প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে দুই ধাপ পেছালো বাংলাদেশ

দেশ বিদেশ

অর্থনৈতিক রিপোর্টার | ১০ অক্টোবর ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:০১
বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে আবারো দুই ধাপ পেছালো বাংলাদেশ। পাশাপাশি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ব্যবসা প্রসারে নতুন ঝুঁকিও সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বছরের প্রতিবেদনে ১৪১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৫তম। গতবার ১৪০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল ১০৩তম। তার আগে ২০১৭ সালে ১৩৫ দেশের মধ্যে ছিল ১০২তম অবস্থানে। অন্যদিকে, সক্ষমতা সূচকে এবার যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে শীর্ষে এসেছে সিঙ্গাপুর।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) সারা বিশ্বে একযোগে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বা গ্লোবাল কম্পিটিটিভনেস রিপোর্ট (জিসিআর) প্রকাশ করেছে। গতকাল ডব্লিউইএফের পক্ষে বাংলাদেশে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এ উপলক্ষে রাজধানীতে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করেন, সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, মূলত একটি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিবেশ কতটা সহায়ক এবং প্রতিযোগিতায় সক্ষম, সেটাই এই সূচক দিয়ে বোঝানো হয়। একটি দেশের অবস্থান বিচারের জন্য প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, পণ্য বাজার, শ্রম বাজার, আর্থিক ব্যবস্থা, বাজারের আকার, বাজারের গতিশীলতা, উদ্ভাবনী সক্ষমতা- এই ১২টি মানদণ্ড ব্যবহার করেছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। এসব মানদণ্ডের ভিত্তিতে ১০০ ভিত্তিক সূচকে সব মিলিয়ে এবার বাংলাদেশের স্কোর হয়েছে ৫২, যা গতবছরের স্কোরের চেয়ে ০.১ কম।
২০১৮ সালে বিভিন্ন দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য পরিবেশ কতটা প্রতিযোগিতা সক্ষম ছিল, তা এই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদন তৈরিতে ১২টি সূচক বা মানদণ্ড ব্যবহার করা হয়েছে। এসব সূচকের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০টিতেই পিছিয়েছে। মাত্র দুটিতে এগিয়েছে। যেসব সূচকে বাংলাদেশ পিছিয়েছে, সেগুলো হলো সামষ্টিক অর্থনীতি, শ্রমবাজার, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, অবকাঠামো, দক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায় বৈচিত্র্য, উদ্ভাবন এবং বাজারের আকার। অন্যদিকে, এগিয়েছে মাত্র পণ্যবাজার ও স্বাস্থ্যসূচকে। অদক্ষ জনশক্তি, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারের অভাব, ব্যাপকহারে দুর্নীতির প্রসার এবং আর্থিক খাতের অস্থিতিশীলতায় সূচক কমার মূল কারণ বলে মনে করে সিপিডি।
এদিকে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচক প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে গিয়ে সিপিডি প্রতিবারের মতো এবারও বাংলাদেশ ব্যবসায় পরিবেশ সমীক্ষা ২০১৯ করেছে। সেটিও প্রকাশ করা হয়। এই সমীক্ষা ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের ৭৭টি ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের ওপর জরিপ করা হয়। সুশাসন সম্পর্কে জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, ৭৮ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, সরকারি ঠিকাদারি কাজ পেতে ঘুষ দিতে হয়েছে। ৭৬ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনায় ঘুষ দিয়েছেন। ৭৪ শতাংশই কর পরিশোধের সময় ঘুষ দিয়েছেন।
ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম ২০০১ সাল থেকে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। সিপিডি বাংলাদেশে বৈশ্বিক এই ফোরামের সহযোগী হিসেবে কাজ করে।
প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় বাংলাদেশ চতুর্মুখী সমস্যায় আটকে গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর্থিক খাতের অস্থিতিশীলতা। এছাড়া দুর্নীতির প্রসার আমাদের জাতীয় জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে ব্যাহত করছে। দুর্নীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের আস্থা কমেছে। ব্যবসায়ীরা এখন নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না। দেশের বেকারত্ব সমস্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে না পারলে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন পূরণ নাও হতে পারে। এসব সমস্যা সমাধানে নীতিগত অনেক সংস্কারের প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, একদিকে, অবকাঠামো তৈরি করতে হচ্ছে, আবার দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের কথাও চিন্তা করতে হচ্ছে। এ ছাড়া সুশাসনের অভাবও আছে। তিনি বলেন, বড় ধরনের সংস্কার করা না হলে উন্নত দেশ বা উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া কঠিন হবে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বৈশ্বিক উন্নয়নের সঙ্গে তাল মিলাতে হলে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সে অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। তিনি আরো জানান, অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি না হলে মনোপলি বা একচেটিয়া ধারা অব্যাহত থাকে। এর মাধ্যমে ব্যবসা পুঞ্জীভূত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। এই জায়গাতে গুরুত্ব দিয়ে শক্তিশালী মনিটরিংয়ের আহ্বান জানান ফাহমিদা খাতুন।
চলমান শুদ্ধি অভিযান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ফাহমিদা খাতুন জানান, যেকোনো ধরনের দুর্নীতি বিরোধী অভিযানে আমরা সাধুবাদ জানাই। কারণ দুর্নীতি কারণে এক শ্রেণির মানুষ বেশি উপকৃত হয় এবং কিছু শ্রেণির মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মাধ্যমে বৈষম্য বৃদ্ধি হয়। শুধু তাই নয় জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে দুর্নীতি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জাতীয় স্বার্থ সাপেক্ষে এরকম অভিযান উন্নত দেশগুলোর মতো চলমান প্রক্রিয়া হওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
ব্যাংক ও পুঁজিবাজারে সুশাসনের অভাব: দেশের ব্যবসা দিন দিন পুঞ্জীভূত হয়ে যাচ্ছে। শতকরা ৭৫ জন ব্যবসায়ী মনে করেন দেশের বড় ব্যবসায়ীরাই আর্থিক খাতকে নিয়ন্ত্রণ করছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এছাড়া ব্যাংক ও পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে করপোরেট গভর্নেন্সের বা সুশাসনের অভাব রয়েছে বলে মনে করছে সিপিডি।
ড. মোয়াজ্জেম বলেন, দুর্নীতির কারণে দেশের ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি বাড়ছে ব্যবসায়ীক ঝুঁকিও। বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বেকারত্ব বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ঝুঁকি আরো বাড়ছে। সঠিকভাবে কাজ করছে না ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল। শতকরা ৭৮ জন ব্যবসায়ী মনে করেন, ব্যাংকিং সেক্টরের সমস্যা ২০১৯ সালে আর্থিক খাতে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করবে। এছাড়া দেশের প্রকল্পভিত্তিক তথ্য আরো সহজ করা দরকার বলে মনে করেন তিনি।

ড. ফাহমিদা বলেন, বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করছে দেয়া উচিত। তা না-হলে আর্থিক খাত আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হতে হলে বড় ধরনের সংস্কারের প্রয়োজন।
সিপিডির গবেষণায় জ্বালানীর মূল্য বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্প দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়াকে ব্যবসা প্রসারে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। বৈশ্বিক বাজারে সমানতালে সামনের এগোতে না পারায়, বাংলাদেশের র‌্যাংকিং কমেছে বলে জানায় সিপিডি। এ সময় আগামী ২০৩১ বা ৪১ সাল পর্যন্ত টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যবসার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কিছু সমাধানও তুলে ধরেন সিপিডির গবেষকরা। এজন্য ব্যবসা ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে বড় ধরণের সংস্কারের পরামর্শ দেয় সিপিডি।

বিশ্বে প্রতিযোগিতা সক্ষমতার দিক দিয়ে এবারের সূচকের শীর্ষে উঠে এসেছে সিঙ্গাপুর; এশিয়ার এই দেশটির স্কোর ৮৪.৮। এরপরই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, হংকং, নেদারল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, জাপান, জার্মানি, সুইডেন, যুক্তরাজ্য ও ডেনমার্ক। এই ১০টি দেশই গতবারের সূচকে শীর্ষ দশে ছিল, এবার শুধু অবস্থানের হেরফের হয়েছে। এই সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে ভারত। ৬১.৪ স্কোর নিয়ে ভারত আছে সূচকের ৬৮ নম্বরে। তবে গতবারের চেয়ে ১০ ধাপ অবনমন ঘটেছে দেশটির। শ্রীলঙ্কা ৫৭.১ স্কোর নিয়ে সূচকের ৮৪তম, নেপাল ৫১.৬ স্কোর নিয়ে সূচকের ১০৮তম এবং ৫১.৪ স্কোর নিয়ে পাকিস্তান সূচকের ১১০ নম্বরে রয়েছে।


 


এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বোর্ডের সঙ্গে আলোচনায় বসতে মিরপুরে যাচ্ছে ক্রিকেটাররা

এমপিও ভুক্ত হলো যেসব প্রতিষ্ঠান

অপেক্ষায় পাপন, ক্রিকেটাররা গুলশানে

নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনসহ ২২ জনের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

ক্রিকেটারদের অপেক্ষায় পাপন

বৃটেনে লরির ভেতর ৩৯ মৃতদেহ

তাহিরপুরে শিশু ধর্ষণের শিকার, ধর্ষক আটক

ফিটনেস ক্যাম্পে যোগ দেয়নি ক্রিকেটাররা

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বিসিবি সভাপতি পাপন

২৭৩০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত

আলোচিত নুসরাত হত্যা মামলার রায় আগামীকাল

সমালোচনা সত্ত্বেও পাকিস্তানে ৮ অর্ডিন্যান্স অনুমোদন

নুরের ফেসবুক আইডি হ্যাকড, অভিযোগ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে

প্রাথমিকের শিক্ষকদের মহাসমাবেশে পুলিশের বাধা

প্রিন্স অব কলকাতা থেকে ভারতীয় ক্রিকেটের রাজা

কাওসারকে স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি পদ থেকে অব্যাহতি