মানিকগঞ্জে দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ, তদন্তে কমিটি গঠন

শেষের পাতা

রিপন আনসারী/মতিউর রহমান, মানিকগঞ্জ থেকে | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, মঙ্গলবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:৫২
‘দুই পুলিশ অফিসার সেকেন্দার ও মাজহারুল প্রথমে নিজেরা ইয়াবা সেবন করার  পর আমাকেও তারা অস্ত্রের মুখে ইয়াবা সেবনে বাধ্য করে। এরপর ওরা দুজনে মিলে আমাকে ধর্ষণ করে। ডাকবাংলোতে এভাবে দুই রাত ও দিনে কয়েকবার আমার ওপর নির্যাতন চালানো হয়। হুমকি দেয়া হয় ধর্ষণের কথা কাউকে বলে দিলে মেরে লাশ গুম করা হবে।’ এমন এক লোমহর্ষক অভিযোগ উঠেছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থানার উপ-পুলিশ পরিদর্শক সেকেন্দার হোসেন ও এএসআই মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে। এই ঘটনাটি ধামা চাপা দেয়ার চেষ্টা করা হলেও শেষমেশ রক্ষা হয়নি। এ ব্যাপারে  মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপারের কাছে নির্যাতিতা তরুণী লিখিত অভিযোগ দেয়ার পর ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে সাটুরিয়া থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্তি করা হয়েছে। দোষী প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম। ইতিমধ্যে এডিশনাল এসপির নেতৃত্বে একটি প্রাথমিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে পুলিশ সুপার সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।


নির্যাতিতার খালা  আশুলিয়া থানার কাইছাবাড়ী এলাকার রহিমা বেগম জানান, উপ-পুলিশ পরিদর্শক সেকেন্দার হোসেন আশুলিয়া থানায় কর্মরত থাকার সময় তার কাছ থেকে ১ লাখ টাকা হাওলাদ নিয়ে জমি কিনেন। কথা ছিল জমি বিক্রির লাভ তাকে দেয়া হবে। সেই হিসাবে তিনি সেকেন্দার হোসেনের কাছে প্রায় তিন লাখ টাকা পাবেন। কিন্তু টাকা না দিয়ে ঘুরাতে থাকেন। সাটুরিয়া থানায় পোস্টিং নিয়ে আসার পরও সেকেন্দারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। বুধবার বিকালে প্রতিবেশী ভাগ্নিকে নিয়ে সাটুরিয়া থানায় আসেন। এরপর সেকেন্দারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সে টাকা দেবে বলে তাদের সাটুরিয়া ডাকবাংলোতে নিয়ে যান। সন্ধ্যার পর সাটুরিয়া থানার এএসআই মাজহারুল ইসলামকে ডাকবাংলোতে নিয়ে যায় সেকেন্দার। সেখানে দুই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন- আর কোনো দিন টাকার জন্য আসলে অসুবিধা হবে। এরপর ডাকবাংলোর একটি কক্ষে দুই পুলিশ কর্মকর্তা ইয়াবা সেবন করে ও তার সঙ্গে আসা ওই তরুণীকে জোর করে ইয়াবা সেবন করায়। দুই পুলিশ কর্মকর্তা ওই তরুণীকে ধর্ষণ করে। পরদিন বৃহস্পতিবার সাটুরিয়া থানার ওসি খবর পেয়ে ডাকবাংলোতে গিয়ে ঘটনা জানতে চান। দুই পুলিশের ভয়ে ওই সময় তারা ওসির কাছে শুধুমাত্র বলেছিলেন সেকেন্দারের কাছে তারা টাকা পাবেন। ওই সময় সেকেন্দার ওসিকে জানান, বিকালে টাকা দিয়ে দেবো। সেকেন্দারের কথামতো ডাকবাংলোতে অবস্থান করেন তারা। কিন্তু বিকালে টাকা না দিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকতে বলে। কথামতো সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকার পর দুই পুলিশ কর্মকর্তা এসে আবারো ইয়াবা সেবন করে এবং ওই তরুণীকে ধর্ষণ করে। শুক্রবার সকালে সেকেন্দার তাদের ৫ হাজার টাকা দিয়ে সাটুরিয়া থেকে চলে যেতে বলেন।

নির্যাতনের শিকার ওই তরুণী জানান, প্রতিবেশী খালার সঙ্গে তিনি সাটুরিয়া যান এক পুলিশের কাছে পাওনা টাকার জন্য। সাটুরিয়া ডাকবাংলোতে তাকে ও তার প্রতিবেশী খালাকে দুই রাত আটকিয়ে রাখে। রাতে  ডাকবাংলোতে সাটুরিয়া থানার পুলিশ সেকেন্দার ও মাজহারুল ইয়াবা সেবন করেন। তাকেও অস্ত্রের মুখে ইয়াবা সেবনে বাধ্য করে। এরপর তাকে দুই পুলিশ কর্মকর্তা ধর্ষণ করে। এভাবে আটকে রেখে তাকে দুই রাতে ও দিনে একাধিকবার ধর্ষণ করা হয়। এসময় ওই পুলিশ কর্মকর্তারা হুমকি দেন ধর্ষণের কথা কাউকে বললে মেরে লাশ গুম করা হবে। শুক্রবার ছাড়া পাওয়ার পর তিনি খালার সঙ্গে বাড়ি চলে যান। এরপর বিষয়টি তারা আশুলিয়া ও সাভারের পরিচিত সাংবাদিকদের জানান। এরপর রোববার মানিকগঞ্জ পুলিশ সুপারের কাছে ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন।

অভিযুক্ত উপ-পুলিশ পরিদর্শক সেকেন্দার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, রহিমা বেগম তার কাছে পাওনা টাকার জন্য সাটুরিয়া এসেছিলেন। রহিমাকে কিছু টাকাও তিনি দিয়েছেন। পুলিশ লাইনে তাকে কেন প্রত্যাহার করা হয়েছে- এমন  প্রশ্নের  জবাবে তিনি বলেন, কি কারণে তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে তা তিনি জানেন না। এক তরুণীকে আটকে রেখে ধর্ষণ ও ইয়াবা সেবন প্রসঙ্গে তিনি জানান, তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য নয়।

সাটুরিয়া অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম জানান, বৃহস্পতিবার সাটুরিয়া ডাকবাংলোতে ওই নারীকে উপ-পুলিশ পরিদর্শক সেকেন্দার হোসেনের সঙ্গে  পাওনা টাকা নিয়ে  উচ্চবাচ্য কথা বলতে দেখা গেছে। বিষয়টি সেকেন্দারকে দ্রুত মিটিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছিল। ওই সময় অভিযোগকারী তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে কোনো অভিযোগ দেয়নি কেউ। শনিবার রাতে পুলিশ সুপার অভিযুক্ত দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে  সাটুরিয়া থানা থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্তি করেছেন। পরে জানা গেছে, এক তরুণীকে আটকে রেখে দুই পুলিশের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ দিয়েছে পুলিশ সুপারের কাছে।

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার রিফাত রহমান শামীম সাংবাদিকদের জানান, সাটুরিয়া থানার পুলিশের দুই অফিসারের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এসেছে সে ব্যাপারে জেলা পুলিশের অবস্থান একদম পরিষ্কার। এ ঘটনায় এডিশনাল এসপির নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন আমরা হাতে পাবো। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে তাদের কোনো প্রকার ছাড় দেয়া হবে না। ইতিমধ্যে তাদেরকে প্রত্যাহার করে পুলিশ লাইনে সংযুক্তি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শতভাগ ন্যায় বিচার আমরা নিশ্চিত করবো।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পাঠকের মতামত

**মন্তব্য সমূহ পাঠকের একান্ত ব্যক্তিগত। এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন।

আনিস উল হক

২০১৯-০২-১১ ১১:৩০:৩৩

গ্রিক দেবতা হারকিউলিস এখন কি করবেন?

আপনার মতামত দিন