আবেদের বয়ানে ব্রাকের সূচনার কথা

অনলাইন ডেস্ক

বই থেকে নেয়া ২২ ডিসেম্বর ২০১৯, রোববার

ডিসেম্বরের ৬ তারিখে ভারত যেদিন স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলো, সেদিন আমি ছিলাম কোপেনহেগেনে। সেদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সেদিন আমরা দেখা করতে গেছি। মন্ত্রীকে বললাম, ভারত আজ আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। আপনারা কবে স্বীকৃতি দেবেন?
তিনি বললেন, যত দ্রুত সম্ভব। ইউরোপের মধ্যে আমরাই প্রথম বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে চাই। তবে আমরা আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করবো।
১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেল। ১৯৭২ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ডেনমার্কসহ ব্রিটেন, পশ্চিম জার্মানি, ফিনল্যান্ড, সুইডেন, নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও ইসরাইল আমাদের স্বীকৃতি দিলো।
ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী তখন শিলংয়ে অবস্থান করছিলেন। তিনি সিলেট অঞ্চলে খাদ্য প্রেরণের জন্য আসাম সরকারের অনুমতি গ্রহণের চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।
তিনি আমাকে লিখলেন, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। আমরা এখন বাংলাদেশে যাব।
আসামে সিলেট অঞ্চলের যে শরণার্থীরা ছিল, তাদের সঙ্গে ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী তামাবিল সীমান্ত দিয়ে সিলেটে ঢুকলেন।
১৭ই জানুয়ারি আমি দেশে ফিরে এলাম।
ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী বললেন, সিলেটের শাল্লা এলাকা ছিল হিন্দু অধ্যুষিত। পাকিস্তানি সেনারা পুরো এলাকাটাই ধ্বংস করে ফেলেছে। আমরা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে বসবাসরত লোকজনদের দেখতে গেলাম। তখন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন ওখানকার এমপিএ। ভিকারুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের দেখা হয়েছিল সুনামগঞ্জে। তিনিও ঐ এলাকায় আমাদের যেতে বলেছিলেন।
শাল্লায় গেলাম। দেখলাম, অনেক গ্রাম প্রায় নিশ্চিহ্ণ করে দেয়া হয়েছে। ঘরবাড়ির অস্তিত্ব নেই।
আমরা শাল্লায় কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভেবেছিলাম, শহরাঞ্চলে তো অনেকেই অনেক কিছু করবে। প্রত্যন্ত গ্রামে অনেকেই আসতে চাইবে না। অথচ এ অঞ্চলের মানুষের জন্য কাজ করাটা জরুরি। যারা সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে, পাশে না দাঁড়ালে, তাদের বেঁচে থাকা কষ্টকর হবে। এত যুদ্ধ আর রক্তপাতের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হলো, এখন দেশের মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার চাইতে জরুরি কাজ আর কী আছে?
‘অ্যাকশন বাংলাদেশ’, ‘হেল্প বাংলাদেশ’ নামে এতদিন কাজ করছিলেন বিদেশের মাটিতে। এবার নিজের দেশের মাটিতে এসে কীভাবে কাজ শুরু করলেন?
এতদিন বিদেশে বসে দেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করছিলাম। এবার স্বাধীন দেশের দরিদ্র, অসহায়, সবহারানো মানুষের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করলাম। এজন্য একটা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন। গ্রামের মানুষের জন্য কাজ করবো, তাই প্রতিষ্ঠানের নাম দিলাম ‘বাংলাদেশ রিহ্যাবিলেটশন অ্যাসিস্ট্যান্স কমিটি’, সংক্ষেপে ‘ব্র্যাক’।
এটা ছিল ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ঘটনা।
প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য একটা বোর্ড গঠন করার প্রয়োজন ছিল। বোর্ডে কারা থাকবেন, এবার সেই মানুষ খোঁজার পালা। আকবর কবীর সাহেব ‘হেল্প বাংলাদেশ’- এ কাজ করেছেন। তিনি বোর্ডে থাকতে রাজি হলেন।
আকবর কবীর বললেন, আমরা কবি বেগম সুফিয়া কামালকে বোর্ডের চেয়ারম্যান করতে পারি। তাঁকে সঙ্গে নিয়ে গেলাম বেগম সুফিয়া কামালের বাড়িতে। গিয়ে বললাম, আমরা ব্র্যাক নামে একটি প্রতিষ্ঠান করেছি। আমাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কাজের পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত বললাম। পরে অনুরোধ জানালাম, আপনাকে আমরা ব্র্যাক’র চেয়ারম্যান নিযুক্ত করতে চাই।
বেগম সুফিয়া কামাল আমাদের প্রস্তাবে সম্মত হলেন। তারপর আমরা সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের কাছে গেলাম। আবদুর রাজ্জাক পরে জাতীয় অধ্যাপক হয়েছিলেন। তাঁকে বললাম, পরিচালনা বোর্ডে আপনাকে থাকতে হবে।
তিনি জানতে চাইলেন চেয়ারম্যান হবেন কে?
বেগম সুফিয়া কামালের কথা শুনে অধ্যাপক রাজ্জাক বোর্ডের সদস্য হতে সম্মত হলেন। তিনি বললেন, বেগম সুফিয়া কামাল যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, তার সঙ্গে যুক্ত হতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
সাবেক সচিব কাজী ফজলুর রহমানকে বোর্ডে রাখতে চাইলাম। সত্তরের ঘূর্ণিঝড়ের সময় ‘হেল্প’ নামে যখন কাজ করছিলাম, তখন তিনি আমাদের অনেক সাহায্য-সহযোগিতা করেছিলেন। তিনিও রাজি হলেন ব্র্যাক’র পরিচালনা বোর্ডের সদস্য হতে। একটি খ্যাতনামা তেল কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন এস আর হোসেন। তিনি একজন উদ্যমী মানুষ ছিলেন। ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী যখন কলকাতায় ‘হেল্প বাংলাদেশ’-এর অফিস করেছিলেন, তখন তিনি সেখানে কাজ করতেন। তাঁকেও ব্র্যাক’র বোর্ডে রাখার সিদ্ধান্ত হলো।
কবি বেগম সুফিয়া কামাল, অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, কাজী ফজলুর রহমান, আকবর কবীর, ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী, এসআর হোসেন এবং আমি এই সাতজনকে নিয়ে ব্র্যাক’র প্রথম গভর্নিং বডি গঠন করা হলো।
বোর্ড আমাকে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করলো।
বেগম সুফিয়া কামাল ব্র্যাক’র প্রথম চেয়ারম্যান। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৭২ সালের মার্চ মাসের শেষে ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী চলে গেলেন লন্ডনে। তারপর পঁচিশ বছর তিনি বিদেশে আইন ব্যবসায় জড়িত থেকেছেন। তবু আমি সব সময় মনে করি, ভিকারুল ইসলাম চৌধুরী ব্র্যাক’র কো-ফাউন্ডার। আমরা একসঙ্গে ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেছি। তিনি বর্তমানে দেশে ফিরে এসেছেন।
মার্চ মাসের পর থেকে আমি নির্বাহী পরিচাক হিসেবে ব্র্যাক’র দায়িত্ব পালন শুরু করলাম। বোর্ড আমাকে সর্বতোভাবে সাহায্য করতে থাকলো। বেগম সুফিয়া কামালের পর বোর্ডের চেয়ারম্যান হলেন সৈয়দ হুমায়ুন কবীর। ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি ব্র্যাক’র চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এখন আমি ব্র্যাক’র চেয়ারপার্সন।
ব্র্যাক’র পরিচালনা বোর্ডে সদস্য নিযুক্তির ব্যাপারে আমি আগাগোড়া সতর্ক ছিলাম। সব সময় এমন কৃতী মানুষদের আনতে চেয়েছি যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে সংগঠনের জন্য কাজ করবেন। যাঁরা ব্র্যাক’র কাছে কিছুই চাইবেন না। কিন্তু দেবেন অনেক কিছু।
আমাদের দেশে অনেক প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ড আছে। এসব বোর্ডে যাঁরা থাকেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠান থেকে অনেক কিছু পেতে চান। আত্মীয়স্বজনকে চাকরি দিতে হবে, নিজের জন্য গাড়ি লাগবে ইত্যাদি। নানারকম চাহিদা থাকে তাঁদের। প্রাপ্তিযোগের সম্ভাবনা থেকেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। প্রতিষ্ঠানটি ঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা মোটেও তাঁদের কাছে গুরুত্ব পায় না। ফলে প্রতিষ্ঠানটি কখনও যথাযথভাবে কার্যকর হয়ে উঠতে পারে না।
কিন্তু ব্র্যাক’র পরিচালনা বোর্ডের সদস্যগণ কখনও কোনো চাহিদা নিয়ে ব্র্যাক’র কাছে আসেননি। বোর্ডের কোনো সদস্য কোনো দিন বলেননি, আমার গাড়ি লাগবে বা আমার আত্মীয়কে চাকরি দিতে হবে।
এখনও যাঁরা ব্র্যাক’র পরিচালনা বোর্ডে রয়েছেন তাঁরা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে কাজ করছেন। ব্র্যাক যে আজ এত বড় হয়েছে, তার অনেকটা কৃতিত্ব বোর্ডের সদস্যদের। যে কোনো অবস্থায় বোর্ড আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
আমরা অনেক সময় দেখি, বোর্ড সবকিছু আঁকড়ে ধরে থাকে। নির্বাহী পরিচালককে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয় না। কিন্তু ব্র্যাক’র পরিচালনা বোর্ড সবসময় আমাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিয়েছে। তাঁরা কখনও আমার কাজে হস্তক্ষেপ করেননি। আমি আমার মতো করে কাজ করতে পেরেছি। এজন্য ব্র্যাক’র কর্মধারায় সব সময় একটা গতিশীলতা ছিল।
স্বাধীনতার পর যখন বিদেশ থেকে ফিরে আসি, তখন সঙ্গে টাকা-পয়সা তেমন একটা ছিল না। আমরা বিভিন্ন উৎস থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করতাম, তা প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের কোনো না কোনো কাজে ব্যয় করা হতো।
ভিকারুল ইসলাম চৌধুরীর কলকাতার ব্যাংক একাউন্টে ২৫ হাজার ভারতীয় রুপি ছিল। এই সামান্য টাকা দিয়ে তো আর কাজ চলবে না। আরও টাকা চাই। কাজ করার ইচ্ছা যত প্রবলই হোক না কেন, টাকা না থাকলে এগোনো যাবে না। সুতরাং অর্থ সংগ্রহই তখন প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়ালো।  
লন্ডনে আমার ছোট একটি ফ্ল্যাট ছিল। আমি যখন বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের জন্য কাজ করেছি, তখন তো আমার চাকরি ছিল না। নিজের খরচ চালানোর জন্য ঐ ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিয়েছিলাম। বিক্রি করে পেয়েছিলাম ৬৮০০ পাউন্ড। লন্ডনের একটা ব্যাংকে এই অর্থ রেখে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এটা দিয়ে পরবর্তী তিন-চার বছর আমার চলে যাবে।
ব্র্যাক’র কাজ শুরু করার জন্য লন্ডনের ব্যাংক থেকে ঐ অর্থ তুলে দেশে নিয়ে এলাম। কলকাতায় ভিকারুল ইসলাম চৌধুরীর অ্যাকাউন্টের ২৫ হাজার ভারতীয় রুপি এবং আমার ফ্ল্যাট বিক্রির ৬৮০০ পাউন্ড দিয়ে ব্র্যাক’র প্রথম কার্যক্রম শুরু হলো। শাল্লার মানুষের জন্য ‘রিলিফ অ্যান্ড রিহ্যাবিলিটেশন’ কর্মসূচি শুরু করলাম। সেদিক থেকে ব্র্যাক’র প্রথম ‘ডোনার’ আমি নিজে।
সদ্য স্বাধীন বিধ্বস্ত দেশ। চারদিকে অগণিত অসহায় মানুষ, পাকিস্তানিদের অত্যাচার, নিপীড়ন আর হত্যাযজ্ঞে ধ্বংস্তূপ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশ। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে সেটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। সেই দেশের মানুষের জন্য কাজ করবো, তখন এটাই আমাদের প্রধান চিন্তা। আমার নিজের বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট এসব বৈষয়িক চিন্তা মাথায়ই ছিল না। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য কাজ করবো- সেটাই মাথায় ঘুরপাক খেত সারাক্ষণ। নিজের ফ্ল্যাট বিক্রির টাকা এনে ব্র্যাক’র জন্য কাজ করছি এ কথা ভেবে মানসিক তৃপ্তি পেতাম। কখনও মনে হয়নি এটা করছি কেন? তাই বলে এ রকমও ভাবিনি যে, বড় ধরনের কোনো আত্মত্যাগ করছি। সেই সময়ের নির্মম বাস্তবতার তুলনায় এটা খুবই সাধারণ, খুবই ছোট্ট একটা বিষয় ছিল।
আমরা শাল্লায় গিয়ে প্রথমদিনই দশ-বারজন তরুণকে খুঁজে বের করলাম, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়ে বসে আছে। কোনো কাজ নেই। দিনপ্রতি ১০ টাকা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তাদেরকে জরিপের কাজে লাগিয়ে দিলাম। কিছু ছেলেকে কাজে লাগালাম যারা এসএসসি পাস। তাদের পারিশ্রমিক দিনে ৫ টাকা। সে সময় ১০ টাকা বা ৫ টাকা একেবারে কম মজুরি নয়। তারা কাজ করতে থাকল।
জরিপের মাধ্যমে কত বাড়িঘর নষ্ট হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন আগে কী কাজ করতো, এখন কী ধরনের কাজ করতে পারবে, তার সমস্ত তথ্য-উপাত্ত পেয়ে গেলাম। তখন আমরা শাল্লায় ব্র্যাক’র অফিস করিনি। কর্মীদের কাগজ-কলম কিনে দিয়েছি। ৫ টাকা বা ১০ টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে কাজ করিয়েছি। তারা অনেকটা স্বেচ্ছাসেবী মানসিকতা থেকে কাজ করেছেন।
জরিপের তথ্য-উপাত্ত হাতে পাওয়ার পর যোগাযোগ করলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ও অর্থনীতি বিভাগের সঙ্গে। তাদের কয়েকজন শিক্ষক এবং পাস করা ছাত্রছাত্রী জরিপের তথ্য-উপাত্তগুলো বিশ্লেষণের কাজে লেগে গেলেন। তার উপর ভিত্তি করে আমি ব্র্যাক’র প্রথম প্রকল্প প্রস্তাব তৈরি করলাম। এভাবে শাল্লার সবহারানো মানুষদের মধ্যেই সূচিত হলো ব্র্যাক’র কার্যক্রম।

আপনার মতামত দিন



বই থেকে নেয়া অন্যান্য খবর

তোমার আমার ঠিকানা থেকে

‘টেকড়ু’ শুনে পাঞ্জাবিরা হেসেছিল(প্রথম পর্ব)

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

'সামথিং ইজ রং'

৫ জুলাই ২০১৯



বই থেকে নেয়া সর্বাধিক পঠিত