আতঙ্কের মধ্যে প্রচারণায় বিএনপি

শেষের পাতা

আসলাম-উদ-দৌলা, রাজশাহী থেকে | ১৯ জুলাই ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১১:২৩
রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের গণসংযোগে ককটেল হামলার ঘটনা টক অব দ্য সিটিতে পরিণত হয়েছে। হামলার পেছনে জড়িত হিসেবে ঘুরেফিরে একটি পরিবারের নাম আসছে। যে পরিবারের চার ভাইয়ের তিনজন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত  এবং অপর এক ভাই বিএনপি’র রাজনীতিতে। এই ঘটনায় গত মঙ্গলবার রাতে বোয়ালিয়া থানার এসআই শামীম উদ্দিন বাদী হয়ে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলাও করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা ৮/১০ জনকে আসামি করা হয়। তবে বিএনপি’র পক্ষ থেকে হামলাকারী হিসেবে একজনকে শনাক্ত করা হয়। সে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আবেদ। আর আওয়ামী লীগের দাবি, ছাত্রদল নেতা জাবেদ (আবেদের ভাই) এই হামলা ঘটিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাগরপাড়া এলাকার একজন বাসিন্দা মানবজমিনকে জানান, ‘আবদুুল লতিফের চার ছেলের মধ্যে তিন জনই আওয়ামী লীগ করে, এক ছেলে করে বিএনপি’র রাজনীতি।
আর ককটেল হামলায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি দুই দলই পরিবারটির নাম আনছে। তাই হামলার পেছনে কার হাত আছে তা নিয়ে সাধারণ মানুষও বিভ্রান্ত। তবে কেউ না কেউ ইন্ধন জুগিয়েছে।’

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বলেন, ‘রাজশাহীতে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক পরিমণ্ডল নষ্ট করতে এক ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। আমাদের কাছে খবর আছে, বিএনপি ক্যাডার জাবেদ এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে। আর এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত আছে রুহুল কুদ্দুস দুলু। রাজশাহীর নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য এমন ঘটনা ঘটিয়ে তারা এটাই বুঝাতে চাচ্ছে যে, রাজশাহীতে নির্বাচনের পরিবেশ নেই। এই মুহূর্তে রাজশাহীতে ইসি সচিব অবস্থান করছেন নির্বাচনের পরিবেশ পর্যবেক্ষণে। এ ঘটনা ঘটিয়ে তাকে একটি বার্তা দেয়ার চেষ্টা করছে বিএনপি।’

নির্বাচনে প্রচারণায় যখন দুইপক্ষ সমানে সমান টক্কর দিয়ে মাঠ কামড়ে আছে ঠিই সেই মুহূর্তে ককটেল হামলায় নেপথ্যে কারা জড়িত তা নিয়ে ভোটাররাও দোদ্যুলমান। সারাদিন বিভিন্ন মোড়-চায়ের দোকানে আলোচনার খোরাক জুগিয়েছে ঘটনাটি। এর ভেতরে জটিল অঙ্ক খুঁজছেন অনেকে। আর ভোটারদের পাশাপাশি ফেসবুকে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনের কর্মী-সমর্থকরা জাবেদের ছবি দিয়ে হামলার পেছনে বিএনপি’র সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে মহানগর পুলিশের মুখপাত্র সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার ইফতেখায়ের আলম মামলার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, তারা কিছু নাম পেয়েছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।’      

নির্বাচনের প্রথম থেকে ভোটের মাঠ একচেটিয়া দখলে রাখে আওয়ামী লীগ। তবে বিগত ২/৩ দিন থেকে ক্রমেই ভোটের সমীকরণ উল্টাতে থাকে। বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনৈক্য ও জামায়াতের নীরবতাকে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের জন্য বড় বাধা হিসেবে দেখা হচ্ছিলো। সে জায়গা থেকে বেরিয়ে আসে বিএনপি। এ মুহূর্তে রাজশাহীতে বিএনপি’র দুই কেন্দ্রীয় নেতা অবস্থান করছেন। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এবং কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু। অন্যদিকে রাজশাহীতে আওয়ামী লীগের প্রচারণার শক্তি হিসেবে দেখা গেছে ছাত্রলীগকে। বর্তমানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও খুলনা সিটি নির্বাচনের সদ্য বিজয়ী মেয়র আবদুল খালেক রাজশাহীতে আছেন। দুই পক্ষই রাজশাহী সিটি নির্বাচনে তাদের প্রার্থীকে বিজয়ী করে আনতে চাচ্ছেন।

ককটেল হামলার ঘটনার পর আতঙ্কজনক পরিস্থিতি বিরাজ করলেও থেমে নেই বিএনপি’র প্রচারণা। গতকাল সকালে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে নগরীর ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের ডাঁশমারী, মিজানের মোড়, জাহাজঘাট এলাকায় প্রচারণা চালান বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল।

এ সময় বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বোমা মেরে ভয় দেখিয়ে বিএনপি’র বিজয় কোনোভাবেই অবৈধ ও ফ্যাসিস্ট সরকার ছিনিয়ে নিতে পারবে না। বিএনপি একটি আদর্শবাদী ও সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক দল। আওয়ামী লীগ যদি মনে করে গাজীপুর ও খুলনার মতো ভোট জালিয়াতি ও জোর করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে বিজয়ী করাবে তাহলে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছে। তিনি আরো বলেন, সরকার উন্নয়নের নামে দেশের মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। মেগা প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করেছে এবং এই ধারা অব্যাহত রেখেছে। আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা শুরু করেছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে মিথ্যা ও সাজানো মামলায় প্রহসনের রায় দিয়ে জেলে পাঠিয়েছে। অসুস্থ হলেও তাকে চিকিৎসা করতে দিচ্ছে না এই সরকার। তিলে তিলে জেলের মধ্যে বেগম জিয়াকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এই সিটি নির্বাচনের পরে কঠোর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অবৈধ সরকারের পতন এবং বেগম খালেদা জিয়াকে জেল থেকে বের করে আনা হবে। এই আন্দোলনে সকল নেতাকর্মীকে সক্রিয়ভাবে মাঠে থাকার আহ্বান জানান তিনি ।   

রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কা কাটিয়ে রাজশাহী মেয়র প্রার্থীদের মাঝে সৌহার্দ্যের সম্পর্ক বিরাজ করছে। গতকাল দুপুরে রাজশাহী কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড মিলনায়তনে সিটি করপোরেশন নির্বাচন-২০১৮ প্রার্থীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন ও বিএনপি প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। পাশে ছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক মেয়র মিজানুর হমান মিনু, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলন। এ সময় তাদেরকে হাততালি দিয়ে উপস্থিত অন্যান্য মেয়র ও  কাউন্সিলর প্রার্থীরা সাধুবাদ জানান।

পরে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে সভার প্রধান অতিথি নির্বাচন কমিশনার শাহাদত হোসেন চৌধুরী, বিশেষ অতিথি নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ ও রাজশাহী পুলিশ কমিশনার একেএম হাফিজ আক্তার সব প্রার্থীদের নির্বাচন চলাকালীন ও নির্বাচন পরবর্তী এমন সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার আহ্বান জানান।

তবে ওই মতবিনিময় সভায় কোনো প্রার্থীই কাউকে ছেড়ে কথা বলেননি। বিএনপি’র মেয়র প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল বলেন, রাজশাহীতে পোস্টার সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে। আমার পোস্টার-ব্যানার ছিঁড়ে পাশের ডাস্টবিনে ফেলে রাখা হচ্ছে। এটি কোনো নির্বাচনের পরিস্থিতি নয়, এটি যুদ্ধের পরিস্থিতি। তিনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, প্রতিটি পোলিং এজেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

জবাবে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, বিএনপি জিতলেই ভোট আনন্দমুখর হয়, আর পরাজিত হলেই প্রশ্নবিদ্ধ। রাজশাহীতে এবার নৌকার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এর কারণ বুলবুল নগরবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।

পোস্টার-ব্যানার প্রসঙ্গে বলেন, নির্বাচনী ডামাডোলে অতিরঞ্জিত পোস্টার-ব্যানারের পক্ষে আগেও ছিলাম না এখনো নেয়। আগামীতে নির্বাচন কমিশন যদি এটি বন্ধ করে দেন তবে আমিই খুশি হবো। আমার নির্দিষ্ট পরিমাণ ব্যানার-পোস্টারের বাইরে দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা উৎসাহিত হয়ে স্বউদ্যোগে ব্যানার- পোস্টার লাগাতে পারে। আমি তাদের মানা করতে পারিনি।

পরে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘অতীতের নির্বাচন সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংস্কৃতি আমরা যা দেখে এসেছি তা আপনারা মিথ্যা বা ভুল বলে প্রমাণ করেছেন। যেটি আমাদের কারওই কাম্য না।’

‘আমরা শুনতে পাই ভোটের আগের রাতে কেন্দ্র দখল করে সিল মারার যে ঘটনাগুলো। আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, আমি অনেক কঠোরভাবে নির্দেশনা দিয়েছি একটি কেন্দ্রেও যেন এ ধরনের ঘটনা না ঘটে। খুলনা ও গাজীপুরে একটি কেন্দ্রেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে নাই। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস আপনাদের সহযোগিতা পেলে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও কোনো ধরনের কোনো অনিয়ম হবে না।’

এছাড়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়া যাতে কাউকে গ্রেপ্তার করা না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেন নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

নিজ আসন থেকেই প্রচার শুরু করছেন শেখ হাসিনা

নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আগ্রহী ৩৪,৬৭১ স্থানীয় পর্যবেক্ষক

উচ্চ আদালতে হাজারো জামিনপ্রার্থী, দুর্ভোগ

পরিস্থিতির উন্নতি না হলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠবে

হাইকোর্টেও বিভক্ত আদেশ

সব দলকে অবাধ প্রচারের সুযোগ দিতে হবে

পাঁচ রাজ্যে বিজেপির ভরাডুবি

নোয়াখালী ও ফরিদপুরে নিহত ২

ভুলের খেসারত দিলো বাংলাদেশ

চার দলের প্রধান লড়ছেন যে আসনে

কোনো সংঘাতের ঘটনা ঘটেনি

সিলেটে মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু আজ

দেশজুড়ে ধরপাকড়

টেকনোক্র্যাট মন্ত্রীদের চার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব তিন জনের হাতে

আবারো বন্ধ হলো ৫৪টি নিউজ পোর্টাল

নারী প্রার্থীদের অঙ্গীকার