বেপরোয়া টানাপার্টি টার্গেট নারী

শেষের পাতা

শুভ্র দেব | ১৬ আগস্ট ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ৮:০০
রাজধানীতে ফের বেপরোয়া টানাপার্টি চক্র। অলিগলি থেকে শুরু করে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এ চক্র। দিনরাত সমান তালেই চক্রের সদস্যরা তৎপর। পথচারী, রিকশা বা বাসযাত্রীর কাছ থেকে টান দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ব্যাগ-মোবাইল ফোন। চলতি মাসেই অন্তত অর্ধশতাধিক মানুষ টানাপার্টির কবলে পড়েছেন। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, ইদানীং ছিনতাইয়ের কাজে মোটরসাইকেল ব্যবহার করা হচ্ছে। পথচারী বা রিকশার নারী-যাত্রীদের টার্গেট করে এ চক্র। সুযোগ বুঝেই মোটরসাইকেল থেকে টান দিয়ে ব্যাগসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করছে।
চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে হেচকা টানে অনেক যাত্রী রিকশা থেকে পড়ে আহত হচ্ছেন। পুলিশ বলছে, প্রায়ই টানাপার্টির কবলে পড়ে ব্যাগ, টাকা, মোবাইল হারানোর ঘটনার তথ্য আসলেও থানায় অভিযোগ আসে কম। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, সার্টিফিকেট বা অন্য গুরুত্বপূর্ণ কিছু হারালে সেগুলোর জন্য সাধারণ ডায়েরি করে ভুক্তভোগীরা

শনিবার রাত ১০টা। লালমাটিয়া থেকে রিকশাযোগে তালতলা যাচ্ছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী মুনতাহা আফরিন। তাকে বহনকারী রিকশাটি মানিক মিয়া এভিনিউ এলে হঠাৎ করেই তার কাছে থাকা ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী। ব্যাগ টান দিয়ে নেয়ার পর গতি বাড়িয়ে তারা নিমিষেই সেখান থেকে চলে যায়। মুনতাহা বলেন, কম গতির একটি মোটরসাইকেল রিকশার পাশে আসে। দুজনের মাথায়ই হেলমেট ছিল। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তারা আমার ব্যাগ টান দিয়ে নিয়ে যায়। আমি চিৎকার করেছিলাম কিন্তু ততক্ষণে তারা  সেখান থেকে চন্দ্রিমা উদ্যানের সড়ক দিয়ে চলে যায়। তিনি বলেন, আমার ব্যাগের মধ্যে ৫ হাজার ৪০০ টাকা, দুটি মোবাইল ফোনসহ আরো কিছু জিনিস ছিল। একই দিন বিমানবন্দর সড়কের খিলক্ষেত ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের সামনে ঘটে আরেক ঘটনা। ওই রাস্তা দিয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৯টার দিকে মোবাইল ফোনে কথা বলে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিলেন মধ্যে বয়সী সোলায়মান হোসেন। কথা বলায় মগ্ন থাকায় আশপাশে তার তেমন একটা নজর ছিল না। তখন হঠাৎ করেই পেছন থেকে আসা দুই মোটরসাইকেল আরোহী তার মোবাইল ফোনটি টান দিয়ে নিয়ে যায়। এই দুই ভুক্তভোগীর কেউই সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ করেননি। রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মোহাম্মদপুরের ঈদগাহ রোড দিয়ে রিকশা করে বাসায় ফিরছিলেন আতিক হাসান নামের এক চাকরিজীবী। তিনি একটি আইটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। অফিস শেষে করে বাসায় ফেরার পথে তার ব্যবহৃত ল্যাপটপটি সঙ্গে ছিল। আতিক বলেন, তখন সড়কে তেমন একটা যানবাহন চলাচল ছিল না। আনুমানিক ২০-২২ বছরের দুই তরুণ আমার রিকশার পাশে এসে টান দেয়। চলন্ত অবস্থায় টান দিলে ব্যাগসহ আমি পাকা রাস্তায় পড়ে যাই। এসময় মোটরসাইকেলের পেছনের যাত্রী নেমে জোর করে টান দিয়ে আমার ব্যাগ নিয়ে চলে যায়। আমার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসলেও কোনো লাভ হয়নি। আতিক বলেন, ল্যাপটপ নিয়ে গেছে এটা কোন সমস্যা নয়। কিন্তু ল্যাপটপের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কিছু ডকুমেন্টস ছিল। যেগুলো আর পাওয়া যাবে না।

টানাপার্টির কবলে পড়ে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু হারানোর ঘটনার পাশাপাশি অনেকেই আহত হচ্ছেন মারাত্মকভাবে। সোমবার সিলেট থেকে উপবন ট্রেনে ঢাকায় আসেন সায়মা হক তুসি নামের এক শিক্ষার্থী। সাড়ে ৫টার সময় কমলাপুর স্ট্রেশনে নেমে একটি রিকশা করে তিনি বাসাবোর বাসায় ফিরছিলেন। তাকে বহনকারী রিকশাটি শাহজানপুর রেলওয়ে কলোনি যাওয়ার পরই কয়েক যুবক তার রিকশার গতিরোধ করে। এসময় যুবকরা তার কাছে থাকা ব্যাগ ধরে টানাটানি শুরু করে। কিন্তু তুসি তার ব্যাগ শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। এসময় এক যুবক জোরে হেঁচকা টান দেয়। তখন রিকশা থেকে উল্টে পড়েন তুসি। পড়ে গিয়ে তার বাম পা ও হাত মচকে যায়। উপায়ন্তর না পেয়ে তিনি ব্যাগটি ছেড়ে দেন। পরে যুবকরা তার ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায়। আহত তুসি পরে একটি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেন। গত সপ্তাহেও দারুস সালাম ব্রিজের নিচে টানাপার্টির কবলে পড়ে আহত হন এক নারী। সালমা ইসলাম নামের ওই নারী হেঁটে হেঁটে কল্যাণপুর থেকে গাবতলী যাচ্ছিলেন। দারুসসালাম এলাকায় যাওয়ার পর তিনি ছিনতাকারীর কবলে পড়েন। তার কাছে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয় এক ছিনতাইকারী। শক্ত করে ধরে ব্যাগ নিতে ব্যর্থ হয়ে ওই ছিনতাইকারী তার হাতে ছুরিকাঘাত করে। এতে রক্তাক্ত হয়ে ওই নারী ব্যাগ ছেড়ে দেন। ব্যাগের মধ্যে ১১ হাজার টাকা, মোবাইল ফোন, স্বর্ণের রিং, জাতীয় পরিচয়পত্রসহ আরো কিছু সামগ্রী ছিল।

চলতি বছরের শুরু ও গত বছরের শেষের দিকে টানাপার্টির কবলে পড়ে বেশকিছু প্রাণঘাতী ঘটনাও ঘটে। গত বছরের ১৮ই ডিসেম্বর ভোরে রাজধানীর দয়াগঞ্জে টানাপার্টির কবলে পড়ে প্রাণ হারায় ৬ মাস বয়সী শিশু আরাফাত। শরীয়তপুরের শাহআলম ও আকলিমা দম্পতি তাদের বড় ছেলের চিকিৎসার জন্য ঢাকা আসেন। লঞ্চে সদরঘাট এসে একটি রিকশা দিয়ে শনির আখড়ায় তাদের এক আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার সময় ঘটনাটি ঘটে। আকলিমার কাছে থাকা ব্যাগ ধরে টানাটানির সময় কোল থেকে মাটিতে পড়ে শিশু আরাফাত। মাথায় আঘাত পেয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায়। চলতি বছরের ২৬শে জানুয়ারি ধানমন্ডিতে টানাপার্টির কবলে পড়ে মৃত্যু হয় গ্রিনলাইফ হাসাপাতালের মিডওয়াইফারি ৩৫ বছর বয়সী হেলেনা বেগমের। বরিশালের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গ্রিনরোডের বাসায় ফেরার পথে একটি প্রাইভেটকার থেকে হেলেনার ব্যাগ ধরে টানাটানি করে ছিনতাইকারীরা। চলন্ত গাড়ি থেকে টানাটানির একপর্যায়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন হেলেনা। এসময় ওই প্রাইভেট কারটি হেলেনার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেলে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। এছাড়া টানাপার্টির কারণে একজন সেবিকা, চিকিৎসক মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

 শুধু দেশি মানুষ নন ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন বিদেশিরাও। গত ১৪ই জুন সীমান্ত স্কয়ারের সামনে টানাপার্টির কবলে পড়ে সর্বস্ব হারান ফটোগ্রাফির কোর্স করতে আসা জার্মান এক তরুণী। এসময় টানাপার্টির সদস্যরা তার কাছে থাকা ব্যাগে ল্যাপটপ, হার্ডডিস্ক, ক্যামেরা, টাকা ছাড়া আরো অনেক কিছু নিয়ে যায়। পরে সুইন্ডে ধানমন্ডি থানায় একটি মামলা করেন। দেশে ফেরার আগে সুইন্ডে ইনস্টাগ্রামে দেয়া একটি স্ট্যাটাসে লিখেছেন, বাংলাদেশে একা ভ্রমণ করা ঠিক নয় বলে তার উপলব্ধি হয়েছে। তিনি লিখেছেন, রিকশায় ভোরে এবং সন্ধ্যায় কখনও ওঠা উচিত না। এ সময় মোটেও নিরাপদ নয়।

সূত্র বলছে, পরপর আলোচিত বেশ কয়েকটি ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশ তৎপর হয়ে উঠেন। বিশেষ অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু টানাপার্টির সদস্যদের গ্রেপ্তারও করেন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ অনেক এলাকায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। বিশেষ করে পুলিশ ও র‌্যাবের বিশেষ অভিযানের কারণে রাতের বেলায় পথচারীরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই চলাফেরা করে। কিন্তু ইদানীং হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে এসব ঘটনা। প্রায় প্রতিদিনই শোনা যাচ্ছে কোথাও না কোথাও টানাপার্টির কবলে পড়ার খবর। যেভাবে ঘটনা ঘটছে সে তুলনায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান হচ্ছে না। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে টানাপার্টির চক্র। অন্তত ২০টি স্পর্টে অর্ধশতাধিক চক্র সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ২০টি স্পটের মধ্যে দয়াগঞ্জ, যাত্রাবাড়ী, কদমতলী, ওয়ারি, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, দারুসসালাম, বিমানবন্দর সড়ক, মানিক মিয়া এভিনিউ অন্যতম। এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার ওবায়দুর রহমান বলেন, টানাপার্টির সদস্যদের ধরতে আমাদের অভিযান চালু আছে। ডিএমপির প্রতিটি থানা এলাকায় টহল পুলিশ কাজ করছে। ঈদকে সামনে রেখে টানাপার্টির তৎপরতা একটু বেড়ে যায়। সেজন্য আমাদেরও তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কাজ করে যাচ্ছেন।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

নির্বাচন বর্জন নয়, কেন্দ্র পাহারা দিন

হঠাৎ কবিতা খানমের সুর বদল

ফাঁকা মাঠে গোল নয়

রেজা কিবরিয়া ঐক্যফ্রন্টে

সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের নির্বাচনে মনোনয়ন না দেয়ার দাবি

‘ফের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে’

মামলার বাদী যখন খুনি

ক্ষমতায় গেলে যেসব কাজ করবে ঐক্যফ্রন্ট জানালেন ডা. জাফরুল্লাহ

‘নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে’

বিএনপিতে মনোনয়ন যুদ্ধে সাবেক ছাত্র নেতারা

তলাফাটা নৌকা নিয়ে কতদূর যেতে পারেন দেখাতে চাই

সিলেটে জামায়াতকে ছাড় দিতে চায় না বিএনপি

রাষ্ট্র ভিন্নমতাবলম্বীদের সহ্য করতে পারছে না

নয়া মার্কিন দূত মিলার ঢাকা আসছেন আজ

দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে নাগরিক ঐক্য

ভোট পর্যবেক্ষণের আবেদন ২১ নভেম্বরের মধ্যে