আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলার রায় আজ

ফেনী প্রতিনিধি

শেষের পাতা ২৪ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৫:১২

সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার বহুল প্রতীক্ষিত রায় আজ। বৃহস্পতিবার সকালে ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশীদ এ রায় প্রদান করবেন। রায় প্রদানের সময় সকল আসামি আদালতে উপস্থিত থাকবেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হাফেজ আহমেদ। রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হাফেজ আহমেদ জানান, নুসরাত হত্যা মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৪ (১) ও ৩০ ধারায় রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমান করেছে। রাষ্ট্রপক্ষ আশা করছে রায়ে সকল আসামী সর্বোচ্চ সাজা পাবে। আসামিপক্ষের আইনজীবী এম. শাহজাহান সাজু বলেন, মাত্র ৬১ কার্যদিবসে বহুল আলোচিত এ হত্যা মামলার নিষ্পত্তি হতে চলেছে। যা দেশের ইতিহাসে নজির বিহীন। নুসরাতের মা শিরীনা আক্তার বলেন, আমি আমার কলিজার টুকরা মেয়ে হত্যার দৃষ্টান্তমূক শাস্তি চাই।
এমন শাস্তি হোক, যেন পৃথিবীর অন্য কোথাও কোনো মায়ের বুক এভাবে খালি না হয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমার একমাত্র মেয়েকে ঘাতকরা যেভাবে হাত-পা বেঁধে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, তেমন কঠিন সাজা যেন দেওয়া হয় অভিযুক্ত প্রত্যেক আসামিকে।’ আসামিপক্ষ থেকে হুমকি-ধামকির ব্যাপারে নুসরাতের মা বলেন, ‘আসামিরা হুমকি দিচ্ছে, তারা নুসরাতের বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে ফেলবে, ঘরে বাতি দেওয়ার মত কোনো লোক থাকবে না।’ নিজেদের নিরাপত্তার ব্যাপারে শিরীন আক্তার বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ আমাদের পাহারা দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে, রায় কার্যকর হওয়া পর্যন্ত যেন এ নিরাপত্তা থাকে।’

সোনাগাজী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মঈদ উদ্দিন আহমেদ জানান, ঘটনার পর থেকে নুসরাতের বাড়িতে পুলিশ পাহাড়া রয়েছে। রায়কে কেন্দ্র করে বাড়িতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরো জোরদার করা হয়েছে। সাদা পোষাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও পরিবারের প্রতি নজরদারি করছে। নুসরাত হত্যা মামলায় অভিযোগপত্রের আসামিরা হলেন- সোনাগাজীর চরকৃষ্ণজয়ের কলিম উল্যাহ সওদাগর বাড়ীর কলিম উল্যার ছেলে এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মো. আহসান উল্যাহর ছেলে ও মাদ্রাসা ছাত্রদলের কথিত সভাপতি নুর উদ্দিন (২০), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূইয়া বাজারে এলাকার নবাব আলী, টেন্ডল বাড়ীর মো. আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ও মাদ্রাসা ছাত্রলীগের কথিক সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক (সদ্য সাবেক) ও চরগণেশ গ্রামের পান্ডব বাড়ীর আহসান উল্যাহ ছেলে মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ আল কাউন্সিলর (৫০), উপজেলার পূর্ব তুলাতলী গ্রামের খায়েজ আহাম্মদ মোল্লা বাড়ীর আবুল বাশারের সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের সৈয়দ সালেহ আহাম্মদের বাড়ীর রহমত উল্যাহ ছেলে জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ (১৯), সফরপুর গ্রামের খান বাড়ীর আবুল কাশেমের ছেলে হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ও উত্তর চারচান্দিয়া গ্রামের সওদাগর বাড়ীর ইবাদুল হকের ছেলে আবছার উদ্দিন (৩৩), চরগণেশ গ্রামের আজিজ বিডিআর বাড়ীর আব্দুল আজিজের (পালক বাবা) মেয়ে কামরুন নাহার মনি (১৯), লক্ষীপুর গ্রামের সফর আলী সর্দার বাড়ীর শহিদুল ইসলামের মেয়ে ও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ-উদ-দৌলার ভাগ্নি উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা (১৯), পূর্ব চরচান্দিয়া গ্রামের সোজা মিয়া চৌকিদার বাড়ির আব্দুল শুক্কুরের ছেলে আব্দুর রহিম শরীফ (২০), চরগণেশ গ্রামের হাজী ইমান আলীর বাড়ী ওরফে মালশা বাড়ীর জামাল উদ্দিন জামালের ছেলে ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), চরগণেশ গ্রামের এনামুল হকের নতুন বাড়ির এনামুল হক ওরফে মফিজুল হকের ছেলে ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), তুলাতলী গ্রামের আলী জমাদ্দার বাড়ীর সফি উল্যাহ ছেলে মোহাম্মদ শামীম (২০), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চরচান্দিয়া গ্রামের ভূইয়া বাজার এলাকার কোরবান আলী বাড়ীর কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন (৫৫), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের বোর্ড অফিস সংলগ্ন রুহুল আমিনের নতুন বাড়ীর মো. রুহুল আমিনের ছেলে মহিউদ্দিন শাকিল (২০)।

মামলার নথির বরাত দিয়ে বাদীপক্ষের আইনজীবী এম শাহজাহান সাজু জানান, চলতি বছরের ২৭শে মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে যৌন নিপীড়নের দায়ে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর জের ধরে গত ৬ই এপ্রিল ওই মাদরাসা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে অধ্যক্ষের সহযোগীরা নুসরাতের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। টানা পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত ১০ই এপ্রিল মারা যান নুসরাত জাহান রাফি। গত ৭ই এপ্রিল দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের কাছে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি (ডায়িং ডিক্লেরেশন) দেয়।

গত ৮ই এপ্রিল নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৪/৫ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন। দুদিন পর গত ১০ই এপ্রিল মামলাটি সোনাগাজী মডেল থানা থেকে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তে স্থানান্তর করা হয়। ঘটনার পর সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশ ও দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআই বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মামলায় এজাহার নামীয় ৮ জনসহ ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে। পিবিআই মামলা তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার ৩৩ কার্যদিবস শেষে (মোট ৫০ দিনের মধ্যে) গত ২৯শে মে ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম (সিনিয়ার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট) (আমলী আদালত সোনাগাজী) মো. জাকির হোসেনের আদালতে মোট ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম। ৮০৮ পৃষ্ঠার ওই অভিযোগপত্রে ‘হুকুমদাতা’ হিসেবে সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রী) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়। অভিযুক্ত ১৬ জন আসামীর মধ্যে ১২ জন আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দিয়েছিলো।

অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৯২ জনকে। এদের মধ্যে কার্যবিধির ১৬১ ধারায় ৬৯ জনকে সাক্ষী করা হয়। ৭ জন সাক্ষী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিমূলক স্বাক্ষ্য দিয়েছিলেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রের সারমর্ম বিচারকের কাছে তুলে ধরেন। একই সাথে হত্যার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, হত্যার সময়কালীন ঘটনার ডিজিটাল স্কেচও আদালতে তুলে ধরেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পিবিআই অভিযোগপত্রে ১৬ আসামির সবার সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছিল।

গত ৩০শে মে সিনিয়ার জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। গত ১০ই জুন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করে চার্জগঠনের জন্য ২০শে জুন ধার্য্য করে। অভিযোগপত্রে নাম না থাকায় ওই সময় গ্রেপ্তার পাঁচ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

নুসরাত হত্যা মামলার ৭২ দিনের মধ্যে গত ২০শে জুন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (চার্জগঠন) করে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২৭শে জুন নির্ধারণ করে। গত ২৭শে জুন মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্য নেয়ার মধ্যে দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর টানা ৩৭ কর্মদিবসে নুসরাত হত্যা মামলায় ৯২ সাক্ষীর মধ্যে আদালতে বাদীসহ ৮৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করে। গত ২৭শে আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হলে গত ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষ ও বাদী পক্ষের যুক্তি তর্ক শেষে গত ৩০শে সেপ্টেম্বর বিচারক রায় ঘোষণার জন্য ২৪শে অক্টোবর দিন ধার্য করে। আইনজীবী শাহাজান সাজু আরো জানান, হত্যা মামলার আলামত হিসেবে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মামলার কোন ডকুমেন্ট প্রজেক্টরের মাধ্যমে আদালতে (গত ২৭ আগস্ট) উপস্থাপন করা হয়েছে। যা উপস্থিত সকল আইনজীবী, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকরা শুনতে পায়। আদালতে প্রদর্শিত অডিও-ভিডিওর মাধ্যমে আসামীদের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা ও নুসরাতের জবানবন্দি সকলের সামনে উম্মোচিত হয়। যা এ মামলার মুল দলিল হিসেবে নথিতে রয়েছিল। কারাবন্দি অবস্থায় নুসরাত জাহান হত্যা মামলার অন্যতম আসামী কামরুন নাহার মনি গত ২১শে সেপ্টেম্বর হাসপাতালে কন্যা সন্তান প্রসব করেন। গত ১৫ই এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাথে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করেন নুসরাতের বাবা একেএম মুসা, মা শিরীনা আক্তার, বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ও ছোট ভাই রাশেদুল হাসান রায়হান। ওই সময় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের হাতে তাৎক্ষনিক এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে চাকরির নিয়োগপত্রও তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। গত ৬ই মে নোমান এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকে যোগদান করেন।

আপনার মতামত দিন

শেষের পাতা অন্যান্য খবর

শূন্য শূন্য লাগে উহানে

২৮ জানুয়ারি ২০২০

করোনা ভাইরাস নিয়ে বেইজিংয়ের বার্তা

১৪ দিনের মধ্যে কাউকে ফেরানো যাবে না

২৮ জানুয়ারি ২০২০

‘বাংলাদেশ ইউক্রেন নয়’

২৭ জানুয়ারি ২০২০





শেষের পাতা সর্বাধিক পঠিত