সেলফি যুগে হারিয়ে যাওয়ার পথে স্টুডিও

শেষের পাতা

মরিয়ম চম্পা | ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ২:১৬
কত সাজগোজ। সুন্দর কাপড়। আয়নায় নিজেকে বারবার দেখা। স্টুডিওর এমন দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না। ছবি কিংবা ভিডিও দুটিই এখন করছে হাতের মোবাইল ফোন। এখন হাঁটা-চলা, আচার-অনুষ্ঠান সবই ধারণ করা হয় মোবাইল ফোনে। সেলফিতে। আর এভাবেই হারিয়ে গেছে এক সময়কার স্টুডিও।
নিজ হাতেই যখন স্টুডিও তখন আর কে যায় দূরের আনুষ্ঠানিক স্টুডিওতে। তাইতো রিকশায় কিংবা রাস্তায়, ঘরের বারান্দায় অথবা ছাদে, বিপণি বিতান, পাবলিক বাস, বিয়ে সাদি, জন্মদিন, মৃত্যুবার্ষিকী কোনো কিছুই বাদ যায় না সেলফি থেকে। প্রযুক্তির এই যুগে প্রত্যেকের হাতে স্মার্ট ফোন মানেই এক একটি ডিএসএলার ক্যামেরা। এ দলে যোগ দিয়েছেন শুধু তরুণ-তরুণীই নয়, সব বয়সের মানুষ। আবার কেউ কেউ বিশাল লেন্সের ডিজিটাল ক্যামেরা সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে এখনকার জেনারেশন।

হাজার হাজার ছবি তুলছে তারা। তাদের প্রয়োজন পড়ছে না স্টুডিও বা ল্যাবে যাওয়ার। বাংলাদেশে একটা সময় সব মহলেই বিভিন্ন ফটো স্টুডিওতে গিয়ে ছবি তোলার চল ছিল। পরিবার, বন্ধু কিংবা সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা সেসব ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে থাকতো নানা ধরনের প্রাকৃতিক দৃশ্য। স্টুডিওর দেয়ালে আঁকা সেসব দৃশ্যে শোভা পেতো ফুল লতা পাতা। কিন্তু এখন যেন সে সবই অতীত।

ফার্মগেটের স্টুডিও ড্রিমের কর্মচারী মো. ফজল বলেন, এক যুগ আগেও স্টুডিও ব্যবসা ছিল রমরমা। ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। বর্তমানে স্টুডিও ব্যবসা ৪ ভাগের ১ ভাগে নেমে এসেছে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধন। কারণ এখন সবাই নিজেদের ইচ্ছামতো ফোনে ছবি তুলে অল্প কিছু ছবি ল্যাবে বা স্থানীয় কম্পিউটারের দোকানে গিয়ে প্রিন্ট করে নেয়। স্টুডিওতে আসে হাতে গোনা কিছু সংখ্যক ব্যক্তি। বিশেষ করে বিদেশ বা অফিস আদালত ও স্কুল কলেজে ভর্তির জন্য ছবি তুলতে আসেন তারা। ফার্মগেটে আগে পাশাপাশি প্রায় ১০ থেকে ১২টা স্টুডিও ছিল।

এখন আছে মাত্র ৫ থেকে ৬টা। আমাদের স্টুডিও বন্ধ হওয়ার পথে। এখন শেয়ারে প্লট ভাড়া নিয়ে ব্যবসা চালাতে হচ্ছে। এভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কতদিন চলবে তাও বলা যাচ্ছে না। ব্যবসার অবস্থা এতটাই খারাপ যাচ্ছে যে দুজন কর্মচারীকে মালিক মাত্র ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৪ থেকে ৫শ’ টাকার কাজ হয়। রমজান মাস থেকে শুরু করে ভর্তি পরীক্ষা পর্যন্ত দৈনিক ২ থেকে আড়াই হাজার টাকার কাজ হয়। একটা সময় ছিল যখন প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার কাজ হতো। এখন যেন সবই অতীত।

ফার্মগেটের ডিজিটাল কালার ল্যাবের স্বত্বাধিকার নোমান মুন্সি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের দিকে স্টুডিওর বাজার ছিল খুবই জমজমাট। তখন আমরা ছোট থাকলেও বাবাকে দেখতাম স্টুডিও থেকে বের হওয়ার সময় পেতেন না। সে সময় কম করে হলেও দৈনিক ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকার কাজ হতো। এখন সেটা ৩ থেকে ৫ হাজারে নেমে আসছে। কারণ আগে মানুষ জন্মদিন থেকে শুরু করে যে কোনো অনুষ্ঠানেই ল্যাবে চলে আসতো। এমনকি ল্যাব থেকে ক্যামেরা ভাড়া নিতেন। এখন মানুষ বাসায়, রাস্তায়, পথে ঘাটে যেখানে ইচ্ছা খেয়াল খুশি মতো মুঠো ফোনে ছবি তোলে।

তাছাড়া এখন আর মানুষ ল্যাবে ছবি প্রিন্ট করার প্রয়োজন মনে করে না। ফার্মগেটে কোনো এক সময় ৯ থেকে ১০টা ল্যাব ছিল। এখন আছে মাত্র দুই থেকে তিনটা। পাশাপাশি প্রিন্টার মেশিন সহজলভ্য হওয়ায় মহল্লায় মহল্লায় দোকান খুলে বসেছে অনেকেই। মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় ছবির কাজ প্রিন্টারের দোকানগুলোতে সেরে নেয়।
জনতা স্টুডিও কালার ল্যাবের কর্মচারী ইমদাদ বাদশা বলেন, স্টুডিও ব্যবসার উত্থান-পতন দুটোই দেখেছি। আগে এমন একটা সময় ছিল যখন গলা থেকে ক্যামেরা নামানোর সময় সুযোগ কোনোটাই পেতাম না।

তখন দৈনিক ১ থেকে দেড়শটি স্ন্যাপ নিতে হতো। এখন ১০ থেকে ২০টি স্ন্যাপে নেমে এসেছে। আগে প্রতিদিন যেখানে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকার কাজ হতো এখন সেখানে মাত্র ৪ থেকে ৫ হাজার টাকার কাজ হয়। আগে পুরো মার্কেটিই ছিল স্টুডিও ল্যাব। এখন হাতে গোনা ২ থেকে ৩টি স্টুডিও আছে। ল্যাব আছে মাত্র একটি। তিনি বলেন, এ ব্যবসা আগের মতো আর জমজমাট হবে না। বরং যতদিন যাবে ততো কমতে থাকবে। আগে ক্যামেরার রিল কিনে কুল কিনারা পাওয়া যেত না। এখন সারাদিন ১০ থেকে ১৫টি ছবি তোলা যায় না। স্টুডিওতে ছবি তুললেও অনেকে সঙ্গে পেন ড্রাইভে বা মেমোরি কার্ডে নিয়ে যাচ্ছেন সেই ছবি। নিজেদের পছন্দ মতো এডিট করে নিচ্ছেন। বিষয়টিকে একদিকে যেমন ডিজিটাল ফটোগ্রাফির সুবিধা বলে মনে করছেন অনেকে। অন্যদিকে অনেকেই বলছেন, এতে ছবির মানের বেশ ফারাক ঘটছে।
পান্থপথের উর্বশি স্টুডিওর কর্মচারী সোহাগ বলেন, এখন তো কেউ আর ফুল ছবি তোলে না। ফোনেই সবাই ছবি তুলে জমা রাখে। অতিরিক্ত ছবি বিলাসিরা মাঝে মধ্যে দুই চারটা ছবি স্টুডিও ল্যাব থেকে প্রিন্ট করে নেয়।

অথচ আগে স্টুডিও চলতো ফুল ছবির কারণে। এখন সারা বছর জুড়ে ৩০ থেকে ৪০টি ফুল সাইজের ছবি তোলে মানুষ জন। এখন বলতে গেলে আমাদের ক্যামেরার রিলে জং ধরতে বসেছে। একটা সময় স্টুডিও নামটি নতুন প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পে পরিণত হবে। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও পাড়ার মোড়ে মোড়ে বিভিন্ন ফটোকপির দোকানগুলোতে প্রিন্টিং মেশিন থাকায় কেউ স্টুডিওতে আসতে চায় না। তাছাড়া ফটোকপির দোকানগুলোতে ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে ১ পেজে ২০টি ছবি একসঙ্গে প্রিন্ট দিয়ে বিক্রি করে। মানের দিক থেকে যেগুলো খুবই খারাপ।

অথচ কাস্টমাররা সেটা বুঝতে চায় না। তারা আমাদের স্টুডিওতে এসে যখন ৬ কপি ছবির দাম ১২০ টাকা শোনেন তখন তারা অনেকটা বিরক্তি নিয়ে চলে যায়। তাছাড়া এখন অনেকের বাসায় প্রিন্টার রয়েছে। তারা নিজেদের প্রয়োজনমতো ছবি প্রিন্ট দিয়ে নিতে পারে। সার্বিক দিক বিবেচনা করে বলা যায় ভবিষ্যতে স্টুডিও ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে। ব্যবসার অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে। কেউ কেউ এরইমধ্যে ফটো স্টুডিও গুটিয়ে অন্য ব্যবসায় নেমেছেন।

কেউ কেউ বলেছেন, এই কাজটিই শখ করে শিখেছিলেন। তাই নানা অনিশ্চয়তা আর টানাপড়েন নিয়েও ছাড়তে পারছেন না। কিন্তু ভবিষ্যতের দিনগুলোর বিষয়েও খুব একটা আশাবাদীও হতে পারছেন না তারা। সাদাকালো ছবির সময় শেষ হয়েছে আগেই। এখন আর কারও বাসায় মা-বাবা কিংবা পরিবারের বর্ষীয়ান সদস্যদের বাঁধানো ছবি খুব একটা চোখে পড়ে না। সবাই তো মোবাইল, কম্পিউটারে আপলোড করে রাখে। কিন্তু সেই ছবির যে আবেগ ও প্রাণ ছিল এখনকার ছবির মধ্যে তা কি খুঁজে পাওয়া যায়?



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

ফের দায়িত্বহীন ব্যাটিংয়ে হারলো বাংলাদেশ

খালেদা জিয়ার সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎ

কসবায় ট্রেন লাইনচ্যুত, বন্ধ ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলযোগাযোগ

পরাজয়ের বৃত্তে বাংলাদেশ

শোকে মাতমে তাজিয়া মিছিল

নাঙ্গলকোটে বৈদ্যুতিক তার ছিড়ে পড়ে চারজন নিহত

বইটি তিনি এসময় প্রকাশ না করলেও পারতেন

দেশবাসীর প্রতি অঙ্গীকার ঘোষণা আসছে শনিবারের সমাবেশে

‘বঙ্গভবনে পৌছে দেখলাম...’

‘ভুয়া প্রার্থী তালিকা প্রকাশে ইন্ধন দিচ্ছে সরকারী এজেন্সিগুলো’

আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে তিনজন গুলিবিদ্ধ

খালেদার অনুপস্থিতিতে বিচার কাজ বেআইনি : ফখরুল

জাতিসংঘের অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকা ছাড়লেন প্রধানমন্ত্রী

বেনাপোল সীমান্ত থেকে বিপুল পরিমান অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য উদ্ধার

‘শুরু থেকেই চাপ ছিল, আমি যেন বলি অসুস্থ’

চট্টগ্রাম সরকারি কলেজ প্রকাশ্যে অস্ত্রধারী সেই ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার