বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরে ১১ দিন ধরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ

বাংলারজমিন

পঞ্চগড় প্রতিনিধি | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বুধবার | সর্বশেষ আপডেট: ১২:৫৩
সুবিধাভোগী কয়েকটি সিন্ডিকেটের পরস্পর বিরোধী অবস্থান ও দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার কারণে চার দেশীয় ব্যবসা বাণিজ্যের একমাত্র মাধ্যম বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে গত ১১ দিন ধরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ শুরু হবে তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। স্থলবন্দর লিমিটেড কর্তৃপক্ষ ও লেবার হ্যান্ডেলিং ঠিকাদারের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানিকারকদের দ্বন্দ্ব ও শ্রমিক অসন্তোষের জের ধরে প্রায়ই এ বন্দরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় অন্যান্য দেশে বন্দরটির ব্যাপারে বিরূপ ধারণার পাশাপাশি সরকার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্য চালু রয়েছে। সম্প্রতি আমদানিকারকরা ভুটান থেকে ১০৩ ট্রাক পাথর নিয়ে আসে।

কিন্তু স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ সিএন্ডএফ এজেন্টের কাছে চার্জ বাবদ প্রায় ৩ কোটি টাকা পাওনা থাকার জন্য তাদের পাথর আটকে দেয়। দেন দরবার করে কোনো কাজ না হওয়ার জন্য সিএন্ডএফ এজেন্টরা বন্দরের প্রবেশের গেট ভেঙে ওই ১০৩ ট্রাক পাথর নিয়ে যায়।
এর জের ধরে আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ব্যবসায়ীরা বলছে, ভারত ও ভুটান থেকে সব নিয়ম মেনে বন্দরে পাথর আনা হলেও বন্দর কর্তৃপক্ষ লোড আনলোড করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় ব্যবসায়ীরা ক্ষুব্ধ হয়ে এ কাজ করে। বন্দরের কার্যক্রম সচল করার জন্য পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম গত বৃহস্পতিবার জরুরি সভা আহ্বান করলেও ব্যবসায়ীরা সাড়া দেয়নি। পরে জেলা প্রশাসক স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক প্রিয়সিন্ধু তালুকদারকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। তদন্ত কমিটিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। এই স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ পণ্যবাহী ট্রাক যাতায়াত করে। এতে দৈনিক সরকারের অর্ধকোটি টাকার মতো রাজস্ব আয় হয়। কিন্তু চলতি বছরের ১লা এপ্রিল লেবার হ্যান্ডেলিংয়ের জন্য এটিআই লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারাদার নিয়োগ করার পর থেকেই বন্দরে ক্ষোভ অসন্তোষ ও অস্থিরতা বাড়তে থাকে। লোড আনলোডিংয়ের জন্য কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত ১০৪ টাকা (ভ্যাট বাদে) পরিশোধ করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ লোড আনলোড দুটোরই বিল নিলেও কর্তৃপক্ষের চুক্তিবদ্ধ ইজারাদার ব্যবসায়ীদের পণ্য লোড করতে দিচ্ছেন না।

এ ছাড়া শ্রমিকরা প্রতি টন পণ্য ৩২ টাকা আনলোড করে আসলেও ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এটিআই লিমিটেড তা কমিয়ে ১৯ টাকা টন নির্ধারণ করে। এতে শ্রমিক অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে। গত ৬ই আগস্ট ইজারাদার প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের কাছে বকেয়া টাকা চাইতে গেলে লেনদেন নিয়ে ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা ও বন্দর কর্মকর্তাদের সঙ্গে শ্রমিকদের হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এমনকি শ্রমিকরা বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে ভাঙচুর করে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বন্দর কর্তৃপক্ষ শ্রমিক নেতাদের নামে আদালতে মামলা দায়ের করে। বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দ্বন্দ্বে হয়রানির শিকার হচ্ছেন দেশি বিদেশি শ্রমিকরা। সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হচ্ছেন বিদেশি পণ্যবাহী ট্রাকের চালকরা। আর কাজ না থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হয় বন্দরের কুলি শ্রমিকদের। ব্যবসায়ী ও বন্দর কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্বের জেরে গত ৩০শে আগস্ট থেকে ৮ দিন ধরে বাংলাবান্ধায় আটকা পড়ে ভুটানের পণ্যবাহী ট্রাকের চালকরা। এক কাপড়ে কখনো খেয়ে না খেয়ে বন্দরের মধ্যে অবস্থান করতে বাধ্য হন তারা। এতে ক্ষুব্ধ শতাধিক ভুটানি ট্রাকচালক বন্দর চার্জ পরিশোধ ছাড়াই বন্দরের প্রধান ফটকের দরজা খুলে বন্দরের অভ্যন্তরে  পণ্য খালাস করে। এ সময় বন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা মেরে পালিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার বিকালে ভুটানি গাড়িগুলো কারপাস দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। ভুটানি চালকদের ওপর অস্ত্র উঁচিয়ে ভয় দেখানোর জন্য বন্দর কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তার ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এ ঘটনায় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানায়, গত ১৪ই মে এটিআই লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে আমদানিকৃত পণ্য উঠানামার জন্য লেবার হ্যান্ডেলিংয়ের ইজারা দেয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী আমদানিকৃত পণ্য বন্দরে উঠানামা (লোড আনলোড) বাবদ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এটিআই লিমিটেডকে সিএন্ডএফ এজেন্ট এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা আমদানিকৃত পণ্যের টন প্রতি ১০৪ টাকা করে পরিশোধ করবে। এই অর্থের সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করা হবে। ব্যবসায়ীরা সরকারি রাজস্ব (ভ্যাট) বাবদ টন প্রতি অতিরিক্ত ১৫ দশমিক ৬০ টাকা পরিশোধ করে। মূল ১০৪ টাকার মধ্যে এটিআই লিমিটেড কুলি শ্রমিক, স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ ও স্থলবন্দর লিমিটেডকে বন্দর চার্জ প্রদান করবে। বন্দরে লেবার হ্যান্ডেলিংয়ের ইজারা প্রদানের আগে ব্যবসায়ীরা কুলি শ্রমিকদের মাধ্যমে নিজ উদ্যোগে পণ্য উঠানামা করতো। সে ক্ষেত্রে টন প্রতি তাদের কুলি শ্রমকি বাবদ ব্যয় হতো ৩১ থেকে ৩২ টাকা। ইজারার পর থেকেই এটিআই লিমিটেড ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করছে বলে তারা অভিযোগ করেছে। তাদের মতে, ইজারাদার প্রতিষ্ঠানটি ১০৪ টাকা থেকে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর কর্র্তৃপক্ষকে ১২ দশমিক ২ টাকা, স্থলবন্দর লিমিটেডকে ২৬ দশমিক ৪৫ টাকা, পণ্য আনলোড বাবদ কুলি শ্রমিকদের ১৯ টাকা ও লোড বাবদ ২১ টাকা ছাড় দেয় ব্যবসায়ীদের।

আমদানিকারকরা ২১ টাকায় বন্দরের বাইরে থেকে পাথরসহ আমদানিকৃত পণ্য আবার লোড করে বিভিন্ন এলাকায় পাঠায়। প্রতি টনে এটিআই লিমিটেড মুনাফা করে ২৫ দশমিক ৫২ টাকা। এই বন্দর দিয়ে শুধু আমদানিকৃত পাথর থেকেই প্রতিদিন ইজারাদার প্রতিষ্ঠানটি ২ লাখ টাকার বেশি মুনাফা করছে। এছাড়া ডাল, গম, চালসহ অন্য আরো অনেক পণ্য এই বন্দর দিয়ে আমদানি করা হয়।  তাদের দাবি, ইজারাদর প্রতিষ্ঠান ২৫ দশমিক ৫২ টাকা মুনাফা করলেও তারা হিসাব দেখায় ২ থেকে ৩ টাকা মুনাফার। তারা সকল নিয়ম মেনেই আমদানি রপ্তানি করতে চায়। কিন্তু ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত মুনাফা লাভের মানসিকতা বন্দরকে অচল করে রেখেছে। অযোগ্য প্রতিষ্ঠানকে ইজারার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করে ব্যবসায়ীরা জানায়, তাদের যে সুযোগ সুবিধা দেয়ার কথা ছিল তারা সে সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে না। এতে শ্রমিকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এই সংকট সমাধানের জন্য মূল ইজারাদারকে নিয়ে বসতে হবে। কিন্তু মূল ইজারাদার আসছে না। এসব অভিযোগের বিষয়ে মূল ইজারাদারের সঙ্গে কথা বলার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ইজারাদার প্রতিষ্ঠান এটিআই লিমিটেডের পার্টনার প্রতিনিধি ও আমদানি রপ্তানিকারক অ্যাসোসিয়েশনের নেতা মেহেদী হাসান খান বাবলা একটি সুযোগ সন্ধানী মহলের হীনস্বার্থের কারণে বন্দরে অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে দাবি করে বলেন, এই বন্দর নিয়ে ওই মহলটি দীর্ঘদিন ধরে নানা খেলায় মেতে উঠেছে। এই মহলটির কাছে বন্দরের প্রায় ৩ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এরাই সিএন্ডএফ ও লেবারদের দিয়ে আন্দোলন করাচ্ছে। ওই মহল কোনো সরকারি নিয়ম মানে না। সাধারণ লেবার ও সাধারণ সিএন্ডএফের কেউই এটি পছন্দ করে না। এতে সরকার রাজস্ব হারানোসহ বন্দরের রেকর্ড খারাপ হচ্ছে।

স্থলবন্দরের ম্যানেজার মামুন সোবহান বলেন, কয়েকজন সিএন্ডএফ এজেন্টের কাছে বন্দর চার্জ বাবদ প্রায় ৩ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। এজন্য ভুটান থেকে আমদানি করা ১০৩ ট্রাক পাথর বন্দরে আটকে দেয়া হয়। বার বার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও অনেকদিন থেকেই বন্দরের চার্জ পরিশোধ করছে না সিএন্ডএফ এজেন্টরা। উল্টো বন্দরে প্রবেশের গেট ভেঙে ওই ১০৩ ট্রাক পাথর নিয়ে গেছে। তবে আমদানিকারক হারুন-উর রশিদ বাবু বলেন, ভারত ও ভুটান থেকে যথানিয়মে পাথর আনা হলেও লোড আনলোড করতে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষিপ্ত হয়।   
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ গোলাম আজম জানান, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের চলমান সংকট নিরসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি সরজমিনে তদন্ত করে মতামতসহ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে আগামী ১৫ই সেপ্টেম্বর বিকাল ৪টায় জেলা প্রশাসক সম্মেলন কক্ষে স্থলবন্দরের অচল অবস্থা নিরসন কল্পে জরুরি সভার আয়োজন করা হয়েছে।  

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, স্থলবন্দরের অচলাবস্থার বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে সংশ্লিষ্টরা আরো দুদিন সময় চেয়েছে। বন্দরের বিভিন্ন পর্যায়ের লোকজনদের সঙ্গে কথা হচ্ছে। আশা রাখি খুব তাড়াতাড়ি আমদানি রপ্তানি কার্যক্রম শুরু হবে। তদন্ত রিপোর্ট পর্যালোচনা করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

রাখঢাক রাখছেন না পর্নো তারকা ডানিয়েল স্টর্মি

দেশে-বিদেশে শহিদুল আলমের মুক্তি দাবি

শ্রীমঙ্গলে ডাকাত দলের হামলায় আহত ২০, মালামাল লুট

নারায়ণগঞ্জে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের প্রাথমিক তদন্ত শুরু আইসিসির

বিশ্বের শীর্ষ ধনীরা কেন নামকরা পত্রিকাগুলো কিনে নিচ্ছে

যে রাঁধে সে স্যাটেলাইটও উড়াতে জানে!

‘আমাদের টিভি নাটকে ভালো গল্পের অভাব রয়েছে’

২১শে আগস্টের রায় ১০ই অক্টোবর

বাক্সবন্দি হবে বাকস্বাধীনতা

যেখানে কোটা সংস্কারের মিছিল সেখানেই ছাত্রলীগ

ইভিএম কেনার প্রকল্প অনুমোদন

তিন প্রকল্প উদ্বোধন করলেন হাসিনা-মোদি

খালেদার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি আইনজীবীরা

জনগণ তাদের খুঁজে বের করে বিচার করবে

সোহেল গ্রেপ্তার