বাঁশের পিঠা ‘চুঙ্গা’

বাংলারজমিন

ইমাদ উদ দীন, মৌলভীবাজার থেকে | ১৩ জানুয়ারি ২০১৮, শনিবার
 শীতের পিঠা ‘চুঙ্গা’। সিলেট অঞ্চলে রেওয়াজী ঐতিহ্য। তাই শীত এলেই কদর বাড়ে এই পিঠার। আর আয়োজন হয় গ্রামে গ্রামে সিলেটীদের ঘরে ঘরে। শীতের আমেজে উৎসব আর আনন্দের মাত্রা বাড়াতে এ পিঠার জুড়ি নেই। প্রবাসী অধ্যুষিত এ অঞ্চলের প্রবাসীরা শীত মৌসুমে বাড়ি এলে আয়োজন করেন এই পিঠা উৎসবের।
কারণ, এই পিঠার স্বাদ আর ব্যতিক্রমী আয়োজন মন কাড়ে সকলের। খড়, বিন্নি চাল ও চাল গুঁড়ো আর বাঁশ। এই চার পদের উপকরণ সংগৃহীত হলে বিকাল হতেই চলে আয়োজন। রাত হলেই শুরু হয় পিঠা তৈরির কার্যক্রম। বাড়ির আঙিনায় বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি হচ্ছে পিঠা। আর বাড়ির রান্না ঘরে তৈরি হচ্ছে ভাঁজা মাছ, নারকেলের পিঠা আর ভুনা মাংস। সঙ্গে আছে দুধের মালাই, খেজুরের গুড় ও দুধের সর কিংবা খেজুর, তাল আর আখের রসের লালী (দীর্ঘ সময় আগুনে তাপ দেওয়া রস)। সব উপকরণ প্রস্তুত হলে ডাক পড়ে খাবারের। আয়োজন, তৈরি আর খাবার। এসব কাজেই সরব বাড়ির ছোট-বড় সবাই। দল বেঁধে নানা গল্প-আড্ডায় আর উৎসব-আমেজে অংশ নেন সবাই। শীতের রাতে খড়ের আগুনে বিশেষ পদ্ধতিতে তাপ দেওয়া হচ্ছে বাঁশের ভেতরে থাকা পিঠার। আর বাড়ির ছোট-বড় সকলেই খড়-কুটোর আগুনের চারপাশে গোল হয়ে শীত তাড়াতে তাপ নেন আগুনের।
বছরে এ রকম একটি আয়োজনের মধ্যদিয়ে আত্মীয়স্বজনসহ এলাকার সবার সঙ্গে যোগসূত্রতা ও আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় হয়। কিন্তু নানা কারণে এই ঐতিহ্য আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। এমনটিই জানালেন এই অঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের কৃষিজীবী লোকজন। তারা জানালেন ওখানকার গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে শীতকালের চুঙ্গা পিঠা তৈরির এমন দৃশ্য এখন চোখে পড়ছে কম। নানা কারণে এখন কমে যাচ্ছে চুঙ্গা পিঠা খাওয়ার সিলেটীদের এমন রেওয়াজী উৎসব। তার পরও কোনো রকম ঠিকে আছে হাওর ও পাহাড়ঘেরা এ অঞ্চলের ঐতিহ্য শীতে চুঙ্গা পিঠার রেওয়াজ। গেল প্রায় মাস খানেক থেকে ওখানকার স্থানীয় বাজারগুলোতে চোখে পড়ছে পাহাড়ি ঢলু বাঁশের পসরা। শীত এলেই স্থানীয় বাজারগুলোতে হাটবারের দিন চোখে পড়ে পাহাড়ি ঢলু বাঁশ বিক্রির এমন দৃশ্য। আগেকার দিনের মতো দোকানীরা ঢলু বাঁশের বড় পরিসরের পসরা না বসালেও এ বছর অল্প করে হলেও এরকম বাঁশ বিক্রি হচ্ছে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা ও কমলগঞ্জের স্থানীয় বাজারগুলোতে। কিন্তু বাজারগুলোতে হাতেগোনা কয়েকজন বিক্রেতা হলেও ক্রেতার সংখ্যা বেশি। তাই বিক্রেতারা পসরা সাজানোর আগেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে এসব বাঁশ। কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গে আলাপে জানা গেল পাহাড়ে আর আগের মতো নেই পিঠা তৈরির বাঁশ ঢলু। তারা সারা দিন বন থেকে বনে ঘুরে ১০-১৫ আঁটি (এক আটিতে ২০টি পিঠা তৈরীর বাঁশ থাকে) বাঁশ সংগ্রহ করতে হিমশিম খান। যেমনটি তারা আগে ১-২ ঘণ্টায় পাহাড় থেকে সংগ্রহ করতে পারতেন। এখন নানা কারণে পাহাড়ি বাঁশ, গাছ আর বন উজাড় হওয়ায় তারা মৌসুমেও প্রতিদিন তা বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে বসতে পারেন না। এক কুড়ি একই আকার ও আয়তনের বাঁশ (২০টি পিঠা তৈরির বাঁশ) বিক্রি করেন ৩শ-৪শ টাকা। বিক্রেতারা জানালেন গেল পৌষ সংক্রান্তির সময় এক কুড়ি বাঁশ ৪শ-৫শ টাকাও বিক্রি করেছেন তারা। স্থানীয় বাজার ঘুরে বিন্নি চাল পাওয়া গেলেও মেলেনি নানা জাতের দেশীয় প্রজাতির সুগন্ধি চিকন চাল। যে গুলো চুঙ্গা পিঠা তৈরীর অন্যতম উপকরণ। স্থানীয় বাসিন্দারা জানালেন আগে বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, কুলাউড়ার ষাঁড়েরগজ ও গাজীপুরের পাহাড়, রাজনগরের পাহাড়ি টিলার বনে, শ্রীমঙ্গলের কালাপুর পাহাড় ও জুড়ির হলম্পা, সুরমাছড়া ও  চুঙ্গাবাড়ীসহ জেলার ছোট-বড় পাহাড়ি টিলাগুলোতে প্রচুর ঢলুবাঁশ হতো। আর নানা জাতের সুগন্ধি ও বিন্নি ধানের চাষ হতো কৃষিজমিতে। আমন ধান গোলায় তুলে বাড়ি বাড়ি এসব চাল ঢেঁকিতে ভেঙে পিঠা তৈরির চালের গুঁড়া সংগ্রহ করা হতো। সেই চালের গুঁড়া দিয়ে শীত মৌসুমে ঘরে ঘরে উৎসব চলত পিঠাপুলির আয়োজনে। এ পিঠা স্বাদ আর সুখ্যাতি সিলেট বিভাগ ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানেও। এই পিঠার বিশেষত্ব হলো
 বাঁশের মধ্যে থেকে একধরনের লোভনীয় সুঘ্রাণ চুঙ্গা পিঠার মাঝে পাওয়া যায়। ভাজা মাছ কিংবা ভোনা মাংসের সঙ্গে খেতে এ যেন অন্যরকম স্বাদের অনুভূতি। ঢলু বাঁশে এক ধরনের তৈলাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে যার ফলে আগুনে বাঁশের চুঙ্গাটি না পুড়ে ভেতরের পিঠা আগুনের তাপে সিদ্ধ হয়ে যায়। জানা যায় চুঙ্গা পিঠা তৈরি করতে হলে প্রথমে কলাপাতায় মুড়িয়ে ভেজানো বিন্নী চাল অথবা চালের গুঁড়ো (সাথে দিতে পারেন দুধ, চিনি ও নারিকেল) ঢলু বাঁশের ভেতর ভরে মুখটা কলাপাতা ও খড় দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে দিতে হয়। কলাগাছের কাণ্ডের দুটি টুকরো অথবা ইট কিংবা মাটি দিয়ে বিশেষ চুলা তৈরি করে তার ওপরে বাঁশের চুঙ্গাগুলো সাজিয়ে রাখাতে হয়। তারপর খড়ের আগুনে ভালোভাবে চুঙ্গাগুলো পুড়িয়ে নিলেই চুঙ্গাটি পিঠাতে পরিণত হয়। পিঠা তৈরি হয়ে গেলে মোমবাতির মতো সাদা অংশ চুঙ্গার ভেতর থেকে পিঠা আলাদা হয়ে যায়। আগুনে পুড়ানো চুঙ্গাটি ভালো করে শুকনো কাপড় দিয়ে মুছে হাতদিয়ে কিংবা ছুরি দিয়ে আখের ছাল ছাড়ানোর মতো ছিলে নিতে হবে। ছাল ছাড়ানো হয়ে গেলে মিলে কাঙ্ক্ষিত সেই সুগন্ধ যুক্ত বাঁশে পিঠা চুঙ্গা। এখন বনদস্যু, ভূমিদস্যু এবং পাহাড়খেকোদের কারণে উজাড় হচ্ছে এ অঞ্চলের পাহাড়ি বন জঙ্গল। এরই ধারাবাহিকতায় এখন ধ্বংসের দোরগোড়ায় ঢলু বাঁশের বন। আর বেশি ফলনের আশায় প্রযুক্তিনির্ভর হাইব্রিড ধান উৎপাদনে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির বিন্নি ও সুগন্ধি ধানের চাষ। এসব কারণেই কালের পরিক্রমায় চুঙ্গা পিঠার রেওয়াজী ঐতিহ্য ধরে রাখা দুষ্কর হচ্ছে এ অঞ্চলের গ্রামীণজনপদে। জুড়ি বাঁশ মহালদার মামুনুর রশিদ মামুন মানবজমিনকে বলেন এ অঞ্চলের পাহাড়ে ঢলু বাঁশসহ নানা প্রজাতির ১৯টি বাঁশ মহাল ছিল। শুধু জুড়ীতে থাকা ৭টি বাঁশ মহালের মধ্যে এখন কোনো রকম ঠিকে আছে ৩টি। আর বাকিগুলো নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। তিনি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ একটু সদয় হলে কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই বাঁশ মহাল ঠিকে থাকবে আর বছরান্তে সরকার পাবে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। স্থানীয় বাসিন্দাদের জোর দাবি দীর্ঘদিনের এই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে অতীত ঐতিহ্য তুলে ধরতে বিলুপ্ত হওয়ার আগেই পাহাড়গুলোতে ঢলু বাঁশের এই প্রজাতির সংরক্ষণের।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

অভিযোগের পাহাড়, অসহায় ইউজিসি

প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে না আজ

মৈত্রী এক্সপ্রেসে শ্লীলতাহানির শিকার বাংলাদেশি নারী

‘২০৬ নম্বর কক্ষে আছি, আমরা আত্মহত্যা করছি’

ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারালেন ঢাবি ছাত্র

পুলে যাচ্ছে সেই সব বিলাসবহুল গাড়ি

নীলক্ষেত মোড়ে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ, এমপির আশ্বাসে স্থগিত

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সফর সফল করতে নির্দেশনা

নেতাকর্মীরা জেলে থাকলে নির্বাচন হবে না: ফখরুল

তিন দিনের ধর্মঘটে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা

ইডিয়ট বললেন মারডক

সহায়ক সরকারের রূপরেখা প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে

২৩শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

বাসায় ফিরছেন মেয়র আইভী

‘আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে’

জনগণ রাস্তায় নেমে ভোটাধিকার আদায় করবে: মোশাররফ