যেভাবে নিজের পতন ডেকে আনেন বশির

বিশ্বজমিন

মানবজমিন ডেস্ক | ৬ জুলাই ২০১৯, শনিবার
প্রায় ৩০ বছর ধরে সুদান শাসন করেছেন ওমর হাসান আল বশির। এই তিন দশকে বহু অভ্যুত্থান, বিদ্রোহ ও যুদ্ধ ঠেকিয়ে টিকে ছিলেন তিনি। অবশেষে গত মাসেই তার পতন ঘটলো। বিশ্লেষকরা বলছেন, আঞ্চলিক রাজনীতি বুঝতে না পারা ও একটি গুরুত্বপূর্ণ মিত্ররাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েই নিজের পতন ডেকে এনেছেন বশির। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে প্রায় পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে ঠিক কীভাবে তার এই দীর্ঘ শাসনের ইতি ঘটলো। মানবজমিন-এর পাঠকদের জন্য তা তুলে ধরা হলো।

১০ই এপ্রিল রাতে সুদানের গোয়েন্দা প্রধান সালাহ গোশ প্রেসিডেন্ট ওমর হাসান আল বশিরের সঙ্গে তার প্রাসাদে গিয়ে দেখা করেন। ওই বৈঠকে গোশ প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করেন যে, চলমান গণবিক্ষোভ তার শাসনের প্রতি কোনো হুমকিই নয়।
অথচ, ৪ মাস ধরে রাজপথে বশিরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে হাজার হাজার সুদানি। তারা গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক দুর্দশা অবসানের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। আন্দোলনকারীরা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরেও তাঁবু স্থাপন করেছিলেন।
গোশ ও বশিরের মধ্যে ওই বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা সহ মোট চারটি সূত্র জানান, গোশ তখন বলেছিলেন যে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে প্রতিবাদকারীদের জটলা নিয়ন্ত্রণে আনা হবে অথবা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে।

গোশের কথায় আশ্বস্ত হয়ে শান্তিতে ঘুমাতে যান বশির। ৪ ঘণ্টা পর ঘুম থেকে জেগে উঠে বশির বুঝে যান যে, সালাহ গোশ তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। প্রাসাদ রক্ষীরা সব চলে গেছেন। তাদের স্থলে প্রাসাদে অবস্থান নিয়েছে নিয়মিত সৈন্যরা। বশিরের বুঝতে আর বাকি রইলো না যে, তার ৩০ বছরের শাসনের ইতি ঘটেছে।
এই চূড়ান্ত সময়ে বশিরের সঙ্গে অল্প যে কয়েকজন ব্যক্তি কথা বলেছেন, তাদের একজন জানান, এই অবস্থা দেখে প্রেসিডেন্ট নামাজ পড়তে চলে যান। তার ভাষ্য, ‘নামাজ পড়া পর্যন্ত তার জন্য অপেক্ষা করে সেনা কর্মকর্তারা।’ কর্মকর্তারা বশিরকে জানান যে, সুদানের হাই সিকিউরিটি কমিটি (যার সদস্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং সেনা, গোয়েন্দা ও পুলিশ প্রধান) তাকে ক্ষমতাচ্যুত করছে। কমিটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, দেশের নিয়ন্ত্রণ আর তার হাতে নেই।

প্রাসাদ থেকে বশিরকে রাজধানী খার্তুমের কোবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! ঠিক এই কারাগারেই তিনি নিজের হাজার হাজার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে পুরেছিলেন। তিনি এখনও ওই কারাগারেই রয়েছেন। ৩০ বছর ধরে যে বশির শক্ত হাতে বহু বিদ্রোহ, অভ্যুত্থান চেষ্টা ঠেকিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়েছেন, গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিষেধাজ্ঞাকে কাঁচকলা দেখিয়েছেন, সেই বশিরের বিরুদ্ধে এই অভ্যুত্থান যেন অত্যন্ত নিখুঁত ও মসৃণ ছিল। সবকিছু ঘটে যাওয়ার আগে বশির টেরই পাননি।

একজন সাবেক মন্ত্রী, বশিরের অন্দরমহলের একজন সদস্য ও অভ্যুত্থান প্রচেষ্টায় সরাসরি জড়িত একজন ব্যক্তি সহ মোট ৩টি সূত্র বশিরের পতনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে: বশির হয়তো সুদানের অভ্যন্তরীণ ইসলামিস্ট প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী ও সামরিক অংশগুলোকে নিয়ন্ত্রণে ভীষণ দক্ষ ছিলেন, কিন্তু পরিবর্তনশীল মধ্যপ্রাচ্যে তিনি একাকী হয়ে গিয়েছিলেন। তারা বর্ণনা করেন কীভাবে বশির সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে নিজের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছেন। অথচ, ইতিপূর্বে আরব আমিরাতই সুদানের রাজকোষে কয়েক বিলিয়ন ডলার ঢেলেছিল। বশির অবশ্য ইয়েমেনে আমিরাতের স্বার্থ ঠিকঠাক মতোই রক্ষা করেছিলেন (ইয়েমেনে ইরানের বিরুদ্ধে প্রক্সি লড়াই চলছে আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের)। কিন্তু ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ যখন দেশের অর্থনীতির অবস্থা শোচনীয় আকার ধারণ করে, পাশাপাশি রাজপথ দখলে নেয় বিক্ষোভকারীরা, বশির দেখতে পেলেন তার পাশে আর নেই ক্ষমতাধর, সম্পদশালী মিত্র আমিরাত।

সূত্রগুলো আরও জানায়, সামরিক জেনারেলরা বশিরের বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগেই জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সালাহ গোশ কারাবন্দি বিরোধী নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে তাদের সমর্থন চান। অভ্যুত্থানের কয়েকদিন আগে, গোশ অন্তত একবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে আগেভাগেই জানিয়ে দেন কী ঘটতে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আরব আমিরাত ও সৌদি আরব সরকার কোনো প্রশ্নের জবাব না দিলেও, জুনে আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আনোয়ার গারগাশ টুইটারে বশিরের পতনের পর লিখেছিলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সুদানের সকল বিরোধী পক্ষ ও সামরিক পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। গারগাশ আরও বলেন, বশিরের দীর্ঘ একনায়কতন্ত্র ও মুসলিম ব্রাদারহুডের পর এখন সংবেদনশীল সময় চলছে সুদানে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রসঙ্গত, মুসলিম ব্রাদারহুড বশিরের মিত্র ছিল।

অথচ, ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেও বশির ও আরব আমিরাতের সম্পর্ক অনেক উষ্ণ ছিল। সেবার বশির আমিরাতে গিয়ে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে আবুধাবিতে সাক্ষাত করেন। অপরদিকে ইয়েমেনে সৌদি-আমিরাত নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটে অংশ নেয় ১৪ হাজার সুদানি সেনা।

তবে ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদ (সংক্ষেপে যাকে এমবিজেড ডাকা হয়) অন্য আরেক ক্ষেত্রেও বশিরের সহযোগিতা চাইছিলেন। আর তা ছিল, ইসলামিস্ট বা ব্রাদারহুডকে দমন করতে হবে। সুদানি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ কথা জানান।
রাজনৈতিক ইসলাম, অর্থাৎ ব্রাদারহুডকে ঠেকাতে আঞ্চলিক তৎপরতার নেতৃত্বে ছিল আমিরাত। সৌদি ও আমিরাত মনে করে, তাদের রাজতন্ত্রী শাসন ও এই অঞ্চলের নিরাপত্তার প্রতি সরাসরি হুমকি ব্রাদারহুড। ২০১১ সাল থেকে এই উদ্বেগ আরও তীব্র হয় সৌদি আরব ও আরব আমিরাতের। কারণ সেই বছরই পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ওপর দিয়ে বয়ে যায় আরব বসন্ত, যার সবচেয়ে বেশি লাভ ঘরে তোলে মুসলিম ব্রাদারহুড। সৌদি ও আমিরাত ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ব্রাদারহুডের দাবি তারা শান্তিপূর্ণ।
২০১২ সালে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহাম্মদ মুরসি প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন। মাত্র ১ বছর পরই তাকে উৎখাত করে সেনাবাহিনী। পরবর্তী ১৮ মাসে সেনা শাসনাধীন মিশরকে সাহায্য হিসেবে ২৩০০ কোটি ডলার পাঠায় সৌদি আরব, আমিরাত ও কুয়েত। সুদানে ইসলামিস্টদের প্রভাব মিশরের চেয়েও বেশি। বশির নিজেও একটি ইসলামিস্ট জান্তার প্রধান হিসেবে ১৯৮৯ সালে ক্ষমতা দখল করেন। দেশটির সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী ও প্রধান মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণেও ইসলামিস্টরা। ওই বৈঠকে বশির ও এমবিজেড ঐক্যমত্যে পৌঁছেন যে, বশির ইসলামিস্টদের উৎখাত করবেন, বিনিময়ে সুদানকে আর্থিক সহায়তা দেবে আমিরাত। কিন্তু বশির বলেননি কীভাবে তিনি ইসলামিস্টদের দমন করবেন।

আবুধাবির সেই আলোচনার পর সুদানে কয়েক বিলিয়ন ডলার পাঠায় আরব আমিরাত। ২০১৮ সালের মার্চে আমিরাতি সরকারী বার্তা সংস্থা জানায়, সুদানের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সহায়তার অংশ হিসেবে এবং বেসরকারী ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অংশ হিসেবে ৭৬০০ কোটি ডলার দিয়েছে আমিরাত।
বশিরের সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের একজন ছিলেন তার কার্যালয়ের পরিচালক তাহা ওসমান আল হোসেন। তাকেই ইউএই’র সঙ্গে সম্পর্ক দেখভালের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তাহা ওসমান হোসেন একজন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা। সহকর্মীরা জানান, তিনি ভীষণ উচ্চাবিলাশী ও দক্ষ একজন কর্মকর্তা। তার প্রভাব এত বেশি ছিল যে খোদ মন্ত্রীরাও তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেন। হোসেনকে এড়িয়ে বশিরের সঙ্গে মন্ত্রীরাও দেখা করতে পারতেন না। তাদের অভিযোগ ছিল, হোসেন নিজেই দেশের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন। একবার তিনি সরাসরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এড়িয়ে রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ও সৌদি আরবের একটি সংবাদ সংস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ঘোষণা করেন।

বশিরের জাতীয় কংগ্রেস পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতা গামার হাবানি বলেন, ‘বশিরের মনের ওপর জাদুকরি প্রভাব ছিল হোসেনের।’ তবে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন তৎকালীন গোয়েন্দা প্রধান ও নেতৃত্বস্থানীয় রাজনীতিকরা। তারা প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ তোলেন। গোয়েন্দা সংস্থা অভিযোগ করে, দুবাইয়ে হোসেনের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১০৯ মিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছে সৌদি আরব ও ইউএই। হোসেন অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
কিন্তু ২০১৭ সালের জুলাইয়ে জানাজানি হয়ে যায় যে, হোসেন সৌদি আরবের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। তখন তাকে বহিষ্কার করেন বশির। এরপর হোসেন রিয়াদে চলে যান ও সেখান থেকেই সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ শুরু করেন।

হাবানি বলেন, ‘তাহা হোসেনের ঘটনা বশিরের মনে বিরাট দাগ কেটে যায়।’ আবার তাকে বহিষ্কারের বিষয়টি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্য বড় ধাক্কা ছিল।
(আগামী পর্বে সমাপ্য)



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বর্ণবাদী মন্তব্যের পর বেড়ে গেছে ট্রাম্পের সমর্থন!

সৌদি আরবে সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি আমেরিকার

ইস্টার সানডে ‘জঙ্গি হামলা’ ঘটিয়েছে মাদক কারবারিরা: শ্রীলংকান প্রেসিডেন্ট

দুর্ভোগে বানভাসি মানুষ পাশে নেই কেউ

ধরন পাল্টানোয় চিন্তিত চিকিৎসকরা

ডেঙ্গু রোগীর চাপে হিমশিম কর্তৃপক্ষ

প্রতিদিনই বাড়ছে রোগী

এরশাদের চেয়ারে জিএম কাদের

ধর্ষণ মামলার বিচারে হাইকোর্টের ৬ নির্দেশনা

রিফাত হত্যার পরিকল্পনায় মিন্নি জড়িত

হটলাইন কমান্ডো নিয়ে আসছেন সোহেল তাজ

শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে হবে- সালমান এফ রহমান

বেসিক ব্যাংককে ৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়

১১ খাতে ওয়াসার দুর্নীতি পেয়েছে দুদক

‘আমলারাই এ সরকার টিকিয়ে রেখেছে’

ঢাবি থেকে ৭ কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের দাবিতে আবারো শাহবাগ মোড় অবরোধ