রাজশাহীর আমের কদর বাড়ছে

বাংলারজমিন

আসলাম-উদ-দৌলা, রাজশাহী থেকে | ২৩ জুন ২০১৯, রোববার
একটা সময় ছিলো যখন রসালো আম বলতে দেশব্যাপী রাজশাহীর আমকেই চিনতো। বিশ্ব বাজারেও সেই আধিপত্যের ছাপ পড়ে। কিন্তু গেল বছরগুলোতে কেমিক্যাল দিয়ে আম পাকানোর রেওয়াজ, বিভিন্ন জেলায় নতুন নতুন আমের বাগান সৃষ্টি হওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলের আম চাষিদের লোকসান গুনতে হয়েছে। আম চাষের খরচ কমাতে চলতি বছরের শুরুর দিকে রাজশাহীর বিভাগের চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার আম বাগানগুলোতে কম দামে বিক্রি হওয়া গুটি জাতের আম গাছ কেটে ফেলতেও দেখা গেছে। সংকট নিরসনে দফায় দফায় জেলা প্রশাসনের সাথে বৈঠক হয়েছে। আমবাগান তদারকির বিষয়টি হাইকোর্ট পর্যন্ত উঠে। কেমিক্যাল আতঙ্ক মুক্ত আমের বাজার সৃষ্টির সেই প্রয়াসের সুফল পাচ্ছেন আমচাষি ও ক্রেতারা।     
রমজান মাসে বাজারে আম উঠলেও বেচাকেনা ছিল কম। তবে ঈদের পর বাজার চাঙ্গা হয়ে উঠছে।
এখন প্রতিদিন রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা থেকে ৫০-৬০ ট্রাক আম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাচ্ছে। সুমিষ্ট স্বাদের রাজশাহীর এই আমের কদর দেশের বাইরেও রয়েছে।
রাজশাহী জেলার মধ্যে বাঘা উপজেলার আম উৎপাদন ও গুণগত মান ভালো। হটেক্স ফাউন্ডেশন ও উপজেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার মাধ্যমে আম রপ্তানি শুরু করা হয়েছে। গত চার বছর থেকে এই উপজেলার আম রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
চলতি মৌসুমে বাঘা উপজেলার আম ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, পর্তুগাল, নরওয়ে, ফ্রান্স ও রাশিয়ায় রপ্তানি শুরু হয়েছে। এরইমধ্যে ২.৮ টন হিমসাগর ও ল্যাংড়া জাতের আম রপ্তানি করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে ৩৩ টন আম বিদেশে রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিউল্লা সুলতান। এছাড়া বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত রিনা পি সোয়েমারনো রাজশাহী থেকে আম আমদানি করার ব্যাপারে আগ্রহের কথা জানান। গত ১২ই জুন রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিনিময়কালে রাষ্ট্রদূত রিনা পি সোয়েমারনো বলেন,‘তাদের দেশেও আম উৎপাদন হয়। তবে এ সময়টা সেখানে অফসিজন হওয়ায় তারা রাজশাহী থেকে আম আমদানি করতে চান।’ এরফলে ইন্দোনেশিয়ায় রাজশাহীর আমের বড় বাজার সৃষ্টি হতে পারে।
সূত্রমতে, বিদেশে আম রফতানি করতে হলে ২৬টি শর্ত মানতে হয়। ব্যাগিং হচ্ছে ২৬টি শর্তের একটি। ব্যাগিং করা না হলেও আমের মান ভালো হলে রফতানি করা যায়। তবে গুরুত্বপূর্ণ হলো কোয়ারেন্টাইন টেস্ট। বিদেশ যেতে হলে আমকে কোয়ারেন্টাইন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। এজন্য আম ঢাকার শ্যামপুর প্ল্যান কোয়ারেন্টাইন উইং সেন্ট্রাল প্যাকিং হাউসে নিয়ে যান। আমের মান ভালো হলে সেখানে ছাড়পত্র দেয় কর্তৃপক্ষ। এসব শর্ত মেনেই গত বছর (২০১৮ সালে) ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ২৫ মেট্রিক টন আম রফতানি করেছেন রাজশাহীর ১৪ জন ব্যবসায়ী। এরআগে ২০১৭ সালে রপ্তানি করেছিলেন ৩০ টন। চলতি মৌসুমে গেল দুইবছরের চেয়ে রপ্তানি বাড়ার সম্ভবনার কথা জানিয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
রাজশাহী কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শামসুল হক জানান, আম রফতানিতে আমাদের সক্ষমতা রয়েছে কমপক্ষে ১০০ টন। তবে আম মানসম্মত হলে যতো বেশিই উৎপাদন হোক না কেন, সব রফতানি করতে পারবো। মান ভালো হলে ফ্রুট ব্যাগিং ছাড়াও আম রফতানি করা যায়। আশা করছি, এবার অন্তত ৫০ টন আম আমরা বাইরের দেশে পাঠাতে পারবো। এদিকে, রাজশাহীর জেলা প্রশাসক এসএম আব্দুল কাদের বলেন, রাজশাহীর আম দেশ সেরা। এই আমের অপেক্ষায় থাকেন সারাদেশের রসনা বিলাসী মানুষ। এখানে আমে ফরমালিন মেশানো হয় না। কৃত্রিমভাবেও আম পাকানো হয় না। কিন্তু যখন বাজারে অনেক আগে কিংবা পরে আম পাওয়া যায়। তখন অনেকে মনে করেন, আমে কেমিক্যাল দেয়া আছে। আবার কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা বিগত সময়ে লাভের আশায় কেমিক্যাল ব্যবহার করেছিলো। যার প্রভাব পড়ে রাজশাহীর আম বাজারে। বাজারে আমের দাম পড়তে থাকে। তাই আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে ক্রেতাদের ভীতি দূর করতে এবং আমচাষিদের রক্ষা করতে আম পাড়ার একটা নির্দিষ্ট সময় ঠিক করে নেয়া হয়। যার সুফল পাচ্ছেন আমচাষিরা। ক্রেতারাও নিরাপদে আম কিনতে পারছেন।
জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেয়া সময় অনুযায়ী, গত ১৫ই মে থেকে বাজারে উঠে গুটি জাতের আম। ২০শে মে থেকে গোপালভোগ। লক্ষণভোগ ও লখনা নামানো হয় ২৫শে মে এবং হিমসাগর ও খিরসাপাত ২৮ মে’র পর থেকে বাজারে আসে। চলতি মাসের ৬ই জুন থেকে ল্যাংড়া ও বোম্বায় বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। আগামী রোববার থেকে (১৬ জুন) ফজলি, সুরমা ফজলি ও আমরুপালি বাজারে নামবে। আশ্বিনা আম ১৭ই জুলাই থেকে গাছ থেকে নামানো হবে। আমচাষিরা জানান, রমজানের কারণে প্রথম দিকের আমে লাভ করতে পারেন নি। তবে ঈদের পর সব ধরনের আম মণপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বেড়েছে। এখন আর আমের দাম কমার কোনও সম্ভাবনা নেই। এই সপ্তাহের পর দাম আরও বাড়বে। আমের বাজার খ্যাত রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর বাজার জমে উঠেছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে এই হাটে। আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন টনকে টন আম আমদানি করছে এ হাটে। আমদানি করা এসব আম আড়তের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। প্রতিকূলতার মধ্যেও এবার আমের দাম ভালো হওয়ায় ব্যবসায়ী ও চাষিরা অনেকটাই সন্তুষ্ট।
বিগত বছরের তুলনায় এবারে আমের দাম কিছুটা বেশি। আম চাষি ও আম ব্যবসায়ীরা জানান, গুটি আম ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকা, ল্যাংড়া আম ১৬শ’ থেকে ২২শ’ টাকা, লখনা ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকা, রানী প্রসাদ ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ টাকা, খিরসাপাত (হিমসাগর) আম ১৫শ’ থেকে ২১শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আম বিক্রেতা আশরাফ হোসেন জানান, লখনা আম বিগত বছরে ৪শ’ থেকে ৭শ’ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু এই বছরে ৮শ’ থেকে ১২শ’ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে আমাদের কিছুটা লাভ হচ্ছে। কিন্তু কয়েক দফার ঝড়ে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আড়ৎ ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, এবার রোজার পরে পুরোদমে আম বিক্রি শুরু হওয়ায় দাম অনেকটা বেশি। এই এলাকার প্রচলিত নিয়ম মতে ৪৫-৪৬ কেজিতে এক মণ, এই নিয়মে আম ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে বলে জানান তিনি।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ওয়াশিংটনে ইমরান খান যা বললেন

ট্যাংকার জব্দ: ইরান-বৃটেন উত্তেজনা অব্যাহত

‘টিভি চ্যানেলগুলো নাচের শিল্পীদের যথাযথ মূল্যায়ন করে না’

বানভাসি মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে

নৈরাজ্য

১৯ জনকে গণপিটুনি নিহত ৩

মার্কিন দূতাবাসের দুরভিসন্ধি

মিন্নির জামিন মেলেনি

পুঁজিবাজারে একদিনেই ৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন হাওয়া

মশায় অতিষ্ঠ মানুষ ঘরে ঘরে ডেঙ্গু আতঙ্ক

অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিতে বললেন প্রধানমন্ত্রী

সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিলের আন্দোলনে অচল ঢাবি

যে কারণে সিলেটে মহিলা কাউন্সিলর লাকীর ওপর হামলা

৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ও পানিবিহীন শাহজালাল বিমানবন্দর

সাত দিনের মধ্যে প্রথম কিস্তি পরিশোধের নির্দেশ

এ যেন খোঁড়াখুঁড়ির নগরী