বিপিএল বাজিতে কাঁপছে দেশ

শুভ্র দেব ও পিয়াস সরকার

প্রথম পাতা ১৫ জানুয়ারি ২০২০, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৪

সোমবার দুপুর সাড়ে তিনটা। বঙ্গবন্ধু বিপিএল’র ইলিমিনেটর রাউন্ডে ঢাকা প্লাটুন ও চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের খেলা চলছে। খিলগাঁও এলাকার একটি চায়ের দোকানে বেশ কিছু মানুষের জটলা। কাছে গিয়ে টেলিভিশনের পর্দায় দেখা গেল বল হাতে প্রস্তুত ঢাকা প্লাটুনের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা। আর ব্যাট হাতে প্রস্তুত চট্টগ্রাম চালেঞ্জার্সের ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যান ক্রিস গেইল। চায়ের দোকানে জুনেদ নামের এক ক্রেতা তখন বললেন এই ওভারে ক্রিস গেইল তিনটি বাউণ্ডারি মারবে। পাশে বসে থাকা আল আমিন নামের আরেকজন বললেন কোনো বাউণ্ডারি হবে না। জুনেদ বললেন, ২ হাজার টাকা বাজি।
রাজি হয়ে গেলেন আল আমিন। পরে মাশরাফির করা প্রথম ৫টি বল একে একে ডট হলো। ৬ নম্বর বলে পেলেন ১ রান। জুনেদ তখন আল আমিনের হাতে তুলে দিলেন ২ হাজার টাকা। এই চায়ের দোকানে এর পরের বেশ কয়েকটি ওভারেও এভাবেই বাজি ধরা হয়। এতে কেউ হারলেন কেউ জিতলেন।
 
এখন চলছে বঙ্গবন্ধু বিপিএল’র শেষ পর্যায়ের খেলা। আর এই সুযোগেই জমে উঠেছে ছোট বড় জুয়াড়িরা। এবারের বিপিএল’র প্রথমদিকে জুয়াড়িদের তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে শেষ দিকে ক্রিস গেইল, শেন ওয়াটসন খেলতে আসায় তারা হুমড়ি খেয়ে পড়েছেন। বিপিএলকে ঘিরে শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে চায়ের দোকান, হোটেল, তারকা হোটেল ও বিভিন্ন অফিসে বসে চলছে জুয়ার আসর। এমনকি ছাত্রাবাস ও মেসের মধ্যেও জুয়ার আসর বসছে। বাজি ধরে অনেকেই সর্বশান্ত হচ্ছেন। তবে অন্যান্য বছরের মত আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা থাকায় এ বছর আগে থেকেই সতর্ক জুয়াড়িরা। কৌশল পাল্টে নতুন কৌশলে তারা জুয়া খেলছেন। যদিও এবছর কোনো জুয়াড়ি আটকের খবর পাওয়া যায়নি।

১০ই জানুয়ারি শুক্রবার বিপিএল’র প্রথম খেলায় নেমেছিলো ঢাকা প্লাটুন ও রংপুর রেঞ্জার্স। এই খেলায় ১১ রানে জয় পায় রংপুর। ঢাকা ছিলো তুলনামূলক শক্তিশালী দল। তুলনামূলক কম শক্তিশালী দল রংপুর জেতায় ঢাকা বেছে নেয়া বাজিকররা বেশ বড় ধাক্কা খেয়েছেন। ঢাকা নিয়ে ৬৭ হাজার টাকা জিতেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ৩৭টি বিট নিয়েছিলাম। বিট হচ্ছে এক একটি ডিল। যার প্রতিটির সর্বনিম্ন মূল্য ১ হাজার টাকা। তিনি আরো বলেন, ৩৭টি বিটের বিপরীতে পেয়েছেন ৪২ হাজার টাকা। আর দলীয়ভাবে পেয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। ঢাকা হেরে গেলে তাকে দিতে হতো ৭৪ হাজার টাকা।

রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী থাকেন ছাত্রাবাসে। তিনি নিজে বাজি খেলার পাশাপাশি পুরো ছাত্রাবাসের সবাই মিলে গড়ে তুলেছেন সিণ্ডিকেট। নিয়মিত বাজি খেলা এই দলটি এবারের বিপিএল কেন্দ্রীক অবলম্বন করছেন নতুন পন্থা। আগে তারা তাদের এলাকার বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে বেটিং করিয়ে দিতেন ঢাকাতে থাকা পরিচিতদের সঙ্গে। দুই ব্যক্তির বেটিং ঠিক করে দেন পেটিসখোররা। জয়ী ব্যক্তির কাছ থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ টাকা কেটে রেখে দেন তিনি। অর্থ্যাৎ পেটিসখোররা মধ্যস্থতাকারী। এসব টাকার লেনদেন হয় সাধারণত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।

সম্প্রতি বন্ধ হয়ে গেছে বেট এশিয়া ৩৬০ ডিগ্রি। এই বেটিং সাইটে একাধিক বাজিকর খেলার সুযোগ পেত। এখানে মাত্র ২০ টাকা দিয়েও খেলা যেত। এখন এটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পেটিসখোররা মিলে গড়ে তুলেছেন একটি এনালগ ফাণ্ড।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, একাধিক মেসে নতুন নিয়মে এই বাজি চলছে। মিরপুর-১ এর একজন শিক্ষার্থী পরিচলানা করেন ১৮ জনের একটি পেটিসখোরদের দল। তিনি বলেন, আমরা আগে এককভাবে পেটিস খেতাম। কিন্তু বেটিং সাইট বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেক অনলাইনে শতাংশের হিসেবে বাজি খেলা ব্যক্তি পাওয়া গেছে। যার ফলে আমরা পরিচিতদের নিয়ে এই দলগুলো তৈরি করি। বেটিং সাইটে কোন দলের ওপর কতো টাকা ইনভেস্ট করা হয় তা দেখা যেত না। এখন বিশ্বাসযোগ্যতা এসেছে কারণ কে কতো টাকা ইনভেস্ট করছে তা তারা নিজেরাই গ্রুপে জানিয়ে দিচ্ছেন। ফলে বাজিকররা নিজেরাই চাইলে হিসেব করে ফেলতে পারছেন। আর খেলা শেষে আমাদের লাভের অংশ রেখে দিয়ে দিচ্ছি তাদের।

উত্তরবঙ্গ টাইগার্স নামে একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপে রোববার দেখা যায়, প্রথম কোয়ালিফায়ার ম্যাচের জন্য বেটিং চলছে। সোমবারের দ্বিতীয় ম্যাচে অংশ নেয় খুলনা টাইগার্স ও রাজশাহী রয়েলস। দেখা যায়, খুলনার পক্ষে বেটিং হয়েছে ২৮ হাজার টাকা ও রাজশাহীর পক্ষে ৩৬ হাজার টাকা। তিনি বুঝিয়ে দিলেন তাদের কৌশল। খুলনার পক্ষে ২৮ জন ধরেছেন ১ হাজার টাকা করে। ৩৬ জন ১ হাজার করে রাজশাহীর পক্ষে। এই অবস্থাতে যদি আর কেউ বিট না ধরেন তবে খুলনা জয় পেলে একেকজন পাবেন ২ হাজার ২৮৫ টাকা। তার লাভ ১ হাজার ২৮৫ টাকা। আর রাজশাহী জয় পেলে একেকজন পবেন ১ হাজার ৭৭৭ টাকা। লাভ ৭৭৭ টাকা। আর এই জয়ী ব্যক্তিদের কাছ থেকে ১০ শতাংশ করে কেটে রাখেন পেটিসখোররা। আর এই টাকা পেটিসখোররা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন। এই গ্রুপের আরেক সদস্য বলেন, এবারের বিপিএল শুরুতে বাজির পরিমাণটা অনেক কম ছিলো। কিন্তু চট্টগ্রাম পর্ব শুরু হবার পর থেকে জমে উঠেছে খেলা। সেই সঙ্গে জমে উঠেছে বাজিও। এটি বাজির নতুন কৌশল। এছাড়াও পুরাতন কৌশলে বাজিও চলছে রমরমা।

দলীয় জয়ের পাশাপাশি হ্যান্ড টু হ্যান্ড, প্রতিবলে রান, প্রতি ওভারে রান, নির্দিষ্ট ওভারে রান (৬, ১০, ১৮ ও ২০), কোন ওভারে কোন বোলার বল করবেন, ব্যাটসম্যান ও বোলাররা জোড়া বেজোড়া রান করবেন ও দিবেন টস ইত্যাদি।
এদিকে গতানুগতিক এসব জুয়ার পাশপাশি অনলাইনেও চাঙ্গা জুয়া খেলা। অনলাইনে বিভিন্ন বেটিং সাইটে কোটি কোটি টাকার ক্রিকেট বাজি ধরছেন জুয়াড়িরা। বেটিং সাইটে চলমান খেলার প্রতিমূহুর্তের আপডেট পাওয়া যায়। ম্যাচ চলাকালীন সময়ে কোন দল জিতবে, কত রানে বা কত গোলে দল জিতবে, কোন খেলোয়াড় কত রান বা কত গোল করবে, কোন ওভারে কত রান হবে, কোন বলে বাউন্ডারি হবে এসব বিষয়ে বাজি ধরা হয়। অনলাইনে জুয়া বন্ধে গত বছর সরকার প্রায় দুই হাজার বেটিং সাইট বন্ধ করে দিয়েছিলো। কিন্তু তারপরও জুয়াড়িরা বসে থাকেনি। ভিপিএন দিয়ে তারা বন্ধ হওয়া অনেক সাইটে জুয়ার আসর বসাচ্ছে। এছাড়া নতুন নতুন আরও অনেক সাইটে এখন হরহামেশাই জুয়াড়িরা খেলছেন। গত বছরে বন্ধ হওয়া বেট ৩৬৫ সাইটটি বন্ধ হওয়ার পর আর চালু হয়নি। তবে বেটএশিয়া ৩৬৫ ডট কমের মোবাইল ভার্সন, বেটউইন৩৬৫ ডটএক্সওয়াইজেড, বেটসসন, মাইবেটিং সাইট, ডটইউকে, বেটইন৭৭ ডট কম, ্‌ওয়ান এক্সবেট, বেটসেইফ, পিনাকেল, বেটউইন৬৯,  বেট২৪জেডএন, বেটইন৭৭ সহ আরও একাধিক সাইট এখনও চালু আছে। তীর কাউন্টার ডটকমের ডেস্কটপ ভার্সন গত বছরে বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। এই নামে এখন নতুন একটি সাইট চালু করা হয়েছে।

ঢাকা মেট্রেপলিটন পুলিশের সাইবার অপরাধ ও নিরাপত্তা বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার আ ফ ম আল কিবরিয়া মানবজমিনকে বলেন, আমরা অনেকগুলো বেটিং সাইড আগেই বন্ধ করে দিয়েছি। চলতি বছর আমাদের নজরদারি রয়েছে। প্রক্সি সার্ভার দিয়ে কেউ  বেটিং করছে কিনা। যদি কোনো সুনির্দিষ্ট  সাইটের বিষয়ে আমরা অভিযোগ পাই তবে ব্যবস্থা নেব।  

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার কৃষ্ণ পদ রায় মানবজমিনকে বলেন, বেটিং আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। অন্যান্য বছর বিপিএলকে ঘিরে যারা বেটিং করেছে তাদের আমরা আইনের আওতায় এনেছি। এ বছরও ডিএমপির প্রতিটি থানায় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কোথাও যদি কাউকে বেটিংয়ের সঙ্গে জড়িত পাওয়া যায় তবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান অবঃ মেজর হোসেন ইমাম মানবজমিনকে বলেন, জুয়াড়িরা মাঠে যাতে জুয়া খেলতে না পারে সেজন্য প্রতি বছরের মত এবারও ম্যাজিস্ট্রেট রাখা হয়েছে। তারা সার্বক্ষনিক খেয়াল রাখছেন। এছাড়া বিসিবির এন্ট্রি করাপশন ও নিরাপত্তা ইউনিটের (আকসুর) ফিল্ড কর্মীরা কাজ করছেন। তবে এ বছর এখন পর্যন্ত কোনো জুয়াড়িকে শনাক্ত করা যায়নি। কারণ মাঠে যারা জুয়া খেলে তারা এখন আগের চেয়ে অনেক সতর্ক। তবুও নজরদারি অব্যাহত আছে। আর মাঠের বাইরের জুয়াড়িদের ব্যাপারে আমরা সতর্ক। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

আপনার মতামত দিন

প্রথম পাতা অন্যান্য খবর

ঢাকা সিটিতে ভোট ১লা ফেব্রুয়ারি

পিছু হটলো নির্বাচন কমিশন

১৯ জানুয়ারি ২০২০

মিয়ানমারের অনীহা

ভেস্তে যেতে বসেছে ত্রিদেশীয় উদ্যোগ

১৯ জানুয়ারি ২০২০

ভাড়ায় মিলে মামলার বাদী!

১৯ জানুয়ারি ২০২০

১৬ দিনে এসেছেন ১৬১০ বাংলাদেশি

সৌদি থেকে ফেরার মিছিল

১৮ জানুয়ারি ২০২০

অনিশ্চয়তায় ভোটাররা

১৮ জানুয়ারি ২০২০





প্রথম পাতা সর্বাধিক পঠিত