মৌসুমের প্রথম বৃষ্টিতেই ডুবলো সিলেট নগর

শেষের পাতা

স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট থেকে | ২৭ জুন ২০১৯, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৩:১১
বর্ষা মৌসুমের প্রথম বর্ষণে ডুবে গেল সিলেট নগর। এতে করে নগরবাসীর দুর্ভোগ ছিল চরমে। কোথাও কোথাও বৃষ্টির পর বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে হানা দেয়। স্যুয়ারেজ ও ড্রেনের ময়লা পানি গিয়ে আঘাত হানে বাসা বাড়িতে। এ কারণে বৃষ্টির সময় স্থবির হয়ে পড়েছিল জীবনযাত্রা। জলজটের কারণে অনেক স্থানে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় নগরীতে দুর্ভোগও দেখা দেয়। এদিকে- সিলেট নগরীর চলমান জলাবদ্ধতা নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে নগরবাসীর মধ্যে।

কাউন্সিলররা দাবি করেছেন- পরিকল্পনা মতো উন্নয়ন কাজ না হওয়ার কারণে সিলেটবাসী অতীত থেকে এখন পর্যন্ত জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারেননি।
এ কারণে চলতি বর্ষা মৌসুমে সিলেট নগরীতে তীব্র জলজটের আশঙ্কা করছেন তারা। তবে বৃষ্টির সময় সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী গাড়ি নিয়ে বের হয়ে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। অতিরিক্ত শ্রমিক নিয়োগ করে তিনি জলজট কমানোর চেষ্টা করেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ দলীয় সাবেক মেয়র বদরউদ্দিন আহমদ কামরানের পরাজয়ের অন্যতম একটি কারণ ছিল নগরীর জলাবদ্ধতা। প্রায় ৬ বছর আগের ওই নির্বাচনে বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের নজর কেড়ে নগর পিতা নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু ৬ বছরে অবস্থার পরিবর্তন কতটুকু হয়েছে এ নিয়ে গতকাল থেকে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সিলেটে।

টানা এক সপ্তাহ তীব্র গরমে হাঁসফাঁস করা নগরবাসীকে গত সোমবারই সু-খবর দিয়েছিল আবহাওয়া অধিদপ্তর। বলেছিল- মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টি হতে পারে। সেই বৃষ্টির দেখা মিলেছে মঙ্গলবার রাত থেকেই। রাতের বৃষ্টিতে নগরীর দরগাহ মহল্লা সহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল। তবে- ভোরের আগেই সেই জলাবদ্ধতা কমে যাওয়ায় নগরবাসীর চোখে পড়েনি। গতকাল দুপুরের পর থেকে সিলেট নগরীতে মাঝারি ধরনের বর্ষণ শুরু হয়। টানা দুই ঘণ্টার বর্ষণে সিলেট নগরীর চিত্র পাল্টে যায়। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকার কারণে বিভিন্ন এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

এরপর নগরীর পাঠানটুলা এলাকার সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে জলাবদ্ধতা ছিল তীব্র। এক দশক ধরেই বৃষ্টি হলে পাঠানটুলায় পানি জমে। একই অবস্থা দেখা দেয় লন্ডনি রোড এলাকায়। কোথাও হাঁটু আবার কোথাও কোমর সমান পানিতে তলিয়ে যায় এলাকা। পানিতে নিমজ্জিত হওয়ার কারণে ওই এলাকায় যান চলাচলও ব্যাহত হয়। স্থানীয় দোকানি কামরুল ইসলাম জানিয়েছেন- পাঠানটুলার জলাবদ্ধতার দুঃখ এক দশকে লাঘব হয়নি। আগের মেয়র যেমন ছিলেন উদাসীন, বর্তমান মেয়রও এই জলাবদ্ধতা নিয়ে আরো বেশি উদাসীন। তিনি বুলডোজার নিয়ে এসে শুধু ভাঙছেন। কিন্তু পরিকল্পনা মতো ড্রেন ও খাল সংস্কার না করার কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

লন্ডনি রোড এলাকায় ড্রেনে স্যুয়ারেজের ময়লা পানি ঢুকছে মানুষের বাসা বাড়িতে। এ কারণে এলাকায় চরম দুর্ভোগ দেখা দেয়। নগরীর নাইওরপুল পয়েন্ট গতকাল পানিতে একাকার হয়ে গিয়েছিল। নাইওরপুল জলাবদ্ধতার অন্যতম স্থান। কিন্তু কেউই নাইওরপুলের জলাবদ্ধতা কমাতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। জলাবদ্ধতার পানিতে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ের সামনের অংশ ডুবে গিয়েছিল। এতে করে দুর্ভোগ দেখা দেয়। আর মূল সড়কে কোথাও হাঁটু আবার কোমর সমান পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যায়। সিলেট নগরীর পুরানলেন এলাকায় এবার নতুন করে জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখা দিয়েছে। গতকাল বিকালে পুরান লেনের বাসিন্দারা জানিয়েছেন- সিলেট নগরীর ১৫নং ওয়ার্ডের জিন্দাবাজারস্থ সোনালী ব্যাংকের উত্তর পাশে পুরান লেনের গলি সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এতে রাস্তাসহ পাশের বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে অসহনীয় অবস্থার সৃষ্টি হওয়ায় জনদুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।

মহানগর এলাকায় জনসাধারণের সুবিধার্থে বক্স ড্রেন নির্মাণ করা হলেও দুর্ভোগ আগের চেয়ে আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। তিন তারা বিপণির নিচে ঘন ঘন পাকা পিলার থাকার ফলে পানি নিষ্কাশন না হওয়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছে এখন সাধারণ মানুষ। অপরিকল্পিতভাবে বক্স কালভার্ট নির্মাণের ফলে ময়লা আবর্জনা জমে পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে বারবার অবহিত করার পরও কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। একটু বৃষ্টিপাত হলেই পুরান লেন গলির বাসিন্দারা আতঙ্কে থাকেন কখন বাসায় পানি ঢুকে মূল্যবান জিনিসপত্র সব নষ্ট হয়ে যায়। এদিকে- নগরীর শেখঘাট, ভাঙ্গাটিকর, যতরপুর, নবাবরোড, ভাতালিয়া, অগ্রগামী স্কুলের সামন, শিবগঞ্জ, লামাপাড়া, আম্বরখানা, হাউজিং এস্টেট, পীরমহল্লা, খাসদবির, জেলরোড সহ কয়েকটি এলাকায় তীব্র জলজট দেখা দেয়। বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা কমে যাওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী ভিত্তিতে শ্রমিক নিয়োগ করে পানি অপসারণের চেষ্টা করা হয়। সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বৃষ্টির সময় নিজেও নগরীর ভাতালিয়া, লালাদিঘীরপাড়, ভাঙ্গাটিক, নবাবরোড, পাঠানটুলা, পুরান লেন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। এসব এলাকায় তিনি শ্রমিক নিয়োগ করে দ্রুত পানি অপসারণের ব্যবস্থা করে দেন। সিলেট সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহাব উদ্দিন শিহাব মানবজমিনকে জানিয়েছেন- যেখানেই জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল সেখানেই মেয়র গিয়ে পানি অপসারণের ব্যবস্থা করেন।

এ কারণে বৃষ্টি কমার সঙ্গে সঙ্গে পানিও নেমে যায়। এদিকে- সিলেট নগরীর এই জলাবদ্ধতা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা জানান- বর্ষা মৌসুমে ছড়া, ড্রেন ও কালভার্টের কাজ চলছে। এ কারণে পানি নেমে যাওয়ার জায়গা নেই। এতে করে জলজট হচ্ছে দুর্ভোগ বাড়ছে। সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট চেম্বারের প্রশাসক আসাদ উদ্দিন আহমদ মানবজমিনকে জানিয়েছেন- মঙ্গলবার রাতে দরগাহ এলাকায় তিনি নিজেও জলাবদ্ধতায় পড়েছিলেন। বর্তমান সরকার মেয়রকে দুই হাতে টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু কাজ কী হচ্ছে সেটি নগরবাসী এখন জানতে চায়।

এ কারণে মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। সিলেট সিটি করপোরেশনের সিনিয়র কাউন্সিলরদের মধ্যে এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা হওয়ার কারণ হিসেবে সাবেক প্যানেল মেয়র ও ৪নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রেজাউল হাসান কয়েস লোদি মনে করেন- অপরিকল্পিত উন্নয়ন কাজ। তিনি বলেন- ছড়া, খাল কিংবা ড্রেনের কাজ কখন করতে হবে সেটি আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বর্ষা মৌসুমে এগুলো কাজ হয় না। ঠিকাদারকে টাইমফ্রেম দিয়ে কাজ তুলে নিতে হবে। মাসের পর মাস যায় কাজ শেষ হয় না। এ কারণে বর্ষা মৌসুমে জলজটে পড়েছে সিলেট। এই বর্ষায় সিলেট নগরীতে কী হবে সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তিনি। মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সরকার থেকে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সিনিয়র কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ। তিনি বলেন- মেয়র সকালে ঘুম থেকে ওঠে শুধু ভাঙ্গার ধান্ধায় থাকেন। তার আর কোনো কাজ নেই। কিন্তু কীভাবে, কত দিনে কাজ শেষ হবে সেটি নিয়ে তার কোনো গরজ নেই। সিলেট নগরীতে সব কিছুই অপরিকল্পিতভাবে চলছে বলে জানান তিনি।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Kazi

২০১৯-০৬-২৬ ১৪:৩৬:৫৬

একেতো নালা নর্দমার সমস্যা তার উপরে জনগণ নর্দমায় ময়লা ফেলে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টি করে । নালায় ময়লা না ফেললে কালভার্টের নীচে জমা হত না। পানি দ্রুত চলে যেতে পারত। তাই অভ্যাস বদলাতে হবে নতুবা ময়লা পানির যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে। এটা কর্মফল।

আপনার মতামত দিন

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হচ্ছে

ব্যবস্থা চান বিশিষ্টজনরা

কেলেঙ্কারি-জালিয়াতিতে ডুবছে ২২ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

ত্রাণ-আশ্রয়ের জন্য ছুটছে মানুষ

ডেঙ্গু রোগীদের ৮০ ভাগই শিশু

ঢাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

‘জনগণকে নিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে হবে’

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিএসটিআই পরিচালকের অপসারণ দাবি

ছেলেধরা সন্দেহে তিন জনকে পিটিয়ে হত্যা

রংপুর-৩ সদর শূন্য আসন নিয়ে আলোচনার ঝড়

পশ্চিমবঙ্গেও চালু হলো এনআরসি!

পর্নোগ্রাফি ও ব্ল্যাকমেইল নেশা সিলেটের এহিয়ার

গণপিটুনিতে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে

রাঘববোয়ালদের নিয়ে কাজ করতে সমস্যা হয়

মাদ্রাসাছাত্রীকে ইজিবাইক থেকে নামিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা

ভারতের কৌশল ধ্বংস করছে সার্ককে