যৌন নিপীড়নের ভয়াল বিস্তার

শেষের পাতা

রুদ্র মিজান | ২৩ জুন ২০১৮, শনিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:২৬
অফিস শেষে ধনামন্ডি থেকে গণপরিবহনে রামপুরার বাসায় ফিরছিলেন অনিতা দাশ। সাইন্সল্যাব থেকে বাসে উঠতে গিয়ে অনেকটা সংগ্রাম করতে হয়। ভিড়ের মধ্যে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় হেল্পার। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী অনিতা যখন বাসে উঠছেন তখনই হাত বাড়িয়ে তাকে সহযোগিতার ছলে যৌন হয়রানি করা হয়। হাতটি মুহূর্তের মধ্যেই তার বুক ও পিঠ ছুঁয়ে যায় শক্তভাবে। এত মানুষের ভিড়ে কিছু ঘটেনি ভাব করেই সিটে বসেন তিনি। ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছিলেন অনিতা নিজেই। এরকম বেশ কয়েকদিন শিকার হন।
কখনও কখনও মুখে প্রতিবাদ করেছেন।  অনিতা জানান, রিকশা বা সিএনজি অটোরিকশায় আসা-যাওয়া করলে বেতনের অর্ধেক টাকা চলে যায় যাতায়াতে। বাধ্য হয়েই গণপরিবহনে আসা-যাওয়া করেন। প্রতিবাদ করলে অনেকে নির্যাতনকারীর পক্ষে কথা বলেন। ইচ্ছেকৃত ঘটেনি বলে নানা যুক্তি  দেন। অনিতা দাশের মতোই প্রতিনিয়ত ঘটছে যৌন হয়রানির ঘটনা। মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের দেয়া তথ্যানুসারে, চলতি বছরে পাঁচ মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৯৬ নারী। জানুয়ারি মাসে ১৫, ফেব্রুয়ারিতে ১৪, মার্চে ২৫, এপ্রিলে ২৪ ও মে মাসে ১৮ জন। এ ছাড়াও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০৯ জন নারী। এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছেন ১২ ও যৌতুক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৭৫ জন।
মেহজাবিন মৌ নামে এক নারী জানান, গণপরিবহনে যাতায়াত করেন না অনেক আগে থেকেই। তবু যৌন হয়রানি তার পিছু ছাড়ছে না। রাতে অনলাইনে থাকলে অনভিপ্রেত ঘটনার মুখোমুখি হন এই নারী। ফেসবুকে-ম্যাসেঞ্জারে চেনা-অচেনারা হাই হ্যালো করতেই থাকে। রিপ্লে না দিলে আবার বাজে মন্তব্য করে। একই বিষয়ে আরেক নারী জানান, দীর্ঘদিন আগে পঞ্চাশ বছর বয়সী এক ব্যক্তি তাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান। প্রোফাইলের তথ্য দেখে তার রিকোয়েস্ট গ্রহণ করেন। ওই ব্যক্তি নিজেকে লেখক-গবেষক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তার টাইম লাইন জুড়ে জ্ঞানের ছড়াছড়ি। দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তার চলাফেরা। জ্ঞানগর্ভ কথাগুলো ভালো লাগছিল ওই নারীর। এর মধ্যেই এক রাতে নক করেন ওই লেখক। ‘বাবুনি, কেমন আছো।’ বাবুনি এবং তুমি সম্বোধন দেখে অবাক হন ওই নারী। লেখক হয়তো ভুল করে অন্য কাউকে এটা পাঠাতে গিয়ে তাকে পাঠিয়েছেন এমনটি মনে করে রিপ্লে দেন। না, লেখক ভুল করেননি। তিনি জেনেই লিখেছেন। তারপরই ওই নারীর বিভিন্ন ছবিতে দেখা চেহারার বর্ণনা করেন। শরীরের কোথায় কোন ভাঁজটি কতটা শৈল্পিক। এরকম একজন নারীর বন্ধুত্ব তার প্রয়োজন ইত্যাদি। শেষ পর্যন্ত ওই নারী তাকে ব্লক করতে বাধ্য হন। কাঁঠালবাগান এলাকার বাসিন্দা ভুক্তভোগী ওই নারী জানান, প্রতি দিনই এরকম ঘটনার মুখোমুখি হতে হয় তাকে। বাড়ছে ব্লকের সংখ্যা। কেউ কেউ সরাসরি অশ্লীল বাক্য লিখেন। পর্নো ছবি পাঠিয়ে দেন নারীদের ফেসবুক ইনবক্সে। বাধ্য হয়ে অনেক নারী নিজেকে চ্যাটে অফলাইন করে রাখেন। তাদের মধ্যে অতি অল্প সংখ্যক নারী অভিযোগ করেছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।
অনলাইনে যৌন হয়রানি প্রসঙ্গে সিটিটিসি’র সাইবার ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার নাজমুল ইসলাম জানান, অনেক ঘটনা ঘটে কিন্তু নির্যাতিত নারীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হন না। অনেককে আমরা সহযোগিতা করি কিন্তু তাদের মধ্যে ৩০ ভাগেরও কম মামলা করেন বলে জানান তিনি। অনলাইনে নানাভাবে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে। ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া একটি পোস্টে এক তরুণী লিখেছেন, শ্যামলী থেকে তিনি ও তার এক বান্ধবী একটি বাসযোগে কমলাপুর যাচ্ছিলেন। বাসে সিট না থাকায় পেছনে গিয়ে বসছে। দু’বান্ধবী কিছুক্ষণ গল্প করে পরে জ্যামে বোরিং লাগায় হেডফোনে গান শুনতে থাকেন। ফার্মগেট পার হওয়ার পর বাসের হেল্পার তাদের কাছে ভাড়া নিতে নিতে জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাবেন। সায়েদাবাদ, জানানোর পর আবার জানতে চায়, সায়েদাবাদ কোথায় যাবেন। তরুণী জবাব দেন, আপনার জানা লাগবে না মামা, আপনি সায়েদাবাদের ভাড়া রাখেন দুজনের।
বাংলামোটর-মালিবাগ হয়ে খিলগাঁও পুলিশ ফাঁড়ি পার হতে হতে পুরো বাস খালি হয়ে যাচ্ছিলো প্রায়। খিলগাঁও ফ্লাইওভারে যখন উঠে বাসে ওই দুই তরুণীসহ চার জন। তরুণী লিখেছেন, বাসাবোতে বাসটা আর থামল না। মানুষ থাকা সত্ত্বেও বাসে লোক উঠায়নি। বৌদ্ধমন্দির পার হওয়ার পর আমরা যখন ফোন ব্যাগে ঢুকাচ্ছি নামার জন্য রেডি হব, হঠাৎ পেছন থেকে আমাদের দুজনকে  দু’জন লোক হাত দিয়ে মুখ-চোখ চেপে ধরে। বাসটা হঠাৎ জোরে টানা শুরু করল। আমি চোখে অন্ধকার দেখছিলাম। মুখে রুমাল চেপে ধরায় চিৎকারও দিতে পারছিলাম না। আতঙ্কে শরীরের প্রতিটা নার্ভ জমে গিয়েছিল, যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে বুঝতে পারলাম আমি একদম গেটের সামনে এসে পড়ছি এবং ধাক্কা খেয়ে দেখলাম আমার বান্ধবী আমার ঠিক পাশে। হাত দিয়ে যত জোরে পারি নিজের শক্তি দিয়ে লোকটার বুকে আঘাত করি, সঙ্গে সঙ্গে সে আমাকে ছেড়ে দিলে আমি আরেকটা লাথি মারি পেট বরাবর। কিছু না ভেবেই আমার পায়ের জুতা খুলে আমার বান্ধবীকে যে লোকটা ধরে রেখেছে তার মাথায় মারি, ওই লোকটা ড্রাইভারের পাশে পড়ে যায়।’ ওই সময়ে জ্যামের কারণে বাসের গতি কম থাকায় দ্রুত বাস থেকে নেমে যান ওই দুই তরুণী। বাসটি দ্রুত চলে যায়। তবে ওই তরুণী বাসের নম্বর উল্লেখ করেননি। এ বিষয়ে থানা পুলিশের কাছে লিখিত কোনো অভিযোগও করেননি। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, দেশে নারীর প্রতি সহিংসতা চলছেই।
শিশু ধর্ষণের ঘটনাও বর্তমানে মারাত্মকভাবে বেড়েছে। নারী ও শিশুদের ওপর বিভিন্ন ধরনের নিপীড়ন ও সহিংসতা চালানো হলেও এই সমস্ত ঘটনার বিচার এবং অপরাধীদের সাজা হওয়ার বিষয়টি হতাশাজনক। গণপরিবহনগুলোতেও নারীরা ব্যাপকভাবে যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন অথচ এর কোনো প্রতিকার নেই। গত মে মাসে ১৮ জন নারী ও মেয়ে শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে দুই জন আত্মহত্যা, দুই জন আহত, দুই জন লাঞ্ছিত, দুই জন অপহৃত ও আট জন বিভিন্নভাবে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। মে মাসে মোট ৪৯ জন নারী ও মেয়ে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন নারী ও ৩৮ জন মেয়ে শিশু। ওই ১১ জন নারীর মধ্যে ছয় জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ৩৮ জন মেয়ে শিশুর মধ্যে ১২ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং তিন জনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। সাত জন নারী ও মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে।



এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

বাক্সবন্দি হবে বাকস্বাধীনতা

যেখানে কোটা সংস্কারের মিছিল সেখানেই ছাত্রলীগ

ইভিএম কেনার প্রকল্প অনুমোদন

তিন প্রকল্প উদ্বোধন করলেন হাসিনা-মোদি

খালেদার সঙ্গে দেখা করতে পারেননি আইনজীবীরা

জনগণ তাদের খুঁজে বের করে বিচার করবে

সোহেল গ্রেপ্তার

নির্বাচনের তফসিল স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন

নড়িয়ায় হাহাকার

যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, গুরুত্ব পাবে রোহিঙ্গা ইস্যু

নিশ্চিত জাতীয় পার্টি আবার ক্ষমতায় যাবে

সৈয়দ আশরাফ অসুস্থ, ছুটি মঞ্জুর

সড়কে বিশৃঙ্খলা কোনো উদ্যোগেই ফল মিলছে না

শহিদুল আলমের জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন

‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ৫

এমপিও নিয়ে নানামুখী প্রতারণা মন্ত্রণালয়ের সতর্কতা