‘বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই দলীয় নেতাকর্মীরা ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছে’

অনলাইন

কাজল ঘোষ | ৯ অক্টোবর ২০১৯, বুধবার, ১:২৩ | সর্বশেষ আপডেট: ৯:১৩
বুয়েটের ঘটনায় একজন ছাত্রকেই হত্যা করা হয়নি আমার বুয়েটকেও হত্যা করা হয়েছে। বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন সম্পূর্ণরূপে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে। শুধু দল থেকে বহিষ্কারের নামে আইওয়াশ প্রদর্শনে কাজ হবে না। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণেই দলীয় নেতাকর্মীরা আজ ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছে। ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ড  আর ক্যাসিনোকাণ্ডে সরকারের ইমেজ ক্ষুণœ হয়েছে। বুয়েট পরিস্থিতি নিয়ে  বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, দেশের খ্যাতনামা স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে মনে করি, বুয়েটের ঘটনা আমাদের জন্য একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এ ঘটনার মাধ্যমে একজন ছাত্রকে হত্যা করা হয়নি, আমার বুয়েটকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ করে বেশকিছু বিষয় লক্ষ্য করার আছে।
যদি মাঝরাতে কোনো একটি কক্ষে কাউকে টর্চার করা হয়, তাহলে তার চিৎকারে আশেপাশের রুম থেকে অন্য শিক্ষার্থীদের ভিড় করার কথা। এখানে এমনটি ঘটেনি। অর্থাৎ এখানে নিয়মিত এ ধরনের টর্চার চলতো। এটা সকলেরই জানা। আর এ ধরনের টর্চার সেল  বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা কর্তৃপক্ষ অবগত, না হলে দিনের পর দিন কীভাবে  বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কক্ষ

টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হলো?
এমন নয়, এটি  বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের ক্ষেত্রেই ঘটেছে। অন্যান্য হলেও একই রকমের টর্চার সেল আছে বলে শোনা যাচ্ছে যা বুয়েটের মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের মর্যাদাকে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, এ ধরনের ঘটনা জেনেও বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন ও কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। কারণ, বুয়েট ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় বা অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। এখানকার সকল শিক্ষার্থীর ডাটা অনলাইনেই রয়েছে। আর যারা দিনের পর দিন এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে তারা কেউ বাইরের নন, এরা ভেতরের। তাহলে এদের বিষয়ে সব তথ্য জেনেও বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কেন ব্যবস্থা নেয়নি? বুয়েটে হল প্রভোস্ট, প্রক্টোরিয়াল টিম ছাড়াও রয়েছে ডিএসডব্লিউ অর্থাৎ ডিরেক্টর অব স্টুডেন্টস ওয়েলফেয়ার যাদের কাজ কেবল ছাত্রদের বিষয়াদি তদারক করা, খোঁজ রাখা কোথায় কি হচ্ছে? অর্থাৎ এ ঘটনায় আমি মনে করি তাদেরও অবহেলা রয়েছে। এদেরকেও আইনের আওতায় আনা উচিত।

ব্যর্থতা কি কেবলই  বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নাকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও?
প্রথমে আসি,  বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে। এটা অন্য   বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো না। এখানে সব সময় ভিন্নমতের সহঅবস্থান ছিল ঐতিহ্য। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সময় নির্মল সেন, মণি সিং, ফরহাদ ভাইয়ের মতো বড় বড় ছাত্র নেতারা আমার কক্ষে এসে লুকিয়ে থাকতেন। তারা বিছানায় পর্যন্ত থাকতেন না। নিচে শুয়ে পড়তেন। আমাদের সময় ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়নসহ সকলেই একসঙ্গে রাজনীতি করেছি। কিন্তু পরিস্থিতি এমন হলো কেন? এটা তো রাতারাতি একদিনে হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সবকিছুকে রাজনীতিকরণ। গত কয়েকজন ভিসির পদায়ন হয়েছে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে, যা বুয়েটের ইতিহাসের পরিপন্থি। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করেছে। ফলে ছাত্রলীগের সব ধরনের অন্যায় কাজে তারা নতজানু হয়ে সমর্থন দিয়েছে। আর এভাবেই প্রশাসনের ছত্রচ্ছায়ায় ছাত্র রাজনীতির নামে একটি গ্রুপ বুয়েটের ইমেজ পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।

মিডিয়ায় খবর এসেছে পুলিশ এসেও ফিরে গিয়েছে?
ঘটনার রাতে খবর পেয়ে পুলিশও এসেছিল। কিন্তু হল গেটে থেকেই তারা ফিরে যায়। আমরা জানতে পেরেছি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকের নির্দেশে তারা ফিরে যায়। যে দেশে সবই রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে নিয়ন্ত্রিত সেদেশে এমন হওয়াই স্বাভাবিক। ক’দিন আগেই ক্যাসিনোকা-ে রাজধানীর তিন থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হলো। কিন্তু তাদের প্রত্যাহার করে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। অর্থাৎ তাদের আয় একটু কমিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাদের কৃত অপরাধের জন্য আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হয়নি। যতদিন পর্যন্ত অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করা না হবে, ততদিন এ ধরনের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। বুয়েটের হল গেট থেকে পুলিশ ফিরে যাওয়াটাও এসবেরই ধারাবাহিকতা। এ দেশে অপরাধ করে কোনো ধরনের শাস্তি হয় না।

তাহলে আইনহীনতার সংস্কৃতিই কি আমাদের নিয়তি?
লক্ষ্য করুন, সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় দলের সভানেত্রী ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বহিষ্কার করেছেন। কিন্তু এরপর কি হওয়া উচিত ছিল? তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে বিচারের মুখোমুখি করা। কিন্তু তা তো হয়নি। এখন দলীয় লোকদের যদি আইনের আওতায় এনে সাজা নিশ্চিত না করা হয় এবং দল থেকে বহিষ্কার করার নামে লোক দেখানো আইওয়াশ করা হয় তাহলে বিচারহীনতার বলে দলের লোকেরাই ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হবে। বুয়েটের ক্ষেত্রে এমনটিই ঘটেছে। তারা দেখেছে, অপরাধ করে কোনোরকম শাস্তি পেতে হয় না।

এ অবস্থার পরিবর্তনে করণীয় কি?
একটাই পথ। কঠোর থেকে কঠোরতর আইনের শাসন বাস্তবায়ন করা। বুয়েটের ঘটনায় সমস্যা কোথায়- পুলিশের উচিত এই তথ্যগুলো পরিষ্কার করে সকলকে বলা। যদি সত্যিকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হয় তাহলে আমি মনে করি, যারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় জড়িত তাদের সবধরনের টেলিফোন কনভারসেশন রেকর্ড করে পরীক্ষা করা। যদিও এ ঘটনার পর জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকার বলেছে, দ্রুত বিচার আইনে জড়িতদের সাজা নিশ্চিত করা হবে। এখন দেখার বিষয় কি হচ্ছে? আবার ভয়ও পাচ্ছি, প্রধানমন্ত্রীকে হত্যাচেষ্টার বিচার যদি ১৪ বছরেও শেষ না হয়, তাহলে আবরার হত্যার বিচার কত বছরে হয় সেটাই দেখার বিষয়।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

এন এম ইলিয়াস

২০১৯-১০-০৯ ১১:০৫:০০

আমি জনাব মোবাশ্বের সাহেবেরসাথে একমত। যে দেশে রাস্ট্র দূরনিতী এবং প্রতিহিংসা কে patronise করে সেই দেশে এর থেকে ভাল কিছু আশাকরা যায়না।

মাসুম

২০১৯-১০-০৯ ০৮:০২:০৪

আপনার সাথে পুরপুরি একমত । আওয়ামী লীগ সমর্থনকরী অধিকাংশ বুদ্বিজীবিই সরকারের কৃপা পাবার জন্য সকল নীতি , নৈতিকতা , বিবেকবোধ বিসর্জন দেন । আপনি তার বেতিক্রম ।

Shah Alam Bhuiyan fr

২০১৯-১০-০৯ ০৫:০৯:১৪

Mr Mobassar vai so far my knowledge u r the supporter of Awami Leage. I m surprised how u comments this??? We r lost everything. No law, no morality, nothing for the nation r existing. But how u such true comments. I m again realy surprised!!!

Raju

২০১৯-১০-০৯ ১৫:৫৬:৪৩

নষ্ট রাজনীতি,দলীয় প্রশাসন,ভোটার বিহীন নির্বাচন/সর্বাত্নক কারচুপি ইত্যাদি আজ "বাংলাদেশ" কে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিনত করেছে ।

আপনার মতামত দিন

খুলনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সেক্রেটারি গ্রেপ্তার

নজিরবিহীন ধর্মঘটে ক্রিকেটাররা

শামীম-খালেদের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

প্রেস কর্মচারী থেকে ক্যাসিনো মালিক

যে কারণে নিরাপত্তারক্ষীর নামেও অ্যাকাউন্ট

থমথমে ভোলা আল্টিমেটাম

ওমর ফারুক ও তার স্ত্রী সন্তানের ব্যাংক হিসাব জব্দ

সিলেটে থানা হাজতে কলেজপড়ুয়া ৩ ভাইকে নির্যাতন, তোলপাড়

বছরে ৮৭ হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য হিসেবে জমা হয়

অনুমতি না পাওয়ায় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশ স্থগিত

আস্থাহীনতায় কর্মসংস্থান কমছে বীমাখাতে

‘খালেদার সঙ্গে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সাক্ষাৎ নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’

আত্মরক্ষার্থে ভোলায় গুলি চালিয়েছে পুলিশ : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মেয়র আরিফ সদস্য সচিব বহাল

১৮ দিনে ১০০ কোটি ডলার রেমিটেন্স

পাঁচ বছরের কারাদণ্ড কারাগারে হারুন