে শুরু করে বিরোধীরাও। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রবীণ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ২০১৮ সালে ক্ষমতায় আসেন মাহাথির (৯৪)। নিজের একসময়কার ডেপুটি আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে জোট গড়ে নিজের শিষ্য নাজিব রাজাকের বিরুদ্ধে লড়ে নির্বাচনে জেতেন তিনি। দেশটির রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়েন। জোট গড়ার চুক্তির অংশ হিসেবে ক্ষমতায় এলে আনোয়ারকে প্রধানমন্ত্রী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে তার এ প্রতিশ্রুতি নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। রোববার অভিযোগ ওঠে, আনোয়ারকে ছাড়া নতুন সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছে মাহাথিরের দল। এর মধ্যে সোমবার পদত্যাগ করে সবাইকে হতবাক করে দেন সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মালয়েশিয়া শাসন করা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে নিজের দল পার্টি প্রিবুমি বেরসাতু মালয়েশিয়ার (পিপিবিএম) চেয়ারম্যান হিসেবেও পদত্যাগ করেছেন তিনি। ক্ষমতাসীন জোট পাকাতান হারাতান থেকেও সরে গেছে দলটি। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে মালয়েশিয়ার রাজনীতি? কে হচ্ছেন মালয়েশিয়ার পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী? আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা কতটুকু?
আনোয়ার-মাহাথিরের ইতিহাস: মালয়েশিয়ার বর্তমান রাজনৈতিক চাঞ্চল্যতা পুরোপুরি বুঝতে হলে মাহাথির ও আনোয়ারের পূর্ব ইতিহাস জানা আবশ্যক। মাহাথির ছিলেন মালয়েশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার গঠিত রাজনৈতিক দল বারিসান ন্যাশনাল মালয়েশিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় টানা ক্ষমতায় থাকা দল। বারিসান ন্যাশনালের নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মাহাথিরের প্রথম টানা ক্ষমতার এক পর্যায়ে তার উপ-প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী ছিলেন আনোয়ার। তাকেই মাহাথিরের উত্তরসূরি মনে করা হতো। কিন্তু ১৯৯৮ সালে দেশটির অর্থমন্দার সময়ে এক দ্বন্দ্ব ঘিরে তাদের সম্পর্কে ফাটল দেখা দেয়। সমকামিতা ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে কারাদণ্ড পান আনোয়ার। তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিলো বলে দাবি করেন অনেক বিশ্লেষক। ২০০৩ সালে দলপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ ছেড়ে যান মাহাথির। তার উত্তরসূরি হন অপর এক শিষ্য নাজিব রাজাক। কিন্তু তার বিরুদ্ধে দেশটির সরকারি তহবিলের অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অর্থলুণ্ঠনের অভিযোগ ওঠে। তাকে পরাজিত করতে ২০১৮ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেন মাহাথির। এতে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন চমক সৃষ্টি হয়। নিজের এক শিষ্যকে উৎখাত করতে জেলে থাকা আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে হাত মেলান মাহাথির, যাকে তার সরকারের আমলেই কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। আনোয়ারের দল পিপল’স জাস্টিস পার্টি ও মাহাথিরের পিপিবিএম’র নেতৃত্বে গঠিত হয় জোট হারাতান পাকাতান। মাহাথির প্রতিশ্রুতি দেন ক্ষমতায় আসলে আনোয়ারকে কারাগার থেকে মুক্ত করে তার হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দেবেন। নির্বাচনে জয়ী হয় তাদের জোট। কিন্তু আনোয়ারের হাতে ক্ষমতা না দিয়ে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন মাহাথির। কথা দেন দুই বছর পর ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন। কিন্তু সম্প্রতি তার ওই প্রতিশ্রুতি নিয়ে ফের আশঙ্কা দেখা দেয়। সপ্তাহান্তে প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদের দল ও অন্যান্য গ্রুপের মধ্যে একটি নতুন সরকার গঠন নিয়ে বিস্ময়করভাবে এক আলোচনা শুরু হয়। সম্ভাব্য ওই নতুন সরকার থেকে প্রধানমন্ত্রী পদে উত্তরসূরি দাবিদার আনোয়ার ইব্রাহিমকে বাইরে রাখা হয়। পাকাতান হারাপানের প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল আনোয়ার ইব্রাহিমের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তারা মাহাথিরের ওপরই তাদের আস্থা প্রকাশ করে। রোববার মাহাথির মোহাম্মদের দলকে অভিযুক্ত করে তাদেরকে বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করেছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। তার অভিযোগ, মাহাথির মোহাম্মদের দল ২০১৮ সালে ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়া ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (ইউএমএনও) সঙ্গে নতুন সরকার গঠনের ষড়যন্ত্র করছে।
নতুন মোড়: প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগের মধ্যে সোমবার প্রধানমন্ত্রী, নিজ দলপ্রধান হিসেবে পদত্যাগ করেন মাহাথির। রোববার অভিযোগ ওঠে, আনোয়ারকে বাদ দিয়ে বিরোধীদের সঙ্গে মিলে সরকার গঠনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মাহাথির। পার্লামেন্টে পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিলো না তাদের। ফলস্বরূপ তিনি পদত্যাগ করেন। একই দিন আনোয়ারের দল পিকেআর-এর ৯ সদস্যও পদত্যাগ করেন। মাহাথিরের সঙ্গে মিলে বিশ্বাসঘাতকতার দায়ে দল থেকে উপ-প্রধান মোহাম্মদ আজমিন আল ও পিকেআরের ভাইস প্রেসিডেন্ট জুরাইদা কামারুদ্দিনকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। এতে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় পিকেআরও।

ভিন্ন সুর: এদিকে, সোমবার সকালে মাহাথির ও পরে রাজার সঙ্গে বৈঠক করেন আনোয়ার। বৈঠক শেষে তার মুখে শোনা যায় ভিন্ন কথা। আনোয়ার বলেন, ইউএমএনও’র সঙ্গে মিলে কাজ করতে চান না বলেই পদত্যাগ করেছেন মাহাথির। নতুন সরকার গঠনের চেষ্টায় মাহাথিরের কোনো ভূমিকা ছিলো না বলে জানান তিনি। অন্যরা তার নাম ব্যবহার করে এমনটা করেছে। আনোয়ার বলেন, তিনি আমার কাছে বলেছেন যে, ক্ষমতা দখলে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তিনি খুব সপষ্ট করে বলেছেন যে, বিগত সরকারের কারো সঙ্গে তিনি কাজ করবেন না।
পিকেআর প্রেসিডেন্ট আরো বলেন, আমি পাকাতান হারাপান ও কেয়াদিলানের পক্ষে ড. মাহাথিরকে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে অনুরোধ করেছি। এই প্রতারণা একসঙ্গে সামলানোর আহ্বান জানিয়েছি। কিন্তু তিনি মানেননি। অবশ্যই, ওনার নিজস্ব মতামত আছে। দুর্নীতিগ্রস্তদের সঙ্গে তাকে জড়ানোয় মনঃক্ষুণ্ন হয়েছেন তিনি।

অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী মাহাথির: মালয়েশিয়ায় সকাল থেকেই ঘটতে থাকা বিরামহীন নাটকীয়তায় শেষ পেরেক গাঁথলেন দেশটির রাজা। সোমবার স্থানীয় সময় ৫টার দিকে রাজা ইয়াং দি-পেরতুয়ান আগংয়ের সঙ্গে দেখা করেন মাহাথির। দুজনের মধ্যে কী আলোচনা হয় সে বিষয়ে কিছু না জানিয়ে প্রাসাদ ত্যাগ করেন মাহাথির।
পরবর্তীতে দেশটি প্রধান সচিব জুক আলী এক বিবৃতিতে জানান, মাহাথিরকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন রাজা। সংবিধানের আর্টিকেল ৪৩ (২)(এ) মেনে নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ পাওয়া না পর্যন্ত তিনিই এ দায়িত্ব পালন করবেন। ফলস্বরূপ, নতুন প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত ও মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হওয়ার আগে দেশটির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবেন তিনি। সংবিধানের আর্টিকেল ৪৩ (২)(এ) অনুসারে, রাজা পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে নিজের পছন্দসই প্রার্থীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে পারবেন।

এখন যা হবে: বর্তমানে মালয়েশিয়ায় সরকার গঠনের জন্য পার্লামেন্টে পর্যাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই মাহাথির বা আনোয়ার কারোরই। মাহাথির পদত্যাগের পরপর ক্ষমতাসীন পাকাতান হারাপান জোট ত্যাগ করেছে তার দল পিপিবিএম। এর ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে পাকাতান হারাপান। পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১১২ আসন। বর্তমানে তাদের রয়েছে ৯২ আসন। অন্যদিকে পিপিবিএমও সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এ রাজনৈতিক সংকট সমাধানে কি উপায় আছে তা খোঁজা হচ্ছে। এমতাবস্থায় মাহাথিরকে অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিলেন রাজা।

সবমিলিয়ে মাহাথিরই দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন। একাধিক রাজনৈতিক ব্লক তার প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছে। পাকাতান হারাপান প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল আজ মঙ্গলবার চলমান পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি বৈঠক করার কথা রয়েছে। তবে বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হবে তা জানা যায়নি।

এদিকে, দেশটির নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগের ক্ষেত্রে পার্লামেন্টে বেশি সমর্থনপ্রাপ্ত প্রার্থীকে নিমন্ত্রণ জানাতে পারেন রাজা। যদি ওই প্রার্থী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হন তাহলে অন্য কাউকে সরকার গঠন করতে বলতে পারেন তিনি। অন্যথায়, আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও আছে।
(বিবিসি, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, আল জাজিরা, স্টার অনলাইন, দ্য নিউ স্ট্রেইট টাইমস অবলম্বনে।)

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

সামছুল মালয়েশিয়া প্র

২০২০-০২-২৪ ২০:৫৬:২৪

ভালো লাগলো,মালোয়েশিয়ার বেশি বেশি খবর আপনাদের মাধ্যমে জানতে চাই।

আপনার মতামত দিন



প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

‘লকডাউন’

২৭ মার্চ ২০২০

ছুটির নোটিশ

২৬ মার্চ ২০২০

আজ ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মানবজমিন-এর সকল বিভাগ বন্ধ থাকবে। তবে ...



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত