সড়কে ঝরছে প্রাণ ছয় মাসে নিহত ২০০৭

শেষের পাতা

মরিয়ম চম্পা | ১৫ জুন ২০১৯, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৩৮
‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। বেশির ভাগ যানবাহনের পেছনের অংশে রংবেরং-এর হরফে লেখা  থাকে এ কথাটি। অথচ সে সকল যান বাহনই প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও তাজা প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে। বানাচ্ছে হাজারো পঙ্গু নাগরিক। এর সঙ্গে শেষ হয়ে যাচ্ছে হাজারো স্বপ্ন। তবে ভয়ঙ্কর তথ্য হলো- ঢাকা শহরে যত পঙ্গু ভিক্ষুক ও ভাসমান মানুষ পাওয়া যায় তার ৭০ ভাগই সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারানো বলে জানিয়েছে রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন নামের একটি সংস্থা। সংস্থাটির হিসাব মতে, চলতি বছরের গত তিন মাসে মোট সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১ হাজার ৪৯টি। এতে মারা গেছেন ১ হাজার ১৭৩ জন।
আহত হয়েছেন ১ হাজার ৯৯১ জন। ট্রেন দুর্ঘটনা ৪৭টি। এতে নিহত ৫০ ও আহত হয়েছেন ৮ জন।

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই)-এর প্রথম ৬ মাসের গবেষণায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১২ জুন পর্যন্ত সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৮শ ৫টি। এরমধ্যে ২ হাজার ৭ ব্যক্তি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ৩ হাজার ২শ ৭৯ জন।
সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের ৬২ শতাংশে যথাযথ সাইন-সংকেতের ব্যবস্থা নেই। জাতীয় মহাসড়কের অন্তত ১৫৪ কিলোমিটার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। আর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর হিসাবমতে, দেশে ৩৮ লাখ নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহন ৫ লাখের মতো। আর লাইসেন্সধারী চালক প্রায় ১৬ লাখ। বাকি সব যানবাহন ভুয়া চালক দিয়ে চলছে। অর্থাৎ ৪৭ শতাংশের বেশি চালকের লাইসেন্স নেই। সেই হিসেবে নিবন্ধিত যানবাহনের অর্ধেক চালকের লাইসেন্স নেই।

পরিবহন খাতে শৃঙ্খলার প্রধান তিন নিয়ামক হচ্ছে সড়ক, যানবাহন ও দক্ষ চালক। কিন্তু দেশে এর কোনোটিই ত্রুটিমুক্ত নয়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে অভিযোগ বিশেষজ্ঞদের। বিশেষজ্ঞদের মতে, অদক্ষ চালক আর অপরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় গড়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছেন ২০ জন। আর বছরে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এ জন্য তারা ফিটনেসবিহীন গাড়ি, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালক, সড়কে অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতাকে দায়ী করেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৬ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ২৪ হাজার ৯৫৪। পুলিশ সদর দফতরের তথ্যেমতে, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২২৬ জন। আহতের সংখ্যা ১২২। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৯৪টি। ফেব্রুয়ারিতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ১৯৯। আহত ১৫৭। মামলা হয়েছে ১৬১টি। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২ হাজার ৬৩৫ জন এবং আহত হয়েছে ১ হাজার ৯২০ জন। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জাতীয় ঐক্যের প্রকাশিত এক সড়ক বার্তায় বলা হয়, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ধরন ও মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। আহত-নিহতের সঠিক চিত্র পুলিশ রেকর্ডে উঠে আসে না। তবে শহরাঞ্চলে মোট নিহতের ৭০ শতাংশই পথচারী। সারা দেশে এ হার ৫৪ শতাংশ।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউট (এআরআই) ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত হওয়া দুর্ঘটনা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানায়, গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন করে মারা যায় সড়ক দুর্ঘটনায়। এই সময়ে আহত হয়েছে ৬২ হাজার ৪৮২ জন। এ দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। এমন তথ্য জানিয়েছে রোড সেইফটি ফাউন্ডেশন ও এআরআইর যৌথ গবেষণা। যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে সংঘটিত ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট ছিল। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে দুর্ঘটনা ঘটে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাসের দুর্ঘটনা ২৫ শতাংশ। কার, মাইক্রোবাস ১৫ শতাংশ। নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) বাংলাদেশের হিসাবে, গত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৩ হাজার ৩৬৭ জন। আহত হয়েছেন ১৯ হাজার ১৫৮ জন।

বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির (এনসিপিএসআরআর) নিয়মিত মাসিক জরিপ ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতীয় মহাসড়ক, আন্তজেলা সড়ক ও আঞ্চলিক সড়কসহ বিভিন্ন স্থানে এক হাজার ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত তিন হাজার ৩৯ জন আহত হয়েছেন। তাদের তথ্য অনুসারে, জানুয়ারিতে ৩৮৩টি দুর্ঘটনায় ৫৩ নারী ও ৭১ শিশুসহ ৪১১ জন নিহত এবং ৭২৫ জন আহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারিতে ৪০১টি দুর্ঘটনায় ৫৮ নারী ও ৬২ শিশুসহ ৪২৫ জন নিহত ও ৮৮৪ জন আহত হয়েছেন। মার্চে ৩৮৪টি দুর্ঘটনায় ৪৬ নারী ও ৮২ শিশুসহ ৩৮৬ জন নিহত ও ৮২০ জন আহত হয়েছেন এবং এপ্রিলে ৩২৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৮ নারী ও ৫৩ শিশুসহ ৩৪০ জন নিহত ও ৬১০ জন আহত হয়েছেন। সংস্থাটির তথ্য বিশ্লেষণে এসব সড়ক দুর্ঘটনার ১০টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।

এরমধ্যে রয়েছে- চালকদের প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, দৈনিক-চুক্তিতে চালক, কন্ডাক্টর বা সহকারীদের কাছে গাড়ি ভাড়া দেয়া, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক নিয়োগ, সড়কে চলাচলে পথচারীদের অসতর্কতা, বিধি লঙ্ঘন করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং, দীর্ঘক্ষণ বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো, ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি চলাচল বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, জনবহুল এলাকাসহ দূরপাল্লার সড়কে ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, সড়ক-মহাসড়কে মোটরসাইকেলসহ তিন চাকার যানবাহন চলাচল বৃদ্ধি এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি ইঞ্জিনচালিত ক্ষুদ্রযানে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সড়ক দুর্ঘটনার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম ১০টি দেশের একটি। তাই আগামী ১০ বছরের মধ্যে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে না পারলে সড়ক দুর্ঘটনা হবে দ্বিগুণ যা কোন মতেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। তাই প্রতিরোধে পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, আমরা একটি কথাই বারবার বলে থাকি যে সড়ক দুর্ঘটনায় যারা আহত বা নিহত হয় তাদের মধ্যে ৫১ শতাংশই হচ্ছে পরিবারের একমাত্র উপার্যনক্ষম ব্যক্তি। এই উপার্যনক্ষম ব্যক্তিটি যখন নিহত, আহত কিংবা হাসপাতালে ভর্তি থাকে তখন ওই পরিবারের উপর একটি অবর্ননীয় দুর্যোগ নেমে আসে।
বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ মানবজমিনকে বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপগুলো এখনো পুরোপুরি নেয়া হয়নি। সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের নের্তৃত্বে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের সিদ্ধান্তনুযায়ী সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে একটি সুপারিশমালা এবং কমিটি তৈরি করা হয়। এ বিষয়ে আমরা ইতোমধ্যে একটি সুপারিশ প্রদান করেছি। গত ২৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এটি আমরা হস্তান্তর করেছি।

এই সুপারিশ যদি বাস্তবায়ন করা হয় তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়কের শৃঙ্খলা দুটিই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
অপরাধ বিজ্ঞানী তৌহিদুল হক বলেন, দেশে সড়ক দুর্ঘটনাকে নতুন করে বলা উচিৎ সড়কে হত্যা। আমরা যেভাবেই বলিনা কেনো সড়কে হত্যা অথবা দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্কুলের শিক্ষার্থীরা যেভাবে আন্দোলন করেছে তখন আমরা অনেকেই নিশ্চিত হয়েছিলাম যে এবারের আন্দোলনের মধ্যোদিয়ে সরকার এবং সড়ক ব্যবস্থাপনা বা শৃঙ্খলার কাজে যারা জড়িত তারা হয়তো এখান থেকে কিছু শিখবে। এবং নতুন করে ব্যবস্থাপনা প্রক্রিয়া ঢেলে সাজাবে। এক্ষেত্রেও আমরা আশাহত হয়েছি। সড়কে হত্যা বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় আমাদের সামনে চলে আসে।

প্রথমত, সড়কের শৃঙ্খলা এবং ব্যবস্থাপনা অত্যান্ত দুর্বল। দক্ষিণ কোরিয়াতে একজন নাগরীক সড়কে কিভাবে চলবে সেটা তাদের স্কুল লেভেল থেকে শিখানো হয়। ফলে সে দেশে দুর্ঘটনার সংখ্যা কম। কারন সেখানে যাত্রী-চালক এবং এর সাথে জড়িতরা অনেক সচেতন। তৃত্বীয়ত, আমাদের এখানে দুর্ঘটনার পর মামলা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঘটনার কোনো বিচার হয়না। সর্বশেষ আমরা দেখেছি একটি বাস মালিক কোম্পানিকে হাইকোর্ট নির্দেশ দেয়ার পরেও কিন্তু ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে তারা নানা ধরনের গরিমসি করছে। মোটাদাগে বলতে গেলে আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত সড়কের শৃঙ্খলা বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন করে নিজেদেরকে বা সড়ককে না সাজাবো ততোক্ষণ সড়কে এই দুর্ঘটনা এবং হত্যা বাড়বেই।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

Rose

২০১৯-০৬-১৭ ০১:০৬:৪৪

আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী স্বীকার করে না । লেবার চালক মালিক রা আন্দোলন এ থাকে কিছু একটা হলে ভিতরে অনেক বড় নেতা হেফাজত করে । পাবলিক প্রাণ হারায় ।

আপনার মতামত দিন

রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হচ্ছে

ব্যবস্থা চান বিশিষ্টজনরা

কেলেঙ্কারি-জালিয়াতিতে ডুবছে ২২ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

ত্রাণ-আশ্রয়ের জন্য ছুটছে মানুষ

ডেঙ্গু রোগীদের ৮০ ভাগই শিশু

ঢাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

‘জনগণকে নিয়ে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে হবে’

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বিএসটিআই পরিচালকের অপসারণ দাবি

ছেলেধরা সন্দেহে তিন জনকে পিটিয়ে হত্যা

রংপুর-৩ সদর শূন্য আসন নিয়ে আলোচনার ঝড়

পশ্চিমবঙ্গেও চালু হলো এনআরসি!

পর্নোগ্রাফি ও ব্ল্যাকমেইল নেশা সিলেটের এহিয়ার

গণপিটুনিতে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হবে

রাঘববোয়ালদের নিয়ে কাজ করতে সমস্যা হয়

মাদ্রাসাছাত্রীকে ইজিবাইক থেকে নামিয়ে ধর্ষণের পর হত্যা

ভারতের কৌশল ধ্বংস করছে সার্ককে