ধসে পড়তে পারে চট্টগ্রাম কালুরঘাট সেতু

এক্সক্লুসিভ

ইব্রাহিম খলিল, চট্টগ্রাম থেকে | ২৬ জুন ২০১৯, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:০২
কুলাউড়ায় সেতু ভেঙে আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনের কয়েকটি বগি খালে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় দুই নারী ও দুই পুরুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আহত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন আরো ৬৭ জনের মতো ট্রেনযাত্রী।

এমনি এক প্রাণহানি আর দুর্ভোগের ঘটনা ঘটতে পারে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত কালুরঘাট সেতু ধসে। কারণ ৮৫ বছর বয়সের বার্ধক্য এ সেতু এখন অপেক্ষায় রয়েছে বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার।

২০০১ সালে রেলওয়ে সেতুটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করে। অথচ এ সেতু দিয়ে চলাচল করছে যাত্রীবাহী বাস, পণ্যবাহী ট্রাকসহ ভারী যানবাহন। চলছে যাত্রীবাহী ও ফার্নেস অয়েলবাহী ট্যাঙ্কার। এই সেতু মূলত দক্ষিণ চট্টগ্রামে যাতায়াতে ট্রেন চলাচলের জন্য নির্মিত।     

রেলওয়ে সূত্র জানায়, ১৯৩০ সালে নির্মিত সেতুটিতে রেলের পাশাপাশি যানবাহন চলাচল করছে ১৯৫৮ সাল থেকে।
এই একটি সেতু দিয়ে যান চলাচল, পায়ে হেঁটে পারাপার এবং রেল চলাচল করে থাকে। একমুখী চলাচলের কারণে দুই পাশে যানজট হওয়ার পাশাপাশি সেতুর উপর চাপ থাকে সব সময়। যার জন্য বারবার মেরামত করে সেতুটি সচল রাখার ব্যবস্থা করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। সর্বশেষ ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে সেতুটি মেরামত করা হয়। এর আগে ২০০৪ সালেও এটি মেরামত করা হয়েছিল। এ ছাড়াও প্রতিনিয়ত ছোটখাটো মেরামত কাজ করা হচ্ছে এই সেতুর।

সূত্র জানায়, কালুরঘাট সেতুর উপর দিয়ে পাঁচ টনের বেশি ওজনের যেকোনো যানবাহন চলাচল নিষেধ। কিন্তু বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই। ফার্নেস অয়েল নিয়ে যেসব ট্যাঙ্কার এ সেতুর উপর দিয়ে চলাচল করে তার সম্মিলিত ওজনও ১০ টনের বেশি। এভাবে চলতে থাকলে কালুরঘাট সেতুতে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
সরজমিন দেখা যায়, সেতুর উপরের কার্পেটিং উপড়ে গিয়ে স্থানে স্থানে উঁচু-নিচু হয়ে গেছে।  রেললাইনের গোড়ায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়ে নদীর পানি চলাচলের দৃশ্য চোখে পড়ছে। কয়েকটি স্থানে মরিচায় লোহার পাত ক্ষয়ে গিয়ে আলগা হয়ে গেছে।

সেতুর পাশের দোকানদার মোহাম্মদ বাবুল জানান, প্রতিদিনই সেতুর দুই পাশে যানবাহনের জট থাকে। যতই দিন যাচ্ছে সেতুর উপর চাপ বাড়ছে। জরুরি প্রয়োজনে এই সেতু পারাপারে দু’পারের মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই।
তিনি বলেন, এ সেতুর পরিণতি এখন এতই মুমূর্ষু যে, যেকোনো সময় মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার সেতুর মতো ধসে পড়তে পারে। কিন্তু দুর্ঘটনা ঘটবে কুলাউড়ার চেয়েও মারাত্মক ও ভয়াবহ। কর্ণফুলী নদীর উপর নির্মিত প্রায় এক কিলোমিটার দৈর্ঘ্য সেতু ধসে পড়লে প্রাণহানি ঘটবে ব্যাপক।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় প্রকৌশলী-১ মো. আবিদুর রহমান বলেন, সেতুটিতে এমনিতে চাপ বেশি। আমরা সাধারণত পাঁচ টনের বেশি অনুমোদন করি না। তবে এখন তার চেয়ে আরো বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল করে। এটি সেতুর জন্য ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, এই সেতু বর্তমানে মেরামতের মাধ্যমে চলছে। এমনিতে লোহার পিলার ৬০-৭০ বছর ব্যবহারের পর বাদ দেয়া উচিত। কিন্তু এটি এখনো চলছে। তবে আরেকটি বিকল্প সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. মোজাম্মেল হক জানান, এনটি-আরপি জয়েন্টভেঞ্চার তিন বছরের মধ্যে রেল চলাচলের ৬০টি সেতুর নির্মাণ ও সংস্কার শেষ করবে বলে চুক্তি করেছিল। তিন বছরে তারা কেবল এক-তৃতীয়াংশ কাজ করেছে। বড় সেতুগুলোর ধারে-কাছেও যায়নি।

বিশেষ করে কালুরঘাট সেতুর কোনো মেরামত কাজই তারা করেনি। কাজ শেষ না করে উল্টো রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে মামলা করে। আইনি জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুগুলো ঠিক করা যায়নি। ইতিমধ্যে স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হয়েছে। শিগগিরই সেতু সংস্কারে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে।

তিনি জানান, সেতু দিয়ে বোয়ালখালী, পটিয়ার একাংশ ছাড়াও দক্ষিণ চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারের যানবাহনও চলাচল করে। বার্ধক্যে এসে এই সেতু এখন আর বয়সের ভার বইতে পারছে না। জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকমে টিকে আছে। তার পরও যানবাহন চলাচল করছে সমানে, বরং আগের তুলনায় বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে দিনে দিনে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেতুটি।

উল্লেখ্য, ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্মা ফ্রন্টের সেনা পরিচালনার জন্য কর্ণফুলী নদীতে একটি আপদকালীন সেতু তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৩০ সালে ব্রুনিক অ্যান্ড কোমপানির ব্রিজ বিল্ডার্স হাওড়া নামে একটি সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কালুরঘাটে যুদ্ধকালীন ব্যবহারের জন্য একটি সেতু তৈরি করে। জরুরি ভিত্তিতে ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে সেতুটি ১৯৩০ সালের ৪ঠা জুন উদ্বোধন করা হয়।

পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পুনরায় বার্মা ফ্রন্টের যুদ্ধ মোটরযান চলাচলের জন্য ডেক বসানো হয়। দেশ বিভাগের পর ডেক তুলে ফেলা হয়। ১৯৫৮ সালে এই একমুখী যুদ্ধসেতুটিই সব ধরনের যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এ সেতুতে দুটি অ্যাবটমেন্ট, ছয়টি ব্রিক পিলার, ১২টি স্টিল পিলার ও ১৯টি সপ্যান রয়েছে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

শ্রীলঙ্কায় যাচ্ছেন না মাশরাফি

পানিবন্দি মানুষ মানবেতর জীবন

‘তুইতোকারিকে’ কেন্দ্র করে চার খুন

ঢাকায় বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয় কাবু মধ্যবিত্ত

আদালতে মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি

ডেঙ্গু রোগীদের ভিড়

ভয়ঙ্কর মাদক আইস ছড়িয়ে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক চক্র

দুই মামলা, আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ পুলিশের

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট বিভাগের ছুটি বাতিল

দুর্নীতিকে দুর্নীতি হিসেবেই দেখব- ওবায়দুল কাদের

সিলেটে ধর্ষিতার স্বামীর ফরিয়াদ

কাঁচাবাজারে বন্যার প্রভাব

কিশোর গ্যাংয়ের অন্তর্দ্বন্দ্বে খুন

পাকুন্দিয়ায় নিহত স্কুলছাত্রীর ময়নাতদন্তে ধর্ষণের আলামত

টিআইবি’র উদ্বেগ প্রত্যাহারের আহ্বান

ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল সিলেটে