পোশাক রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে

এম এম মাসুদ

প্রথম পাতা ২৬ জানুয়ারি ২০২০, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:২৯

দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে মন্দাভাব কাটছে না। চলতি অর্থ বছরের শুরু থেকেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের রপ্তানি  প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। নতুন-পুরোনো এবং ছোট-বড় সব বাজারেই রপ্তানি কমছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) কমেছে বেশি হারে। ইইউ জোটে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৭ শতাংশ। অন্যদিকে একক বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্রে এ সময়ে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তাণিপণ্য দুর্দিন পার করছে। অন্যদিকে, ব্যবসায় অনবরত ক্ষতির মুখে পড়ে গত কয়েক মাসে ছোট বড় মিলিয়ে দেশের অর্ধ শতাধিক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।
কাজ হারিয়েছে কয়েক হাজার শ্রমিক।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চীন-মার্কিন বাণিজ্য যুদ্ধের ফলে পোশাক খাতের যেসব মার্কিন ক্রেতা চীন থেকে পোশাক কিনতেন, তাদের অনেকেই বাংলাদেশমুখী হবেন বলেই মনে করা হচ্ছিলো। কিন্তু তা হয়নি। বিশ্ববাজারে মন্দা আর প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সক্ষমতার অভাবে এমন নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির দিকে যাচ্ছে পুরো রপ্তানি খাত। তারা বলেন, পোশাক খাত শক্ত ভিত্তিতে নেই। বর্তমানে দেশের পোশাক খাত অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং মুহূর্ত পার করছে। বিজিএমইএর হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে কারখানা বন্ধ হয়েছে ৬১টি এবং চাকরি হারিয়েছেন ৩১,৬০০ জন শ্রমিক।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) পণ্য রপ্তানি আয়ের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের ৬ মাসে বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে সার্বিক রপ্তানি আয়। অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) ১ হাজার ৯৩০ কোটি ২১ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৫.৮৪ শতাংশ কম। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কমেছে ১২.৭৭ শতাংশ।
এর মধ্যে ৬ মাসেই ধারাবাহিকভাবে পোশাক রপ্তানি আয়ও কমেছে। এই ৬ মাসে ১ হাজার ৬০২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। এই আয় গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭.৭৪ শতাংশ কম। একই সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় কমেছে ১৩.৬৩ শতাংশ। অন্যদিকেব ডিসেম্বর মাসে প্রবৃদ্ধি ও লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি তৈরি পোশাক খাত।
ইপিবি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে সব ধরনের পণ্য রপ্তানিতে বৈদেশিক মুদ্রার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৫৫০ কোটি ডলার। ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষ রপ্তানি আয় অর্জিত হয়েছে ৪ হাজার ৫৩ কোটি ৫০ লাখ ৪ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছর প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রপ্তানির আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ২১২ কোটি ডলার। এইছয় মাসে রপ্তানি আয় এসেছে ১ হাজার ৯৩০ কোটি ২১ লাখ মার্কিন ডলার। যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১৩.৭৪ শতাংশ কম।
পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের জুলাইয়ে পোশাক থেকে রপ্তানি আয় হয় ৩০২ কোটি, আগস্টে ২৭২ কোটি, সেপ্টেম্বরে ২৪৬ কোটি, অক্টোবরে ৩১৪ কোটি এবং নভেম্বরে ২৮৫ কোটি ইউএস ডলার। একইভাবে ২০১৯ সালের জুলাইয়ে রপ্তানি আয় হয় ৩৩১ কোটি, আগস্টে ২৪১ কোটি, সেপ্টেম্বরে ২৩৪ কোটি, অক্টোবরে ২৫২ কোটি এবং নভেম্বরে আয় হয় ২৫১ কোটি ইউএস ডলার।
বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, তৈরি পোশাক খাত কঠিন সময় পার করছে। সরকারের নীতি সহায়তা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। একই সঙ্গে আমরা নগদ সহায়তা ঘোষণার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ করছি।
পোশাক খাতের এই পরিস্থিতিতে রপ্তানিতে আরো দর কষাকষির পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, যদি এই পোশাক কিনতে (বিদেশি ক্রেতারা) এক ডলার করেও দাম বেশি দিত, তাহলে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে আরো উন্নত করা সম্ভব হত। সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বস্ত্র দিবসের অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে এ কথা বলেন তিনি।

ইপিবি এবং বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, গেল ডিসেম্বর পর্যন্ত চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ইইউতে রপ্তানি কম হয়েছে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭১ কোটি ডলার। এ সময় ৯৮২ কোটি ডলারের পোশাক গেছে ওই জোটে। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৫৩ কোটি ডলার। গত ৬ মাসে রপ্তানি আয়ের ৬১.৩০ শতাংশ এসেছে ইইউ থেকে। আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৬১.৬৫ শতাংশ। প্রধান বাজারে রপ্তানির এই দশায় চিন্তিত উদ্যোক্তারা। তারা বলছেন, জরুরি তৎপরতা শুরু না করা গেলে রপ্তানি আরো বেশিহারে কমে যাবে।
ইইউ জোটের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পোশাক নেয় জার্মানি। বছরে কমবেশি ৬০০ কোটি ডলারের পোশাক যায় দেশটিতে। গেল ছয় মাসে এ দেশটিতে রপ্তানি কমেছে সাড়ে ১০ শতাংশ। ২৬৫ কোটি ডলারের পোশাক গেছে জার্মানিতে। আগের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ২৯৬ কোটি ডলার। দ্বিতীয় প্রধান বাজার যুক্তরাজ্য। দেশটিতে আলোচ্য সময়ে রপ্তানি কমেছে ১ শতাংশের বেশি। রপ্তানি হয়েছে ১৮৫ কোটি ডলারের পোশাক। আগের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৮৭ কোটি ডলার। জোটে তৃতীয় প্রধান আমদানিকারক দেশ স্পেন। দেশটিতে রপ্তানি কমেছে ২ শতাংশের মতো। রপ্তানি হয়েছে ১২১ কোটি ডলারের পোশাক। আগের একই সময়ে ছিল ১২৩ কাটি ডলার।
জোটগত প্রধান বাজার ইইউ ছাড়া একক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে গত ৬ মাসে পোশাক রপ্তানি কম হয়েছে ৩.৬৭ শতাংশ। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি বেশি ছিল ১.৪৪ শতাংশ। গেল ৬ মাসে ২৯৮ কোটি ডলারের পোশাক গেছে দেশটিতে। আগের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩১০ কোটি ডলার। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমেছে ১২ কোটি ডলার। মোট পোশাক রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের অংশ ১৮ থেকে ২০ শতাংশ।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির শুরু থেকে প্রচলিত বাজার হিসেবে ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কানাডাকে বিবেচনা করা হয়। আলোচ্য সময়ে দেশটিতে পোশাক রপ্তানি কমেছে সাড়ে ১১ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ৫০ ডলারেরও কম। আগের বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ কানাডায় রপ্তানি কমল ৬ কোটি ডলার।
এই তিন বাজারের বাইরের বাজারগুলোকে অপ্রচলিত বা নতুন বাজার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চীন, জাপান, ভারত অস্ট্রেলিয়াসহ ১১ দেশ রয়েছে এই শ্রেণিতে। চলতি অর্থবছরের গত ৬ মাসে এসব দেশে গড়ে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৬ শতাংশ। রপ্তানি হয়েছে ২৭২ কোটি ডলারের পোশাক। আগের অর্থবছরেরর একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২৯০ কোটি ডলার। অর্থাৎ এসব দেশে রপ্তানি কমেছে ৮ কোটি ডলার। সব বাজার মিলে গেল ছয় মাসে পোশাক রপ্তানি কম হয়েছে ৬.১১ শতাংশ।
বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের সঙ্গে ইইউ মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এবং দেশে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের সঙ্গে সক্ষমতা হারাচ্ছি আমরা। তিনি জানান, গত ৫ বছরে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৮ শতাংশ। এ সময় পোশাকের দর কমেছে গড়ে ৩.৬৪ শতাংশ।

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Md.Giash uddin

২০২০-০১-২৬ ০৫:৪০:৪০

আমার মতে প্রথম এবং প্রধান কারণ বায়ার গোষ্ঠী আমাদের মজুরি বৃদ্ধির জন্য সহমত পোষণ করেন নাই। দ্বিতীয়ত ব্যবসায়িক সংগঠন এর অধিকাংশ নেতাই রাজনৈতিক আয়ের খাতকে বেশী প্রাধান্য দিয়ে পেলেছন। তৃতীয়ত বড় বড় কারখানার মালিকদের ধারণা ছোট ছোট কারখানার গুলো তাদের জন্য ডিসটার্ব তাই এ্যাকর্ড এলায়েন্স ও কম্পপ্লাইন্সের কঠিন ও কঠোর যাতা কলে পেলে ছোট কারখানা গুলো বন্ধ করার সফল চেষ্টা চতুর্থত মনোপলি ব্যবসার জন্য ছোট কারখানার চেয়েও কম প্রাইচ করে অর্ডার কালেকশনে লিপ্ত থাকা। পঞ্চমত নূন্যতম মজুরি নির্ধারণ করা হল কিন্তু নূন্যতম পন্যের প্রাইচ নির্ধারিত হল না। ষষ্ঠত বিজিএমইএ সংগঠন ছোট বড় মাজারি কোন খতিয়ান কিংবা জরিপ করে কাদের জন্য কি সুবিধা দিতে হবে নিতে হবে কোন রকমের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন নাই। সপ্তমত আমি বিজিএমইএ তে বিগত ১০ বছর ধরে যাতায়াত কিন্তু কোন দিন কেউ জিজ্ঞেসা কর নাই আপনার কারখানা কেমন চলছে? দশমত আজ শ্রমিক কর্মচারীরা এত শক্তিশালী তারা এক আওয়াজে সব কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে কিন্তু একজন মালিককে পিটিয়ে মেরে পেললেও অন্য মালিক সহজে আসবে না, শুধু মাত্র ভিআইপি কিংবা সিআইপি ছাড়া। ইত্যাদি নানান কারণে এই বৃহত্তর কর্মসংস্থানের জায়গাটুকু ধ্বংসের ধার পান্তে।

Raju

২০২০-০১-২৬ ১৪:৪১:৫৪

লাইট ইন্জিনিয়ারিং,ঔষধ শিল্প,ফুড প্রসেসিং,জাহাজ নির্মান শিল্প এগুলোর দিকে মনযোগ দিতে হবে।

আপনার মতামত দিন



প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

মুজিববর্ষ

সংসদের বিশেষ অধিবেশনে বক্তা প্রণব মুখার্জি

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বিদেশ গমনে সতর্কতার পরামর্শ

করোনায় একের পর এক বন্ধ হচ্ছে আন্তর্জাতিক ইভেন্ট

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

হাসিনার প্রশংসায় জোলি

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কাদের-ফখরুলের টেলিকথনে যা ছিল

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

মশার উৎপাত নগরজুড়ে

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

করোনার প্রভাব

দাম বেড়েছে চিকিৎসা যন্ত্রপাতির

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

করোনা

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

২৭ দেশে করোনা, উদ্বিগ্ন হু

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০



প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত