‘হঠাৎ বস বাড়ি চলে যেতে বলেন’

শেষের পাতা

মানবজমিন ডেস্ক | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, রোববার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৩২
ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গার্মেন্ট শ্রমিক রাবেয়া জানুয়ারির শুরুতে ঢাকার রাজপথে আন্দোলন শুরু করেন। যেসব বাংলাদেশি কোম্পানি ইউরোপীয় জায়ান্ট এইচ এন্ড এমকে তৈরি পোশাক সরবরাহ করে, সেগুলোর মধ্যে রাবেয়ার কোম্পানি মুন রেডিওয়ার্স লিমিটেড অন্যতম। রাবেয়া জানান, ৯ই ফেব্রুয়ারি কোম্পানির দু’জন কর্মকর্তা তাকে দুপুরের খাবারের পর কষ্ট করে আর কাজে না আসার জন্য বলেন। এর কারণ হলো, তিনি সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি পাওয়ার দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছে, তাতে যোগ দিয়েছেন। যদিও তার এই অভিযোগ কোম্পানি কর্তৃপক্ষ প্রত্যাখ্যান করেছে। রাবেয়া বলেন, ‘আমাদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলাম। এটাই আমার একমাত্র অপরাধ। আমরা নিয়মিত কঠোর পরিশ্রম করি।
হঠাৎ একদিন, আমাদের ‘বস’ আসেন ও আমাদেরকে বাড়ি চলে যেতে বলেন।’

একটি শ্রমিক সংগঠনের তথ্য অনুসারে, সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনের পর ১১ হাজারেরও বেশি শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে তৈরি পোশাক শিল্পের ব্যাপক অবদান রয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে। আর মোট দেশীয় রপ্তানির ৮৩ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। পেনসিলভেনিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মার্ক অ্যানারের মতে, বিশ্বে তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক অন্যান্য প্রথম সারির দেশের তুলনায় বাংলাদেশে এই খাতে কর্মরত শ্রমিকদের বেতন সবচেয়ে কম। যদিও মিয়ানমার ও ইথিওপিয়ার মতো প্রান্তিক রপ্তানিকারক দেশে বাংলাদেশের চেয়েও কম বেতন দেয়ার রেকর্ড রয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার রিপোর্ট অনুসারে, বৈশ্বিকভাবে চীনের পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ। আর তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হার ৬ শতাংশ। এটি বিশ্বের মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের পাশাপাশি কম্বোডিয়াতেও তৈরি পোশাক খাতে একই হারে প্রবৃদ্ধি ঘটছে।

৩০শে ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়। কিন্তু শ্রমিকরা বলছেন, পোশাক কারখানাগুলো নতুন এই আইন মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পরে শ্রমিকরা আন্দোলন শুরু করলে মালিকপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কারখানায় ভাঙচুরের অভিযোগ করেছেন। পুলিশ ও কারখানা মালিকরা তিন সহস্রাধিক শ্রমিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ধসের পর এই অস্থিতিশীলতা বিদেশি ক্রেতাদের আরেকটি বড় ধরনের শ্রম-বিতর্কের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

মুন রেডিওয়ার্স এক দশক ধরে এইচ এন্ড এম-এর সঙ্গে ব্যবসা করছে। সাম্প্রতিক শ্রমিক আন্দোলনকে ঘিরে প্রতিষ্ঠানটি অবৈধ বা অপরাধমূলক কোনো কার্যক্রমের কথা প্রত্যাখ্যান করেছে। এইচ এন্ড এমের স্বত্বাধিকারী আনোয়ার কামাল পাশা বলেন, এটা ‘লেবার মাইগ্রেশন’। আমার কোম্পানির কিছু শ্রমিক যদি চাকরি হারায়, তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই অনিয়মের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। পাশা কোনো ব্যক্তির বিষয়ে উল্লেখ করেন নি। তার কোম্পানি নতুন মজুরি আইন মেনে চলছে বলেও জানান তিনি।

মুন রেডিওয়ার্সের চাকরি হারানো তিন জন শ্রমিকের সঙ্গে ব্লুমবার্গ কথা বলেছে। তাদের একজন আব্দুল মান্নান। তিনি কোয়ালিটি ইন্সপেক্টর হিসেবে ওই কোম্পানিতে কর্মরত ছিলেন। গত বুধবার তাকে ছাঁটাই করা হয়। আরেক শ্রমিক মোহাম্মদ রানাকে রাজপথে আন্দোলনের সময় ভাঙচুর চালানোর অভিযোগে পুলিশের দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জামিনে মুক্তি পেলেও তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তৃতীয় শ্রমিককে ছাঁটাইয়ের জন্য কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয়নি। ওই শ্রমিকের দাবি, কোম্পানির কাছে তার বেতন বকেয়া আছে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে পাশা তাতে সাড়া দেননি। ইউরোপীয় জায়ান্ট হেন্স এন্ড মরিতজ এবি, সংক্ষেপে এইচ এন্ড এম এক বিবৃতিতে বলেছে, তাদের জন্য পোশাক প্রস্তুতকারী ৩টি কারখানায় সম্প্রতি শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে। তারা পরিস্থিতি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুন্সি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, কারখানা মালিকদের অবশ্যই নতুন আইন অনুসরণ করতে হবে। তবে কয়েকটি কারখানা এই আইন অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এক্ষেত্রে কোনো কারখানার নাম উল্লেখ করেন নি তিনি। মন্ত্রী বলেন, কিছু কোম্পানি নতুন মজুরি আইন মেনে চলছে না। এ ছাড়া, যেসব আন্দোলনকারী ভাঙচুর চালিয়েছে, তাদের বিষয়ে তদন্ত করে দেখতে সরকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে নির্দেশনা দিয়েছে। তবে যারা শুধু মজুরি বৃদ্ধি চেয়েছে, সেসব নিরপরাধ শ্রমিকদের হয়রানি না করার বিষয়েও বলেছে সরকার।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া এন্ড সাউথ এশিয়া অ্যাট কন্ট্রোল রিস্কস এর সহযোগী পরিচালক প্রত্যুষ রাও বলেন, বাংলাদেশ সরকার লাখো শ্রমিক ও অর্থনীতিতে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠীর মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষার চেষ্টা করেছে। ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চাপের মুখে সরকার শ্রমিকদের মজুরি ৮ হাজার টাকায় উত্তীর্ণ করেছে। যা শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি করা মজুরি ১৬ হাজারের অর্ধেক। প্রত্যুষ রাও বলেন, তার মনে হয় না সরকার মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে পিছু হটবে। তৈরি পোশাক কারখানার ওপর কঠোর হওয়ার পরিবর্তে প্রশাসনের ভিন্ন দিকে মনোনিবেশ করার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার তৈরি পোশাক শিল্পকে সোনার ডিম পাড়া হাঁসের মতো মনে করে। এটি এমন একটি খাত যেটাকে নীতিমালার আওতায় নিয়ে আসা দরকার।

মার্ক অ্যানার মনে করেন, বাংলাদেশের বর্তমান যে অবস্থা, তাতে বিদেশি ক্রেতাদের অবশ্যই নজর দেয়া দরকার। স্থানীয় কারখানাগুলোকে অবশ্যই আইনের আওতায় নিয়ে  আসতে হবে। পাশাপাশি, মজুরি বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্য  বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরকে তাদের মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা করতে হবে।
(অরুণ দেবনাথ ও লায়ান মার্লোর লেখা নিবন্ধের ভাবানুবাদ)



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

শঙ্কামুক্ত ওবায়দুল কাদের

৩৫ রাউন্ড গুলি ও অস্ত্রসহ বিমানবন্দরে আ’লীগ নেতা আটক

মুফতি তাকি উসমানীর গাড়িবহরে গুলিবর্ষণ, নিহত ২

লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন ক্রিকেটার গৌতম গম্ভীর

বিয়ে করলেন মোস্তাফিজ

ছেলে-মেয়ের সংবর্ধনা একসঙ্গে আয়োজন করায় শিক্ষক খুন

আশার বীজে জল সঞ্চার করেছে তাদের রক্ত, আবেগময়ী ভাষণে ক্রাইস্টচার্চের ইমাম

পশ্চিমবঙ্গে দলছুট সবাইকে প্রার্থী করলো বিজেপি

ডাকসুর দায়িত্ব নেবেন নুর

বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে সুলতান মনসুরের শ্রদ্ধা

অল্পের জন্য রক্ষা পেলেন মেনন

ইতালিতে স্কুলবাস ছিনতাই করে আগুন, চালক গ্রেপ্তার

ফরিদপুরে অপহরনের তিনদিন পর ক্লিনিক ম্যানেজারের লাশ উদ্ধার

খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রিজভীর নেতৃত্বে বিক্ষোভ

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার হুমকি

বাস-মাহিন্দ্রা মুখোমুখি সংঘর্ষে শিক্ষার্থীসহ নিহত ৭