কিম জং উন: শ্রুতিকথা ও বাস্তবতা

বিশ্বজমিন

মিসবাহুল হক | ১১ জানুয়ারি ২০১৮, বৃহস্পতিবার | সর্বশেষ আপডেট: ১০:৫০
সম্প্রতি একের পর এক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র চালিয়ে বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন উত্তর কোরিয়ার তরুণ প্রেসিডেন্ট কিম জং উন। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূ-খণ্ডও উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতাধীন। এসব কর্মকাণ্ডে প্রাথমিকভাবে তাকে একজন অকুতোভয় রাষ্ট্রনায়ক বলে মনে করা হয়। যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও এর মিত্রদের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। কিন্তু তার ওপর কড়া নজরদারি রাখা পর্যবেক্ষকরা বলছেন, কিম মূলত একজন অসুস্থ মানুষ। যিনি মানসিক অসুস্থতার পাশাপাশি গেঁটে বাতে আক্রান্ত।
তিনি উৎখাতের ভয়ে থাকা একজন জনবিচ্ছিন্ন নেতা। বেশ কয়েকবার তাকে গুপ্তহত্যারও পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিম একজন দুর্বল ও ভঙ্গুর মানসিকতার লোক, যিনি সবসময় তোষামোদকারীদের দ্বারা বেষ্টিত থাকেন। ব্যক্তিগতভাবে প্রচণ্ড বদমেজাজি তিনি। এসব কথা উঠে এসেছে বিখ্যাত সাংবাদিক জেমি তারাবে’র লেখা এক প্রতিবেদনে। সম্প্রতি এটি সিএনএনে প্রকাশিত হয়। এতে উত্তর কোরিয়ার নেতার সম্পর্কে মানুষের ধারণা ও বাস্তবতা তুলে ধরেছেন তিনি।
এতে বলা হয়, কিমের বিষয়ে যেসব তথ্য প্রকাশিত হয় তা খুবই সামান্য। তার সম্পর্কে বেশির ভাগ তথ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। এমনকি উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের যে জন্মদিন প্রকাশ করা হয়, তা বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। কিমের পূর্বে তার বাবা ও দাদা একই দিনে জন্মদিন পালন করতেন। প্রেসিডেন্ট হওয়ার পাশাপাশি তারা নতুন জন্মদিন গ্রহণ করেন। জনসাধারণকে তার ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব কমই জানানো হয়। ধারণা করা হয়, তার তিন সন্তান আছে। তবে এই ধারণার সত্যতা যাচাই করার কোনো সুযোগ নেই। পিতার মৃত্যুর পর কিম জং উন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পূর্বসূরির নীতি বহাল রাখেন। তিনি অর্থনৈতিক উন্নতির পাশাপাশি সামরিক বিভাগের উন্নয়নের উপর জোর দেন। তিনি বিভিন্ন সামরিক মহড়ায় উপস্থিত হন। বিশেষত দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তবর্তী ঘাঁটিগুলোকে আরো শক্তিশালী করেন। রাষ্ট্রের প্রায় সকল ক্ষমতা এককভাবে নিজের হাতে নেন তিনি। পাশাপাশি নিজের দলের উন্নয়নে গুরুত্বারোপ করেন। ৩৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তিনি দলের কংগ্রেস সম্মেলনের আয়োজন করেন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য তিনি বেশকিছু বড় ধরনের কন্সট্রাকশন প্রজেক্ট শুরু করেন। পূর্বসূরিদের মতো তিনিও পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে সচেষ্ট হন। এতে তরুণ নেতা হিসেবে তার দক্ষতার প্রমাণ পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন একটি দেশকে সফলভাবে এগিয়ে নেয়ার বিষয়ে তার কৌশল প্রমাণিত হয়। কিন্তু ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে তার স্বেচ্ছাচারিতাও বেড়ে যায়।
কিমের বাল্য জীবন: ১৯৯০ সালে কিম জংকে তার দুই সহোদরসহ সুইজারল্যান্ডের বার্নে পড়ালেখা করতে পাঠানো হয়। এই সময়ে খালা কো ইয়ং সুকের তত্ত্বাবধানে ছিলেন তিনি। ওয়াশিংটন পোস্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে কো ইয়ং সুক বলেন,  বাল্যকালে কিম বাস্কেট বলে আসক্ত ছিলেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা করতেন তিনি। এমনকি ঘুমানোর সময়ও বল পাশে রেখে ঘুমাতেন। অতি সাধারণ বালক হিসেবেই কাটছিল তার জীবন। কিন্তু অষ্টম জন্মদিনের সময় কিমকে জানানো হয়, অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের জন্য তাকে গড়ে তোলা হচ্ছে। এসময় তাকে সেনাবাহিনীর জেনারেলের পোশাক উপহার দেয়া হয়। এমনকি ওই জন্মদিনের অনুষ্ঠানে উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন জেনারেলরা আট বছর বয়সী কিমকে মাথা নত করে সম্মান জানান। কো ইয়ং সুক বলেন, কিমের চারপাশের লোকজন যখন তার সঙ্গে এমনভাবে আচরণ করতে শুরু করলো, তখন তার পক্ষে একজন সাধারণ বালক হিসেবে বেড়ে ওঠার সুযোগ ছিল না।
কিছুদিন পরে কিম জং উনের মা ও কো ইয়ং সিকের বোনের ব্রেস্ট ক্যানসার ধরা পড়ে। কো ইয়ং উপলব্ধি করেন যে, কিমের মা’র জীবনাবসানের পর রাজপরিবারে তাদের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এরপরই তিনি পক্ষত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি সুইজারল্যান্ড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেখানে লন্ড্রির ব্যবসা শুরু করেন। স্থায়ীভাবে সেখানেই বসবাস শুরু করেন।
ওয়াশিংটন পোস্টকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি উত্তর কোরিয়ার নেতার বিভিন্ন অজানা তথ্য তুলে ধরেন। এসময় কো ইয়ং বলেন, সুইজারল্যান্ডে পড়ালেখা করার সময় কিম বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মেশার সুযোগ পান। এই সময়ে তিনি জার্মান ও ফ্রেঞ্চ ভাষা বেশ ভালোভাবে রপ্ত করেন। তিনি বেশকিছু পশ্চিমা দেশ সফরে যান। পশ্চিমা মনোভাবের কয়েকজন বন্ধু হয় তার। মোটামুটি পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হতে থাকেন তিনি। ২০১১ সালে যখন উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ  প্রেসিডেন্ট হিসেবে কিমের নাম ঘোষণা করা হয়, তখন পশ্চিমা মোড়লরা বেশ খুশিই হয়েছিলেন। তারা আশা করেছিলেন, কিম বহির্বিশ্বের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন ধারার সূচনা করবেন।
কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করে কিম নিষ্ঠুরতার নতুন ধারার সূচনা করেন। দায়িত্ব গ্রহণ করার আগে উত্তর কোরিয়ার জনগণ কিম জং উনের বিষয়ে অনেকটাই অজ্ঞাত ছিল। পিতার মৃত্যুর কিছু দিন পূর্বে তাকে সেনাবাহিনীর ‘ফোর-স্টার জেনারেল’ ও দলের প্রতিরক্ষা বিষয়ক ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিম জং ইলের মৃত্যুর পর যখন তাকে উত্তরসূরি ঘোষণা করা হয়, তখনই তিনি প্রকাশ্যে আসেন। তাকে পিতার মৃতদেহের পাশে দেখা যায়। এসময় তিনি অশ্রুসিক্ত ছিলেন। বেশ আবেগি ছিলেন কিম।
বিশ্লেষকরা মনে করেছিলেন, তরুণ প্রেসিডেন্ট কিম শুভাকাঙ্ক্ষীদের ‘হাতের পুতুল’ হবেন। পিতার মৃত্যুর চারমাস পর তিনি প্রথমবারের মতো জনসম্মুখে ভাষণ দেন। এর পরেই কিমের প্রকৃত চেহারা উন্মোচিত হতে থাকে। প্রথমেই তিনি সেনাবাহিনীর কয়েক ডজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করেন। এর কিছুদিন পরেই সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগে নিজের চাচাকে মৃত্যুদণ্ড দেন তিনি। ২০১৫ সালে আরো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করেন কিম।
এর কিছুদিন পরে উত্তর কোরিয়ার নেতা নিজের সৎভাই কিম জং ন্যামকে হত্যা করেন। কুয়ালালামপুর ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, দুই নারী কিম জং ন্যামকে ‘নার্ভ এজেন্ট’ দিয়ে আক্রমণ করছেন। পরে হাসপাতালে নেয়ার পথে নিহত হয় সে। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, উত্তর কোরিয়ার নেতা এই হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু উত্তর কোরিয়া এই মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। বর্তমানে ওই দু্‌ই নারী মালয়েশিয়ার কারাগারে বন্দি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ক্ষমতা সুসংহত করার জন্যই কিম জং উন নিজের সৎ ভাইকে হত্যা করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের সমালোচনার পথই বন্ধ করেননি, পাশাপাশি কারো দ্বারা উৎখাত হওয়ার সম্ভাবনাও বিনষ্ট করেছেন। কেননা, পশ্চিমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল  কিম জং ন্যামের।
দাদার উত্তরসূরি: প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তার দাদা কিম ইল সাংয়ের বেশ মিল রয়েছে। কিম ইল সাং ছিলেন উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা। তাকে দেশের  উন্নতি ও অগ্রসরতার প্রতীক হিসেবে মনে করা হয়। তবে তার শাসনামলে বেশকিছু ধ্বংসযজ্ঞও সংঘটিত হয়। তখন ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে উত্তর কোরিয়ার প্রায় ৩০ লাখ মানুষ না খেয়ে মারা যায়। বর্তমান প্রেসিডেন্ট কিম জং উনের শাসনামলে এমন ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দেয়া কোনো অসম্ভব বিষয় না। এমনকি দু’জনের ‘হেয়ার-কাটে’ও অনেক সামঞ্জস্য রয়েছে। অন্যদিকে, পিতা কিম জং ইলের ও কিম জং উনের মধ্যে তফাৎই বেশি। কিম জং ইল খুব কমই জনসম্মুখে আসতেন ও মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। এই ক্ষেত্রে কিম জং উন পুরোপুরি বিপরীত। তিনি নিয়মিত জনসম্মুখে আসেন, সবার সঙ্গে করমর্দন করেন, আলিঙ্গন করেন। এমকি কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গেও কথা বলেন তিনি। আশা করা হচ্ছে, পিতা ও দাদার অপূর্ণ ইচ্ছা পূরণ করবেন কিম। তারা উত্তর কোরিয়াকে পারমাণবিক ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বানাতে চেয়েছিল। কিম ইল সাংয়ের শাসনামলেই এই লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করে দেশটি। নিজের দাদার শুরু করে যাওয়া পরিকল্পনাকে কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার টিকে থাকার একমাত্র সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। যেকোনো কিছুর বিনিময়েই এই লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ তিনি।

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

আপনার মতামত দিন

অভিযোগের পাহাড়, অসহায় ইউজিসি

প্রত্যাবাসন শুরু হচ্ছে না আজ

মৈত্রী এক্সপ্রেসে শ্লীলতাহানির শিকার বাংলাদেশি নারী

‘২০৬ নম্বর কক্ষে আছি, আমরা আত্মহত্যা করছি’

ট্রেনে কাটা পড়ে দুই পা হারালেন ঢাবি ছাত্র

পুলে যাচ্ছে সেই সব বিলাসবহুল গাড়ি

নীলক্ষেত মোড়ে ব্যবসায়ীদের বিক্ষোভ, এমপির আশ্বাসে স্থগিত

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সফর সফল করতে নির্দেশনা

নেতাকর্মীরা জেলে থাকলে নির্বাচন হবে না: ফখরুল

তিন দিনের ধর্মঘটে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা

ইডিয়ট বললেন মারডক

সহায়ক সরকারের রূপরেখা প্রণয়নের কাজ শেষ পর্যায়ে

২৩শে ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন

বাসায় ফিরছেন মেয়র আইভী

‘আমাকে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে’

জনগণ রাস্তায় নেমে ভোটাধিকার আদায় করবে: মোশাররফ