প্রতীকী অনশনেও ধরপাকড় গ্রেপ্তার শতাধিক

প্রথম পাতা

স্টাফ রিপোর্টার | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৭:৩৪
খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবি এবং কারাঅভ্যন্তরে আদালত স্থাপনের প্রতিবাদে রাজধানীসহ সারা দেশে মহানগর ও জেলা সদরে দুই ঘণ্টার প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি। গতকাল সকাল ১০টা থেকে বেলা  ১২টা পর্যন্ত সারা দেশে একযোগে এ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি ও অঙ্গ দলের নেতাকর্মীরা। কর্মসূচিতে ২০দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীরাও অংশ নেন।

প্রতীকী অনশন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পুলিশি ধরপাকড়ের শিকার হয়েছেন বিএনপি ও অঙ্গ দলের নেতাকর্মীরা। বিএনপি দাবি করেছে, রাজধানীসহ সারা দেশে তাদের দেড় শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শুধু ঢাকাতেই ১০২ বিএনপি নেতা-কর্মী গ্রেপ্তারের তথ্য পাওয়া গেছে। দলের কেন্দ্রীয় কর্মসূচি পালিত হয় রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন প্রাঙ্গণে। স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে কর্মসূচিতে কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর বিএনপি সহ অঙ্গ সংগঠনের কয়েক হাজার নেতাকর্মী অংশ নেয়।

বেলা ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পানি পান করিয়ে অনশন ভঙ্গ করান।
এ সময় প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদ ব?লেন, ১৯৭১ সালে যে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সেই গণতন্ত্র আজ ভুলুণ্ঠিত। এর থে?কে উত্তরণের পথ আগামী জাতীয় নির্বাচন, যে নির্বাচন হ?তে হ?বে নিরপেক্ষ সরকা?রের অধী?নে। কারণ, আমরা আইনের শাসন, মানবাধিকার, মৌ?লিক অধিকার, গণতন্ত্র হারিয়েছি- খালেদা জিয়ার মু?ক্তি ও ভবিষ্যতে সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচ?নের মাধ্যমে এসব ফি?রে পে?তে চাই।

দলের কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও অংশগ্রহণ ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেয়া হবে না বলে অনশন কর্মসূচি থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আজকে সারা দেশে জনগণ ও বিভিন্ন দলের মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে- আগামী নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। আজকে আমাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলো বলছে বাংলাদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে হবে। আমরা বলতে চাই, দেশনেত্রী ও বিএনপিকে ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন এদেশে হতে পারে না, হতে দেয়া হবে না।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির মতো নির্বাচনের পুনরাবৃত্তিও আর এদেশে হবে না। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করেই আমরা আগামী নির্বাচন করবো। নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের দাবির কথা তুলে ধরে ড. মোশাররফ বলেন, দেশের মানুষ ঐকমত্য হয়েছে, আগামী নির্বাচনে তফসিল ঘোষণার আগে সংসদ ভেঙে দিতে হবে। শেখ হাসিনাকে পদত্যাগ করতে হবে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। নির্বাচনের সময়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে। ড. মোশাররফ বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে অত্যন্ত অসুস্থ। আমরা দাবি করছি, অনতিবিলম্বে তাকে তার পছন্দমতো একটি বিশেষায়িত হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে কোনো ধরনের বিচারের আওতায় আনা যায় না। তাই তার আশু সুস্থতা প্রয়োজন, তার সুচিকিৎসা প্রয়োজন। অবিলম্বে তাকে হাসপাতালে নিন। তিনি বলেন, আজকে গণতন্ত্র আওয়ামী লীগের বাক্সে বন্দি। দেশের জনগণ, বিএনপি, ২০ দল, তার বাইরেও অনেক রাজনৈতিক দল সকলে ঐকমত্য হয়েছে, এখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে হবে। ভোটের অধিকার ফিরিয়ে আনতে হবে। তার জন্য প্রথম প্রয়োজন গণতন্ত্রের মুক্তি।

খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া গণতন্ত্র মুক্ত হবে না। সরকার একটি অবৈধ ও মিথ্যা মামলায় তাকে কারাগারে নিয়েছে। আমরা অনতিবিলম্বে তার মুক্তি দাবি করছি। এই অনশন কর্মসূচি থেকে আমরা আহ্বান জানাতে চাই, দেশের জনগণ ও সকল দল যারা এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাদের সকলকে জাতীয় ঐক্যে একত্রিত হয়ে আগামী দিনে আন্দোলনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি নিন। নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা দায়ের ও নির্যাতনে ক্ষোভ প্রকাশ করে ড. মোশাররফ বলেন, আমরা সরকারকে বলতে চাই- আপনাদের সময় শেষ। পুলিশ বাহিনীকে বলছি, এভাবে গণগ্রেপ্তার করে নির্যাতন চালাবেন না। আপনারা প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী, আওয়ামী লীগের কর্মকর্তা-কর্মচারী নন। আমি দেশের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে জনপ্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন সবার প্রতি আহ্বান জানাই- আপনারা আওয়ামী লীগের নির্দেশিত পথে আর নির্যাতন করবেন না। এসব বন্ধ করুন। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী হিসেবে কাজ করুন, দলীয় হিসেবে কাজ করবেন না।

দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানিয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, উচ্চতম আদালত জামিন দেয়ার পরেও নিম্ন আদালতের ম্যাজিস্ট্রেটরা সরকারের ইন্ধনে ও প্রভাবে খালেদা জিয়ার জামিন বিলম্বিত করেছে। বিষয়টি স্পষ্ট যে, খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পাক সেটা সরকার চায় না। ফলে আইনি প্রক্রিয়ায় তার মুক্তি আর সম্ভবপর নয় বলে আমি মনে করি। তার মুক্তির একমাত্র পথ, রাজপথ। এই রাজপথের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করে আনতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের যে আন্দোলন চলছে এই আন্দোলন আরো বেগবান হবে। এই আন্দোলন চূড়ান্ত পর্যায়ে যাবে যেদিন এই সরকারের পতন আসবে। এমন কর্মসূচি দেয়া হবে যে, কর্মসূচির মাধ্যমে এই সরকারের নৌকা পানিতে ভেসে যাবে। আর আছে মাত্র মাসখানেক সময়। এ সময়ের মধ্যে প্রস্তুতি নিতে হবে। যাতে এবার রাস্তায় নামলে আন্দোলন সফল না হওয়া পর্যন্ত কেউ বাড়িতে ফিরে না যায়। আজকের অনশন থেকে আমি এ আহ্বান জানাই। মওদুদ বলেন, আমরা বলেছিলাম- দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার নির্জন কারাবাস সংবিধান পরিপন্থি। উনাকে একটি পরিত্যক্ত দালানের মধ্যে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।

এখন জেলখানার ভেতরে নির্জন আদালত। একজন মন্ত্রী বলেছেন, বিএনপির আইনজীবীরা নাকি আইন জানেন না। উনি একটি ফোজদারি কার্যবিধি আইনের সেকশন নাইনের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু উনি (ওই মন্ত্রী) ভুলে গেছেন সংবিধান সর্বোচ্চ আইন, সমস্ত আইনের ঊর্ধ্বে সংবিধান। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৫ (৩) বলা আছে, যেকোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির আসামির বিচার উন্মুক্ত আদালতে হতে হবে, প্রকাশ্যে হতে হবে। তো সংবিধান বড় না যে আইনের কথা বলেছেন সেটা বড়? কারাগারের ভেতরে যে আদালতে খালেদা জিয়ার বিচার করা হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।
স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেন, প্রত্যেকটি থানায় হাজার হাজার কর্মীর বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা দেয়া হয়েছে। ভয়ে কম্পমান এই সরকার। এত অত্যাচারের পরেও বিএনপির নেতাকর্মীরা ঘরে বসে থাকেনি এবং ঘরে বসে থাকবেও না। আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো। খালেদা জিয়াকে নিয়েই আমরা নির্বাচনে যাবো। দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, খা?লেদা জিয়া কারাগারে অসুস্থ অবস্থায় রয়েছেন। উনাকে সুস্থ করতে সরকা?রের কোনো প্রচেষ্টা নেই। বরং খা?লেদা জিয়া?কে কারাগারে তিলে তি?লে মারার ষড়যন্ত্র করছে সরকার।

আমাদের মধ্যে যদি কেউ মনে করে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, যদি কেউ আড়ালে-আবডালে নির্বাচনে যাওয়ার চেষ্টা করে তাদেরকে ঘরের মধ্যে জবাব দেয়ার জন্য আপনারা সজাগ থাকবেন। বিগত দিনে যারা যারা বেইমানি করেছিলো তারা হয়তো অনেকেই ভালো। কিন্তু নতুন করে যদি আবার বেইমানি করতে চায়, রাজপথে নেমে তাদের সমুচিত জবাব দেবে নেতাকর্মীরা। আর শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিশ্চিত করে বাংলাদেশে নির্বাচন হবে। তার আগে কোনো নির্বাচন হবে না, জনগণ তেমন কোনো নির্বাচন করতে দেবে না।

এদিকে প্রতীকী অনশন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনের বাইরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও সাদা পোশাকে গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য মোতায়েন ছিল। অনশন কর্মসূচিতে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান, সেলিমা রহমান, প্রফেসর ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, আহমেদ আজম খান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবুল খায়ের ভূঁঁইয়া, মিজানুর রহমান মিনু, আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, আতাউর রহমান ঢালী, কেন্দ্রীয় নেতা ফজলুল হক মিলন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, শিরিন সুলতানা, নাজিমউদ্দিন আলম, যুবদলের মোরতাজুল করীম বাদরু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক সাদেক আহমেদ খান, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, ছাত্রদলের সভাপতি রাজীব আহসান বক্তব্য দেন। এছাড়া সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন জোটের শরিক দল জামায়াতে ইসলামীর মিয়া গোলাম পারোয়ার, লেবার পার্টির মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার খন্দকার লুৎফর রহমান, ন্যাপের আজহারুল ইসলাম ও কল্যাণ পার্টির সাহিদুর রহমান তামান্না। অনশনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, বরকতউল্লাহ বুলু, আবদুল আউয়াল মিন্টু, নিতাই রায় চৌধুরীসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গ সংগঠন এবং পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

ওদিকে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারামুক্তি ও সুচিকিৎসার দাবি এবং কারাঅভ্যন্তরে আদালত স্থাপনের প্রতিবাদে বিএনপির কেন্দ্র ঘোষিত দুই ঘণ্টার প্রতীকী অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। সকাল ১০টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা দলের নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তিনি এ কর্মসূচি পালন করেন। তার সঙ্গে দলের দুই সহ-দপ্তর সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ কর্মসূচিতে অংশ নেন। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে রুহুল কবির রিজভী একটানাভাবে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অবস্থান করছেন।
কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে এটি তৃতীয় অনশন কর্মসূচি বিএনপির। সর্বশেষ গত ৯ই জুলাই মহানগর নাট্যমঞ্চ প্রাঙ্গণে ৭ ঘণ্টার প্রতীকী অনশন করে করেছিল দলটির নেতাকর্মীরা। প্রথমবার তিন ঘণ্টার অনশন কর্মসূচি পালন করেছিল ১৪ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে। এ ছাড়া তার মুক্তির দাবিতে ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি পেশ, গণস্বাক্ষর সংগ্রহ, লিফলেট বিতরণ ও বিক্ষোভ সমাবেশসহ নানা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছে বিএনপি।

গ্রেপ্তারে নতুন ফাঁদ পুলিশের: বিএনপি
কর্মসূচিতে মৌখিক অনুমতি দিয়ে নেতাকর্মীদের জড়ো করে পুলিশ নির্বিচারে গ্রেপ্তারের নতুন স্ট্রাটেজি অবলম্বন করছে বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গতকাল বিকালে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে অনশন কর্মসূচি শুরু ও শেষে রাস্তা অবরোধ করে পুলিশ বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করে। বিরোধী দলকে দলনের এক নতুন ফন্দি অবলম্বন করেছে পুলিশ। বিএনপির কর্মসূচির মৌখিক অনুমতি দেয়ার পরও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ওপর পুলিশকে লেলিয়ে দিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের এক নতুন স্ট্র্যাটেজি অবলম্বন করেছে সরকার। তার মানে, অনুমতির কথা শুনে নেতাকর্মীরা নির্দিষ্ট সময়ে কর্মসূচির জন্য এক জায়গায় জড়ো হবে, আর সেই সুযোগে পুলিশ অনায়াসেই তাদের ধরতে পারবে। এটি আসলে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরতে পুলিশের একটি নতুন ফাঁদ।

রিজভী বলেন, দখল ও সন্ত্রাসের ভাবধারায় অনুপ্রাণিত সরকার আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে সারা দেশ জনশূন্য করার জন্যই পুলিশকে অবাধ কর্মকাণ্ডের সনদ দিয়েছে। আজকের ঘটনায় এটাই প্রতীয়মান হয় যে, সরকার দমননীতির উত্থান প্রবল থেকে প্রবলতর করছে। আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক চরিত্রই হচ্ছে হানাদারী আচরণে জনঅধিকার কেড়ে নেয়া। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনের বাহিনী না বানিয়ে সবচেয়ে নিম্নমানের দাসত্বের তকমা ঝুলিয়ে দিয়েছে সরকার। পুলিশি গ্রেপ্তারের এই অবাধ কর্মকাণ্ডে জনগণের পুঞ্জীভূত নীরব ক্ষোভ প্রশমিত হবে না। বরং তা আগ্নেয়গিরির মতো উদ্‌গীরণ হবে। রিজভী বলেন, আজকেও বেপরোয়া পুলিশি গ্রেপ্তার অভিযান গণতন্ত্রের জন্য এক মহাবিপদ সংকেত।

বাক-স্বাধীনতা হরণ করতে সরকারের আগ্রাসী মনোভাব এখন চরম পর্যায়ে। অবৈধ সরকার দেশকে অতি দ্রুত গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি বলেন, বুধবার সকাল থেকেই বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের বনানীর বাসভবন অবরুদ্ধ করে রাখে পুলিশ। দেশব্যাপী সরকারি সন্ত্রাসের অংশ হিসেবেই এই প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনীতিবিদের বাসা ঘিরে রেখেছে পুলিশ। তিনি বলেন, আওয়ামী সরকারের কাশিমবাজার কুঠিতে মন্ত্রী ও আওয়ামী নেতাদের বৈঠক চলছে দিনরাত। একের পর এক চক্রান্তমূলক পরিকল্পনা আঁটা হচ্ছে সেইসব বৈঠকে। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে- অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিরোধী দলের অস্তিত্ব সর্বোপরি গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা। আওয়ামী সরকার এখন প্রান্তবেলায়। খাদের কিনারে পতনের শঙ্কায়। সেজন্য তারা শেষ ভরসা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর। কিন্তু এই ভরসায় তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে। ক্ষমতার কানেকশন বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে এই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের সঙ্গে থাকবে না। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের জন্য মহালজ্জার দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। তারা চরম সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে।

অনশন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে মামলা ও গ্রেপ্তারের চিত্র তুলে ধরে রিজভী বলেন, রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট প্রাঙ্গণ থেকে প্রতীকী অনশন পালন শেষে ফেরার পথে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের স্বাস্থ্য সম্পাদক মাহমুদুল হাসান, কেরানীগঞ্জ থানা ছাত্রদল সভাপতি শাহরিয়ার রাসেল, মোহাম্মদপুর থানা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি হাজী মো. ইউছুফসহ ১০৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া মঙ্গলবার রাতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রেপ্তার হন অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী। মামলার চিত্র তুলে ধরে রিজভী বলেন, সাতক্ষীরায় সাবেক এমপি হাবিবুুল ইসলাম হাবিবসহ শতাধিক নেতাকর্মীর নামে কলারোয়া থানায় একটি মামলা দিয়েছে পুলিশ। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শাহজাদা মিয়া ও নির্বাহী কমিটির সদস্য ইয়াসমিন আরা হকসহ ১০৫ জনের অধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তরা পশ্চিম থানায়। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ৪টি মামলায় ৪০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এ ছাড়া নরসিংদী জেলায় ১০টি, রাজশাহীতে ৫টি, বগুড়ায় ৬টি, নেত্রকোনায় ৫টি, ময়মনসিংহে ৬টি, চাঁপাই নবাবগঞ্জে ২টি, নারায়ণগঞ্জে ৭টি, টাঙ্গাইলে ২টিসহ ৪ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া গত ৮ দিনে রাজশাহী মহানগরে ৪টি, গাজীপুর মহানগরে ১১টি, রংপুর মহানগরে ৭টি, খুলনা মহানগরে ১৩টি মিথ্যা মামলায় ৭৮৮ জনকে আসামি ও ১৫৩ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রিজভী জানান, বুধবার ফেনী আদালতে মিথ্যা মামলায় হাজিরা দিতে গেলে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের ৯ নেতাকর্মীর জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত। অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানান তিনি।

ঢাকায় অনশন কর্মসূচি থেকে আটক ১০২
এদিকে, গতকাল সকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন চত্বরে বিএনপির অনশন কর্মসূচির আগে ও পরে আশপাশ থেকে ১০২ জন নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানা গেছে। কর্মসূচির আগে এবং পরে পুলিশের সদস্যরা আশপাশের বিভিন্নস্থান থেকে ছোঁ মেরে এবং জাপটে ধরে বিএনপির নেতাকর্মীদের প্রিজনভ্যানে তুলে নিয়ে যায়। বিশেষ করে গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা বেশি তৎপর ছিল। তারা অনশন স্থানের আশপাশে বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীদের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিছু বুঝে উঠার আগেই সাদা পোশাকে ডিবি পুলিশের সদস্যরা বিএনপির নেতাকর্মীদের আটক করে নিয়ে যায়। শাহবাগ মোড়, মৎস্য ভবনের মোড়, শিল্পকলা একাডেমি, কাকরাইলের তাবলীগ জামাতের মারকাজ মসজিদের সামনে ও হাইকোর্টের সামনে থেকে তাদের আটক করা হয়। দায়িত্ব পালন শেষে অনেক সাংবাদিক অফিসে যাওয়ার সময় তারাও পুলিশের হেনস্তার শিকার হন। তাদের আইডি কার্ড দেখে পরিচয় নিশ্চিত করে সেখান থেকে যেতে দেয়া হয়েছে। এ সময় বিএনপির নেতাকর্মীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেককেই অনশনস্থল থেকে দেরিতে বের হতে দেখা গেছে। একপর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা দল বেঁধে আশপাশের এলাকা দিয়ে গেলে পুলিশ পিছু হটে। শাহআলী থানার যুবদলের শফিকুল ইসলাম জানান, বেলা ১১টার দিকে আমরা কয়েকজন নেতাকর্মী শাহবাগে বাস থেকে নেমে হেঁটে অনশনস্থলে আসছিলাম।

এ সময় যুবদলের কর্মী সুমনকে ডিবি পুলিশের সদস্যরা পেছন থেকে জাপটে ধরে। তখন আমরা দৌড় দিয়ে চলে আসি। কর্মসূচির আশপাশ থেকে এভাবে অনেক নেতাকর্মীকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি জানান, সাদা পোশাকে ডিবি পুলিশের সদস্যরা বেশি আটক করেছে। ডিবি পুলিশের অনেক সদস্য বিএনপির নেতাকর্মীদের মতো বেশ ধরে অনশনস্থলের আশপাশে ঘোরাঘুরি করছিলেন বলে তিনি জানান। এ বিষয়ে শাহবাগ থানার এসআই সমীর কুমার মানবজমিনকে জানান, অনশনস্থলের আশপাশ থেকে সরকারি কাজে বাধা প্রদানের অভিযোগে ৭০ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতদের মধ্যে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রয়েছে। তাদের নাম, ঠিকানা, পদবি যাচাই-বাছাই চলছে। রমনা থানার ডিউটি অফিসার এসআই ইমামুর রহমান মানবজমিনকে জানান, কাকরাইল ও শিল্পকলা একাডেমির আশপাশ থেকে বিএনপির ২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার তাদেরকে আদালতে হাজির করা হবে। এ বিষয়ে পুলিশের মতিঝিল জোনের এডিসি শিবলী নোমান জানান, অনশনের আশপাশ থেকে পল্টন থানা পুলিশ ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় সরকার

হাসপাতালের বেডে থেকেও ভাঙচুর মামলার আসামি

তিন দফা, এক কাতারে বিরোধী আইনজীবীরা

‘সেমিফাইনালে’ চনমনে বাংলাদেশ

সবার জন্য উন্মুক্ত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার

ডাস্টবিনের ময়লাও খেয়েছি

খালেদার চিকিৎসা নিয়ে রিটের শুনানি পহেলা অক্টোবর

খালেদা জিয়ার আন্দোলন এখন কারাগারে

সিলেট বিএনপির সেক্রেটারি আলী কারাগারে

পাঁচ লাখ শটগানের কার্টিজ প্রাণঘাতী, ধ্বংসের নির্দেশ

রূপগঞ্জে প্রসূতির ওপর হামলা, যমজ শিশুর মৃত্যু

বিএনপির সমাবেশের পর লিয়াজোঁ কমিটি

ঢাকা দখলের ঘোষণা ১৪ দলের

প্রেসিডেন্টের আশা, সব দল নির্বাচনে অংশ নিবে

বাংলাদেশের রাজীবকে ফেসবুকের ফেলোশিপ প্রদান

শেহজাদের সেঞ্চুরিতে ভারতের বিপক্ষে আফগানদের পুঁজি ২৫২