সরকারি নির্দেশে চীনজুড়ে চলছে ইসলাম দমন

দেশ বিদেশ

মানবজমিন ডেস্ক | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:২১
চীনে উইঘুর মুসলিমদের নির্যাতনের খবর বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচিত। বন্দিশিবিরে আটক করে তাদের ওপর চালানো নির্যাতনের খবর ওঠে এসেছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। বিবিসি’র এক সামপ্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, উইঘুর মুসলিম শিশুদের তাদের পরিবার থেকে আলাদা করে ফেলা হচ্ছে। শত শত শিবিরে বন্দি করে রাখা হয়েছে প্রাপ্তবয়স্কদের। তাদের ধর্ম পালন করতে দেয়া হচ্ছে না। শিশুদের শেখানো হচ্ছে না ইসলামী বা তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতি। শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে পুরো একটা প্রজন্মকে। কিন্তু চীন সরকারের এই ইসলাম দমন কেবল উইঘুর মুসলিমদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
পুরো চীনজুড়েই এমন অভিযান চলছে। সরকারি এক নির্দেশনা মেনে এসব অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রভাবশালী মার্কিন গণমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এমন তথ্য ওঠে এসেছে।
বন্ধ হচ্ছে মসজিদ, ভেঙে ফেলা
হচ্ছে গম্বুজ ও মিনার
পত্রিকাটি জানায়, চীনের উত্তর-পশ্চিমাংশে ইসলামের প্রতি বিশ্বাসের সবচেয়ে সপষ্ট নিদর্শন ও চর্চাগুলো মুছে দেয়া হচ্ছে। ‘ছোট মক্কা’ নামে পরিচিত শহর লিনশিয়ার এক ছোট গ্রামের মসজিদের গম্বুজ ও মিনার ভেঙে দেয়া হয়েছে। একইরকম ঘটনা ঘটেছে ইনার মঙ্গোলিয়া, হেনান ও নিংশিয়া শহরেও। চীনে সংখ্যালঘু মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত হুই অঞ্চলও এমন ভাঙন থেকে রেহাই পায়নি। ইউনান প্রদেশের দক্ষিণাংশে তিনটি মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বেইজিং থেকে নিংশিয়া পর্যন্ত সকল স্থানে প্রকাশ্যে আরবি ভাষার লৈখিক ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
এসব কার্যক্রম চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ইসলাম বিরোধিতা, ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। যদিও এর আগে বহু দশক ধরে দেশটিতে মধ্যম পরিসরে ইসলামের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে দেয়া হয়েছে। শিনজিয়াংয়ে উইঘুরদের দিয়ে শুরু হওয়া মুসলিম বিরোধী অভিযান এখন দেশব্যাপী শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টির ভয় থেকে এমনটা হচ্ছে। তাদের আশঙ্কা মুসলিমদের ধর্মীয় বিশ্বাস চরমপন্থিতায় রূপ নিতে পারে ও তাদের শাসনের বিরোধিতা করতে পারে। আর চীনজুড়ে ইসলামী প্রথা ও চর্চার বিরুদ্ধে আরোপ করা হচ্ছে নতুন সব নিষেধাজ্ঞা। এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে পার্টির উচ্চ পর্যায়ের এক গোপন নির্দেশনা মেনে। ওই নির্দেশনার অংশবিশেষ দেখেছে নিউ ইয়র্ক টাইমস।
উইঘুরদের পর শিকার হচ্ছেন হুই মুসলিমরা
কমিউনিস্ট পার্টির এমন নির্দেশনা থেকে এটা ফের প্রতীয়মান হয় যে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কট্টরপন্থি নীতিমালার অনুসারী। তিনি সমাজের সকল স্তরে কমিউনিস্ট পার্টির আদর্শ প্রতিষ্ঠানকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার এই নীতিমালার শিকার হচ্ছে উইঘুর, হুই ও অন্যান্য মুসলিম গোষ্ঠীগুলো। উইঘুরদের চেয়ে হুই মুসলিমরা চীনা সমাজের সঙ্গে আরো অন্তরঙ্গভাবে মিশে গেছে। তা সত্ত্বেও তারা বাদ পড়ছে না।
ম্যারিল্যান্ডের ফ্রস্টবার্গত স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন হুই মুসলিম অধ্যাপক হাইয়ান মা। তিনি বলেন, এই দমন অভিযান হঠাৎ শুরু হয়নি। এর পেছনে কাজ করছে, ইসলামের প্রতি চীনের দীর্ঘ দিনের বিদ্বেষ। সামপ্রতিক এক নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, চীন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইসলামবিরোধী আদর্শের শক্তি ও ইসলাম বিদ্বেষের মদতদাতায় পরিণত হয়েছে। এতে মুসলিমদের ওপর নির্যাতনে দেশটির জনগণের সমর্থন পাচ্ছে চীনা সরকার।
বর্তমানে চীনজুড়ে যেসব দমন অভিযান চলছে সেগুলোর কোনোটিই শিনজিয়াংয়ের বন্দি শিবিরের নির্মমতার সমতুল্য নয়। কিন্তু ইতিমধ্যে তা হুই মুসলিমদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখানে উল্লেখ্য, চীনে হুই মুসলিমদের সংখ্যা ১ কোটির বেশি। বেইজিংয়ের বাসিন্দা ও হুই মুসলিম কবি সুই হাওশিন বলেন, আমাদের ফের ‘ব্যাকট্র্যাকিং’ করা হচ্ছে। উইঘুর সমাজের ওপর চালানো নিপীড়ন পুরো চীনে ছড়িয়ে পড়েছে। অদূর ভবিষ্যতে মুসলিম ছাড়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও এই পদ্ধতির শিকার হবে। সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইসলামের চীনা সংস্করণ
চীনে ইসলাম অনুসারীদের বসবাস কয়েক শতক আগে থেকে। বর্তমানে সেখানে ২ কোটি ৩০ লাখের মতো মুসলিম রয়েছে। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার দেশে এ সংখ্যা নগণ্য। এই সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি হুই ও উইঘুররা। উইঘুরদের বেশির ভাগই শিনঝিয়াংয়ে বাস করলেও হুইরা পুরো চীনজুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে। বর্তমানে এসব মুসলিম যেসব নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন সেগুলোর শুরু হয় ২০১৫ সাল থেকেই। শি তখন প্রথমবারের মতো ইসলামের ‘সিনিকাইজেশন’-এর ইস্যু তোলেন। প্রসঙ্গত, সিনিকাইজেশন হচ্ছে চীনা সংস্কৃতির বাইরের যেকোনো সংস্কৃতি বা প্রথাকে চীনা সংস্কৃতির প্রভাব বলয়ের মধ্যে নিয়ে আসা। অন্যভাবে, ভিনদেশী সংস্কৃতিগুলোর চীনা সংস্করণ করা। ২০১৫ সালে শি বলেছিলেন, সকল ধর্মকে অবশ্যই চীনের সংস্কৃতি ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। গত বছর শি সরকার একটি গোপন নির্দেশনা দেয় স্থানীয় কর্মকর্তাদের। নির্দেশনায় বলা হয়, ধর্ম নিরপেক্ষ জীবনযাপন ও রাষ্ট্রের কার্যক্রম থেকে ইসলাম যেন দূরে থাকে। চীন সরকারের নীতিমালার সমালোচকরা নিউ ইয়র্ক টাইমসকে ওই নির্দেশনার সারাংশ পাঠিয়েছে। নির্দেশনাটির শিরোনাম দেয়া হয়েছে রিইনফোর্সিং অ্যান্ড ইমপ্রুভিং ইসলাম ওয়ার্ক ইন দ্য নিউ সিচুয়েশন। এটি সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়নি। গত বছর চীনের স্টেট কাউন্সিল, মন্ত্রিপরিষদ নির্দেশনাটির অনুমোদন দেয়। আগামী ২০ বছর নির্দেশনাটি গোপন রাখার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গোপন নির্দেশনায় কী আছে?
সরকারি নির্দেশনায় ইসলামী স্থান, ফ্যাশন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আরবি ব্যবহারের প্রতি সতর্ক করা হয়েছে। সৌদি আরবের প্রভাবমুক্ত করতে এই সতর্কতা জারি হয়েছে। কেননা, ইসলামের জন্মভূমি হিসেবে পরিচিত দেশটি। আরবি ঘরানার গম্বুজ ও মিনার ভেঙে ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া, নির্দেশনায় ইসলামী আর্থিক ব্যবস্থাও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মসজিদ বা অন্যান্য বেসরকারি ইসলামী সংগঠনগুলোয় স্কুল ছুটির সময়ের পর অনুষ্ঠান আয়োজন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। চীনের আরবিভাষী স্কুলগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের বাইরে পড়াশোনা করতে পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নিংশিয়ায় আরবি লিপির প্রকাশ্য প্রদর্শন নিষিদ্ধ করেছে প্রাদেশিক সরকার। একাধিক রেস্টুরেন্ট থেকে আরবি হরফে লেখা ‘হালাল’ শব্দটিও সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তার বদলে ব্যবহার করা হচ্ছে চীনা অক্ষর। একাধিক প্রদেশে খাদ্য, দুধ ও গম উৎপাদনকারী এবং রেস্টুরেন্টের জন্য হালাল সনদ দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। নিংশিয়া ও গানসু প্রদেশে আজান দেয়া নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ঐতিহাসিক মসজিদগুলোতে একটি বিশেষ ধরনের শিঙা দিয়ে নামাজের সময় ঘোষণা করা হয়। নিংশিয়ার রাজধানী ইনচুয়ানের এক মসজিদের ইমাম জানান, সমপ্রতি কর্তৃপক্ষ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছে। তাকে ধর্মীয় ইস্যুতে কোনো বিবৃতি না দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া একাধিক প্রদেশে মসজিদ নির্মাণ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। ইউনান প্রদেশে গত ডিসেম্বরে তিনটি ছোট গ্রামে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া চলায় একাধিক মসজিদ বন্ধ করে দেয়া হয়। চীনা সরকারের দাবি তারা ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়ে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসা সবার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। প্রকাশ্যে আরবি হরফ ব্যবহার বন্ধের বিষয়ে সরকারের ভাষ্য, আরবি একটি বিদেশি ভাষা। জনসাধারণের স্বার্থেই এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে এক সাক্ষাৎকারে ফ্রস্টবার্গ স্টেটের শিক্ষাবিদ মা বলেন, চীনের বর্তমান নেতৃত্ব ধর্মকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দেখে। তিনি বলেন, তারা ধর্মের প্রভাব সমপর্কে পূর্বের ইতিহাস ঘেঁটে দেখেছে। বিশেষ করে, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পোল্যান্ডে ক্যাথলিক চার্চের প্রভাব।
সরকারের বিরোধিতা করার তেমন কোনো সুযোগ নেই মুসলিমদের। মা জানান, তার ধারণা এমন অভিযান আরো বহুদিন চলবে। কিন্তু সবশেষে সরকার ব্যর্থ হবে। যেভাবে ব্যর্থ হয়েছে মুসলিমদের বিরুদ্ধে অন্যান্য দমন অভিযান। তিনি বলেন, ধর্মীয় বিশ্বাস পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলা নিয়ে আমি খুবই সন্দিহান। সেটা অসম্ভব।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Kazi

২০১৯-০৯-২২ ২২:৪৯:৪৯

চীনই মায়ানমারকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বন্দীশালা বানিয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ফেরত নিয়ে সেখানে বন্দী করার । আজকের এই খবর পড়ে বুঝলাম মায়ানমার সরকারের মাথায় বন্দী-শিবির করার বুদ্ধি কিভাবে এল।

kamal

২০১৯-০৯-২৩ ১১:৪৪:৩৩

আল্লাহ্ আপনি নির্জাতিত মানুষদের রক্ষা করুন (আমিন) এর মাধ্যমে একদিন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবে এবং মুসলিমরা তাদের অধিকার ফিরেপাবে।

আপনার মতামত দিন

সরকারি চাকুরেদের গ্রেপ্তারে অনুমতির বিধান কেন বেআইনী নয়: হাইকোর্ট

খালেদার সঙ্গে সাক্ষাতের অনুমতি পেয়েছেন ঐক্যফ্রন্ট নেতারা

ক্রিকেটারদের ধর্মঘটের ডাক

খালেদ ও শামীমের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

ভোলার ঘটনার প্রতিবাদে মোহাম্মদপুরে সড়ক অবরোধ

ভোলার ঘটনার প্রতিবাদে হেফাজতের কর্মসূচি

ভোলায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ, ৬ দফা দাবিতে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

এমপি হারুনের ৫ বছরের কারাদণ্ড

আইনজীবী সহকারি খুন: ১২ জনের ফাঁসি

ভোলায় সংঘর্ষের ঘটনায় মামলা, আসামি ৫ হাজার

লেবাননে সরকারবিরোধী আন্দোলন, আজ ধর্মঘট

ভোলার ঘটনায় বুধবার সারাদেশে বিএনপির বিক্ষোভ

বায়ু দূষণে বাড়ে হার্ট অ্যাটাক, অ্যাজমা

ভারত-পাকস্তান দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে

ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ‘ইংলিশ ক্ল্যাসিক’ ১-১ গোলে ড্র

শপথ নিলেন হাইকোর্টের ৯ বিচারপতি