নিরাপদ ট্রেন যাত্রায় বিশ্বাস ভঙ্গ

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম থেকে

এক্সক্লুসিভ ১৪ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১:৪৬

ট্রেনে যাত্রা খুব একটা সুখকর নয়। চট্টগ্রাম-সিলেট ও ঢাকা রেলপথে তূর্ণা নিশীথা, সুবর্ণ এক্সপ্রেস ও সোনার বাংলার কয়েকটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগি ছাড়া আর কোন বগির সিট আরামদায়ক নয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগিগুলোতেও ঠাঁই দাঁড়িয়ে যাতায়াত করে যাত্রীরা। যা ভুক্তভোগী ট্রেন যাত্রী ছাড়া আর কারো বুঝার কথা নয়। এরপরও ট্রেন যাত্রাকে সকল যাত্রার চেয়ে মোটামুটি নিরাপদ ভাবা হয়। এরমধ্যে ভুক্তভোগী যাত্রী যেমন রয়েছেন, তেমনি ট্রেন যাত্রা এখনও হয়নি এমন লোকও রয়েছেন।

ট্রেন যাত্রাকে নিরাপদ ভাবার মূল কারণ হচ্ছে-একমুখো রেলপথ। শিডিউল মোতাবেক ট্রেন চলাচল।
ফলে সড়ক ও জলপথের মতো বাস, মাইক্রো, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরি এবং জলপথে লঞ্চসহ সব রকমের যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনার আশঙ্কা কম। এ পর্যন্ত তেমন একটা ঘটনা ঘটেওনি। ফলে সড়ক ও জলপথের চেয়ে রেলপথে ট্রেনযাত্রাকেই নিরাপদ ভাবে মানুষ। সে হিসেবে ট্রেনে যাত্রীর ভিড়ও নিত্যদিনের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। উৎসব-পার্বনে তো বাঁদুরঝোলা যাত্রীর মাঝে ঢাকা পড়ে ট্রেন। রেলপথে তখন শুধু মানুষের গতিই দেখা যায়। আর স্বাভাবিক সময়ে এমন কোন দিন নেই, যেখানে যাত্রী সংকট। টিকিট সংগ্রহে শোনা যায়, ট্রেনের টিকিট নাই আর নাই। যদিও কালোবাজারে ট্রেনের টিকিটের কোন অভাব নেই।  ট্রেনযাত্রার উপর মানুষের যখন এতই আস্থা। ঠিক সেই সময়ে সে আস্থায় চির ধরাল মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনা। গত মঙ্গলবার ভোর প্রায় ৩টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দবাগ রেল স্টেশনে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর ট্রেন তূর্ণা-নিশীথা সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেন উদয়ন এক্সপ্রেসের একটি বগিতে প্রচন্ডগতিতে আঘাত হানে।

এতে উদয়নের ওই বগিটি কাগজের মতো দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরেকটি বগি। তূর্ণা-নিশীথার ইঞ্জিনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এ ঘটনায় ঝরে পড়ে ৭ জন পুরুষ ৬ জন নারী ও ৩টি শিশুর প্রাণ। আহত হয়ে জীবনের অন্ধকার পথে শতাধিক যাত্রী।

আর এই দুর্ঘটনা সড়ক বা জলপথের মতো অনিরাপদ চলাচলের কারণে হয়নি। এ দুর্ঘটনার জন্য আন্ত:নগর ট্রেন তূর্ণা-নিশীথার চালকের সিগন্যাল অমান্য করাকে দায়ী করা হচ্ছে। এর গভীরে লুকিয়ে আছে আরো লোমহর্ষক তথ্য।
তূর্ণা-নিশীথার চালক তাহের উদ্দিন ও সহকারী চালক অপু দে দুজনই অটো ব্রেক সিস্টেম বা প্যাডেলে ইট চাপা দিয়ে ঘুমাচ্ছিলেন। আর ট্রেন তখন চলছিল নিজস্ব গতিতে। এ অবস্থায় ট্রেন সিগন্যাল মানবে কি করে। ট্রেনের তো আর নিজস্ব চোখ নেই। যে চোখ ট্রেন চালানোর দায়িত্বে ছিল সেটি ছিল ঘুমের ঘোরে। যাকে বলা হয় দায়িত্বহীনতা, অবহেলা।
জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা আন্তঃনগর ট্রেন ঢাকাগামী তূর্ণা-নিশীথা মঙ্গলবার ভোর রাত ২টা ৪৮ মিনিটে শশীদল রেলওয়ে স্টেশন অতিক্রম করে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনের দিকে রওনা করে। মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন মাস্টার স্টেশনে প্রবেশের আগেই আউটারে থামার জন্য লালবাতি জ্বালিয়ে সংকেত দেয় তূর্ণা-নিশীথাকে (ট্রেন নম্বর ৭৪১)।

অপরদিকে, সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেস (ট্রেন নম্বর ৭২৪) কসবা রেলওয়ে স্টেশন ছেড়ে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশনে প্রবেশ পথে স্টেশন মাস্টার তাকে মেইন লাইন ছেড়ে দিয়ে ১ নম্বর লাইনে আসার সংকেত দেন। ওই ট্রেনের ইঞ্জিনসহ ৬টি বগি ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করার পর পেছনের ৩টি বগি মেইন লাইনে থাকতেই তূর্ণা-নিশীথার চালক সিগনাল (সংকেত) অমান্য করে দ্রুত গতিতে এসে ওই ট্রেনের শেষ ৩টি বগির মধ্যেরটিতে আঘাত করে। এতে উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেনের তিনটি বগি দুমড়ে-মুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই ওই বগির ১০ যাত্রীর মৃত্যু হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে নেয়ার পর মারা যায় আরো ৬ জন। আহত হন শতাধিক যাত্রী। কিন্তু ইঞ্জিন ছাড়া তূর্ণা-নিশীথার কোনো ক্ষতি হয়নি। ট্রেনের সব বগি অক্ষত অবস্থায় মেইন লাইনে ছিল।

আর এ দুর্ঘটনার জন্য দুই চালককে সাময়িক বরখাস্ত করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু প্রশ্ন, তাদের স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হলেও কি স্বজনদের ফিরে পাবেন সেই পরিবারগুলো। আহতদের অন্ধকার জীবনে কি পারবেন সেই সোনালী আলো ফিরিয়ে দিতে।

সর্বোপরি, এই দুর্ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে মানুষের নিরাপদ ট্রেন যাত্রা নিয়ে। বিশ্বাস ভেঙেছে-এমন মন্তব্য এখন মানুষের মুখে। বাস ও লঞ্চ যাত্রার মতো ট্রেনযাত্রায়ও আতঙ্ক বেড়েছে মানুষের। যার প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে দুর্ঘটনার দিন থেকেই।

দুর্ঘটনার পর ওইদিন বেলা ১১টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম-সিলেট-ঢাকার ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। এ সময়ে শিডিউল মোতাবেক ট্রেনগুলোর যাত্রীরা চট্টগ্রাম কদমতলী রেলস্টেশনে আটকা পড়ে। কিন্তু দেখা যায়, যাত্রীরা হাতে রেলের টিকিট নিয়েও ফিরে যাচ্ছেন।

এ সময় চাঁদপুরগামী ট্রেনের যাত্রী ব্যাংক কর্মকর্তা আমিরুল ইসলাম বলেন, বাবা-ট্রেন আসলেও আমি যাব না। বাসে যাব। এ কথা বলে স্বপরিবারে রেলস্টেশন ছেড়ে চলে যান তিনি।

কুমিল্লাগামী যাত্রী আকবর হোসেন বলেন, সড়কপথে বাস দুর্ঘটনার ভয়ে ট্রেনে যাতায়াত করি। যদিও ট্রেনযাত্রা খুব একটা সুখকর নয়। তুর্ণা ও সুবর্ণ এক্সপ্রেসের কয়েকটি বগি ছাড়া ট্রেনের সবকটি বগির বসার সিট ভাঙাচোরা। এসি বগিতে পর্যন্ত দাড়িয়ে ঠাসাঠাসি করে যাতায়াত করে যাত্রীরা।

তিনি বলেন, চালক ঘুমানোর কারনে ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। একইভাবে সড়কপথেও দূরপাল্লার বাসগুলোতে চালক ঘুমিয়ে বা বেপরোয়া গতিতে চালানোর কারনে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যান, মাইক্রোসহ বিভিন্নরকম যানবাহন বেপরোয়া গতিতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়।  জলপথেও বৈরী আবহাওয়ার কারণে লঞ্চ চলাচলেও দুর্ঘটনা ঘটে। ঝড়ো হাওয়ায় উল্টে গিয়ে ডুবে যায়, চরে আটকা পড়ে, মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণহানী ঘটে। সে হিসেবে একমুখো রেলপথে দুর্ঘটনা কম, এটাই ছিল স্বস্তি ও বিশ্বাস। এখন সেই বিশ্বাসটুকুও ভেঙেছে ট্রেন। তাহলে কোথায় আর নিরাপদ যাত্রা। ট্রেনে নিরাপদ যাত্রায় মানুষের বিশ্বাস ভাঙায় বুধবার সকাল থেকেও ট্রেনযাত্রী কমছিল বলে জানান চট্টগ্রাম কদমতলী রেলস্টেশনের ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, কসবার দুর্ঘটনায় ট্রেনযাত্রায় মানুষের আতঙ্ক বেড়েছে। ফলে ট্রেনযাত্রী কমেছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সময়ে চট্টগ্রাম ছেড়ে যাওয়া সবকটি ট্রেনে যাত্রীর আসন খালী ছিল বলে জানান তিনি। চট্টগ্রাম মহানগর যাত্রী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক চৌধুরীর ভাষ্য, সড়কপথে বেপরোয়া যানবাহন চলাচলের কারণে গত কয়েকবছরে দেশে বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব দুর্ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু ঘটে। এ নিয়ে নিরাপদ সড়কের দাবিসহ নানা অনিয়ম ও অসঙ্গতির বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা।

যার ফলে, সরকার পুরনো সড়ক পরিবহন আইন সংস্কারের উদ্যোগ নেন। নতুন সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ পাস করেন। যা কার্যকর হয়েছে। এ আইনের ফলে সড়ক থেকে ফিটনেসবিহীন গাড়ি উধাও হয়ে গেছে। যানবাহন চলাচলেও আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই সময়ে ট্রেন দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণেও নতুন আইন করার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।



আপনার মতামত দিন

এক্সক্লুসিভ -এর সর্বাধিক পঠিত



লেবার পার্টি সরকার গঠন করবে

বৈষম্য দেখতে চাই না