সাংবাদিকের ডায়েরি

কর্তৃত্ববাদের বিস্তারে সংকুচিত মানবাধিকার

দেশ বিদেশ

হাসান ইমাম, ব্লগ, ডয়চে ভেলে | ১২ জানুয়ারি ২০১৯, শনিবার
২০১৮ সালটি শুরু হয়েছিল বিশ্ব রাজনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে। জানুয়ারিতে চিরবৈরী উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে সমপ্রীতির আবহ তৈরি হয়। এই বন্ধুপ্রতিম প্রবণতা দেশ দুটি অব্যাহত রাখে সারা বছর।
আর গত ১২ই জুন সিঙ্গাপুরে মুখোমুখি আলোচনার টেবিলে বসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন, যা ছিল বিশ্ববাসীর জন্য চমক। তবে একে অপরের চক্ষুশূল এই দুই দেশের মোলাকাত তেমন কোনো ফল বয়ে আনেনি। তা সত্ত্বেও এই বৈঠক গত বছরের অন্যতম ইতিবাচক ঘটনা। এর মাধ্যমে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে চরম সংকট কিছুটা হলেও প্রশমিত হয়েছে।
তবে মার্চের শুরুতে ইতালিতে উগ্র ডানপন্থিদের বিপুল বিজয় শরণার্থী-অভিবাসী সমপ্রদায়সহ মহাদেশীয় উদার গণতন্ত্রীদের মধ্যে আশঙ্কার জন্ম দেয়। রাশিয়ায় মার্চে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুতিন আরেক দফা নির্বাচিত হন। একই মাসে চীনের শি জিনপিং সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করে নেন।
মে মাসের শুরুতে ট্রাম্প আরো বড় খবরের জন্ম দেন ইরানের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে। এটি ছিল তার অ্যামেরিকা ফার্স্ট নীতির প্রতিফলন। একই মাসে ইসরায়েলের মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে নেয়া হয় জেরুজালেমে। এর ফলে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল বিরোধ আরো তীব্রতা পায় এবং ট্রাম্প যথারীতি সেদিক থেকে চোখ ফিরিয়ে রাখেন।
বছরভর যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্যবিরোধ জিইয়ে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি নুতন করে ঝুঁকির মুখে পড়ে। একুশ শতকের শুরুতেই বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান অর্থনীতি হিসেবে চীনের উত্থান ঘটলেও বিদায়ী বছরে দেশটি হয়ে উঠল যুক্তরাষ্ট্রের এক নম্বর প্রতিপক্ষ। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য রাশিয়ার চেয়েও বড় শত্রু চীন।’ যদিও রুশ-মার্কিন বৈরিতা ব্রিটেনে রুশ নাগরিক সের্গেই স্ক্রিপালের নার্ভ গ্যাস হামলার শিকার হওয়ার জেরে আরো প্রকট হয়। সের্গেই যুক্তরাজ্যে নিজের দেশের তথ্য পাচার করতেন বলে অভিযোগ। তাকে হত্যাচেষ্টার পর পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে রাশিয়ার কূটনৈতিক যুদ্ধ শুরু হয়। সামপ্রতিক সময়ে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিকে যেভাবে বিদ্যমান অবস্থার বিপরীতে নিয়ে গেছেন, তাতে গোটা পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। জাতীয় স্বার্থের কথা বলে জাতিসংঘের ‘জলবায়ু চুক্তি’ থেকে এরই মধ্যে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। অথচ বলা হচ্ছে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাতে ব্যর্থ হলে বিপদ থেকে রেহাই পাবে না কেউই। এরই মধ্যে গত বছর ইউরোপের খরা থেকে শুরু করে অ্যামেরিকার দাবানল, এশিয়ার প্রবল বৃষ্টিপাত ইত্যাদি চরম আবহাওয়ার জোরালো আলামত দিয়ে গেছে। জাতিসংঘের ইন্টারগভার্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-র বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রিতে সীমিত রাখতে না পারলে বিপর্যয় অনিবার্য।
জাতীয় স্বার্থের জিগির তুলে ট্রাম্প বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন বিশ্বকে, তার পালে জাতীয়তাবাদী হাওয়া, কেন্দ্রে অভিবাসনবিরোধী প্রবণতা। আর এই জাতীয়তাবাদী প্রবণতার মূলে রয়েছে বর্ণবাদ। ট্রাম্প তো বলেও দিয়েছেন, অভিবাসনে তার আপত্তি নেই, কিন্তু আফ্রিকা বা ক্যারিবীয় দেশগুলো থেকে কাউকে চান না। তার পছন্দ নরওয়ের মতো দেশ, যেখানকার ৯৪ শতাংশ মানুষ শ্বেতাঙ্গ। আফ্রিকার কয়েকটি দেশকে ট্রাম্পের ‘শিটহোল কান্ট্রিজ’ বলার বিষয়টি কেউ বিস্মৃত হয়নি।
ইউরোপেও বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাজ্য অভিবাসীদের প্রবেশ ঠেকাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে বেরিয়ে যেতে চাইছে। যদিও গত ৭ই জুলাই ঘোষিত ‘ব্রেক্সিট্থ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে।
অস্ট্রিয়া, ফ্রান্স, হাঙ্গেরি, এমনকি ‘উদারনৈতিক্থ সুইডেনেও বর্ণবাদী প্রবণতা মাথা চাড়া দিচ্ছে। বর্ণবাদী জাতীয়তাবাদের সমান্তরালে উত্থান ঘটছে কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বেরও। কেবল ইউরোপ বা উত্তর অ্যামেরিকা নয়, কর্তৃত্ববাদী শাসকদের কবলে এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন অ্যামেরিকার অনেক দেশও। ইউরোপে বর্ণবাদ রাজনীতির ‘ট্রাম্পকার্ড’ হলে বাদবাকি বিশ্বে ক্ষমতা দখলের ‘হাতিয়ার’ হলো ধর্ম, ধর্মের নামে বিভক্তি। মিয়ানমারেও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রে ধর্মীয় ও সামপ্রদায়িক বিভক্তি, যার পরিণতি রোহিঙ্গা সংকট। এক অর্থে, গত বছর কর্তৃত্ববাদের বিস্তারে দেশে দেশে গণতন্ত্র কোণঠাসা হয়ে পড়ে। তবে মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাকের পতন, মালদ্বীপে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে হটানোও সম্ভব হয়েছে জনতার সম্মিলিত আন্দোলনে।
গত অক্টোবরে তুরস্কে সৌদি দূতাবাসের ভেতর নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সাংবাদিক জামাল খাশোগজি। প্রথমদিকে সৌদি সরকার এ কথা অস্বীকার করলেও পরে কবুল করতে বাধ্য হয়। তবে দেশটি এখনো পরিষ্কার করেনি কার নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড।
ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে)-এর হিসেবে, ২০১৮ সালে সারা বিশ্বে খাশগজির মতো ৯৪ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। ২০১৭ সালে এই সংখ্যা ছিল ৮২।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসেবে বাংলাদেশে গত বছর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হন চার শতাধিক মানুষ। এছাড়া নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় ‘গুজব’ ছড়ানোর অভিযোগে আটক হন খ্যাতিমান আলোকচিত্রী শহিদুল আলম। ১০৮ দিন পর কারাগার থেকে জামিনে বের হওয়া শহিদুলকে টাইম সাময়িকী ২০১৮ সালের আলোচিত চরিত্র ‘দ্য গার্ডিয়ান্স অ্যান্ড দ্য ওয়ার অন ট্রুথ’ তালিকায় স্থান দিয়েছে।
গত বছর মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে সমর্থ হলেও ‘স্বৈরতান্ত্রিক দেশ’-এর তালিকায়ও ঢুকে পড়ে বাংলাদেশ। বিশ্বের ১২৯টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে গবেষণা করে জার্মান গবেষণা সংস্থা ব্যার্টেল্‌সমান ফাউন্ডেশন এক প্রতিবেদনে ৫৮টি দেশকে স্বৈরতন্ত্রের অধীন এবং ৭১টি দেশকে গণতান্ত্রিক বলে উল্লেখ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ‘ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স ২০১৮্থ সূচকে নিচে নেমে যাওয়া ১৩টি দেশের মধ্যে ৫টি দেশ আর গণতন্ত্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্যও ধারণ করে না। তাদের মতে, ওই ৫টি দেশ হলো বাংলাদেশ, লেবানন, মোজাম্বিক, নিকারাগুয়া ও উগান্ডা।
গবেষণা সংস্থাটির এই মূল্যায়নের ভিত্তি ১২৯টি দেশের গণতন্ত্র, বাজার অর্থনীতি এবং সুশাসনের অবস্থা নিয়ে করা সমীক্ষা। এই সমীক্ষার ভিত্তিতে তৈরি করা সূচকে বাংলাদেশের সঙ্গে ৮০ নম্বরে অবস্থান করছে রাশিয়াও।
রিপোর্টার উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) গত বছরের গোড়ায় বলেছিল, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নে মাত্র ৯ শতাংশ দেশের অবস্থা ‘ভালো্থ এবং ‘মোটামুটি ভালো’ ১৭ শতাংশ দেশ। অর্থাৎ বাকি ৭৪ শতাংশ দেশের অবস্থা খারাপ, এর মধ্যে ১২ শতাংশ দেশের পরিস্থিতি ‘ভয়াবহ’।
দেশে দেশে গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের দিকে নজর রাখা ফ্রিডম হাউস হিসাব কষে বলছে, বিশ্বের মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ ‘মুক্ত গণমাধ্যমের’ দেশে বাস করে। আর গণমাধ্যম ‘মুক্ত নয়’ এমন দেশে বসবাসকারী মানুষ ৪৫ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বৈশ্বিকভাবে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, তথা বাকস্বাধীনতা হরণের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়ন এবং সেগুলোর যথেচ্ছ ব্যবহার। এ পটভূমিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আচরণকে প্রমাণ হিসেবে হাজির করা যেতে পারে। তার ভাষায়, ‘গণশত্রু’ গণমাধ্যম ‘ফেক নিউজ’ প্রচার করে। ট্রাম্পের মতো একই মানসিকতার শাসকের অভাব নেই বিশ্বে। রাশিয়ার পুতিন, তুরস্কের এর্দোয়ান, ফিলিপাইন্সের দুতার্তে, মিসরের জেনারেল সিসি, চেক প্রজাতন্ত্রের জিমান প্রমুখ ‘উজ্জ্বল’ উদাহরণ।
অর্থাৎ ক্রমাগতভাবে দৃশ্যত গণতান্ত্রিক, কিন্তু কার্যত কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার ঘটছে বিশ্বে। তুরস্ক থেকে রাশিয়া, ভিয়েতনাম থেকে বলিভিয়া্ত যেখানেই জনগণের কণ্ঠরোধী শাসনের বিস্তার ঘটছে, সেখানেই ক্ষমতাসীনরা সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে, ভিন্নমতের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত।
গত ১০ই ডিসেম্বর জাতিসংঘ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৭০ বছর পূর্ণ হলো। অথচ ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অধিকারের নিশ্চয়তার বিষয়টি এখনো হুমকির মুখে। দেশে দেশে চলছে গণহত্যা, জাতিগত নিধনযজ্ঞ। মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনী ও সংঘবদ্ধ বৌদ্ধ অধিবাসীদের অভিযান এর চরমতম দৃষ্টান্ত। মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া ও ইয়েমেনের মতো দেশগুলোতে ধুঁকছে মানবতা। দুর্ভিক্ষের কবলে লাখ লাখ মানুষ। কেড়ে নেয়া হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ভূমির অধিকার। একই ভাগ্য বরণ করছে ভারতের কাশ্মীরের অধিবাসীরাও। সমপ্রতি এ তালিকায় যোগ হয়েছে চীনের উইঘুর জাতিগোষ্ঠী।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ঐক্যফ্রন্ট না টেকারই কথা: কাদের

মামলা করে অখ্যাত ভারতীয় কোম্পানির ক্যাপসুল কিনতে বাধ্য করা হয়েছে: স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

প্রার্থী বাছাইয়ে সতর্ক আওয়ামী লীগ

ঐক্যফ্রন্ট প্রশ্নে বিএনপির কৌশল কী?

লেডি বাইকারদের ছুটে চলা

ভোলা গ্রাম টু গুলশান

গুলিবিদ্ধ লাশ গলায় চিরকুট আমি ধর্ষণের হোতা

এরশাদের অনুপস্থিতিতে চেয়ারম্যান জিএম কাদের

আওয়ামী লীগকে মানুষ চিরদিনের জন্য দূরে ঠেলে দিয়েছে

মুহিতের পাশে কেউ নেই

সৌদি আরবের বন্দিশালায় রোহিঙ্গাদের অনশন

মন্ত্রীর সংবর্ধনা, স্বর্ণের নৌকা নিয়ে এলেন পৌরমেয়র

অভিনেতা সুমনের লাশ উদ্ধার

দাম বেড়েছে রসুন ডাল ডিম ছোলার

সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক পর্যটন রুটে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

চট্টগ্রাম থেকে মনোনয়ন পেতে পারেন ৩ নারী, ফরম নিলেন ৬৮ জন